ফিলিস্তিনে অবৈধ ইহুদি বসতির অন্যতম অর্থদাতা চেলসি ফুটবল ক্লাবের মালিক

0
20
চেলসি ফুটবল ক্লাবের মালিক রোমান আব্রামোভিচ

ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড দখল করে, স্থানীয়দের বাড়িছাড়া করে সেখানে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনের ঘটনা নতুন নয়। তবে নতুন কিছু নথিপত্রে জানা গেছে, এসব অবৈধ বসতি স্থাপনের অন্যতম অর্থদাতা রুশ ধনকুবের এবং ইংলিশ ফুটবল ক্লাব চেলসি-র মালিক রোমান আব্রামোভিচ। তার কিছু প্রতিষ্ঠান এমন একটি ইসরায়েলি কোম্পানিকে ১০ কোটি ডলার দান করেছে– যারা দখলকৃত পূর্ব জেরুসালেমে ইহুদি বসতি স্থাপনের জন্য কাজ করে। বিবিসির আরবি বিভাগের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন তথ্য।

ফিলিস্তিনে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনে চেলসি-র মালিক রোমান আব্রামোভিচ যে অর্থ দিয়েছেন বাংলাদেশি মুদ্রায় তার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮৫৪ কোটি টাকা। তবে আব্রামোভিচের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে জানিয়েছেন, গত ২০ বছরে ইসরায়েল ও ইহুদিদের জন্য তার মোট দানের পরিমাণের চেয়ে অন্তত পাঁচ গুণ বেশি।

চেলসি ফুটবল ক্লাবের মালিক রোমান আব্রামোভিচ

দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সংগঠনের নাম এলাদ। তারা সেখানকার সিলওয়ান এলাকার নাম দিয়েছে ‘ইর ডেভিড’- যে হিব্রু নামের অর্থ ‘সিটি অব ডেভিড’। অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। তখন থেকে এ পর্যন্ত এই সিলওয়ানে প্রায় ৭৫টি বাড়িতে ইহুদি পরিবারের বসতি স্থাপন সম্পন্ন করেছে এলাদ। এ প্রতিষ্ঠানটি আবার পর্যটনের ক্ষেত্রেও কাজ করে। সিটি অব ডেভিডের পুরাতাত্বিক আকর্ষণীয় স্থানগুলো দেখতে প্রতি বছর ১০ লাখেরও বেশি পর্যটক সেখানে ভ্রমণ করে। আর ওই পর্যটক আকর্ষণের স্থানগুলো পরিচালনা করে তারাই।

এলাদের সাবেক বিপণন পরিচালক শাহার শিলো। তিনি বিবিসিকে জানান, এলাদের কৌশল হচ্ছে তারা সিটি অব ডেভিডে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরির জন্য পর্যটনকে ব্যবহার করছে। এলাদ তার কাজের অর্থায়নের জন্য নির্ভর করে দাতাদের ওপর। ২০০৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তারা দান হিসেবে যে অর্থ পেয়েছে- তার অর্ধেকই গেছে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডের (বিভিআই) চারটি কোম্পানি থেকে। তবে এই কোম্পানিগুলোর পেছনে যারা আছেন, তাদের নাম এতকাল সবার অজানাই ছিল।

ফিনসেন ফাইলস: সম্প্রতি ‘ফিনসেন ফাইলস’ নামে যেসব ব্যাংকিং খাতের দলিলপত্র ফাঁস হয়েছে- তার মধ্যে কিছু দলিলপত্রে বিভিআইয়ের ওই চারটি দাতা কোম্পানির নাম আছে। এসব দলিলপত্রে ব্যাংকগুলো তাদের আর্থিক লেনদেন এবং কোম্পানির মালিকানা সংক্রান্ত তথ্য রিপোর্ট করেছে। এসব দলিলপত্র ফাঁস করা হয়েছে বাজফিড নিউজের কাছে – যা তারা শেয়ার করেছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম ও বিবিসি-র সঙ্গে। এসব দলিলপত্রে রোমান আব্রামোভিচের নাম রয়েছে। তিনি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ফুটবল ক্লাব চেলসির মালিক।

এলাদকে অর্থ দান করে এমন তিনটি কোম্পানির চূড়ান্ত মালিক হচ্ছেন আব্রামোভিচ। আইনের ভাষায় যাকে বলে ‘বেনিফিশিয়াল ওনার’। আর চতুর্থ কোম্পানিটিও তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন।

এলাদের অ্যাকাউন্টে দেখা যায়, এই কোম্পানিগুলো তাদেরকে যে অর্থ দিয়েছে তার পরিমাণ এখনকার বিনিময় হারে ১০ কোটি ডলারেরও বেশি হবে। এর মানে হলো গত ১৫ বছরে এলাদকে এককভাবে সবচেয়ে বেশি অর্থ দান করেছেন রোমান আবামোভিচ।

পুরাতাত্বিক খনন কাজ: অধিকৃত এলাকায় যেসব আইনের অধীনে পুরাতাত্বিক খনন কাজ চালানো হয় তা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক আছে। এমন হতে পারে ইসরায়েল এলাদকে যেভাবে সিলওয়ানে যেসব পুরাতাত্বিক অনুসন্ধান চালাতে দিচ্ছে; তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। তার ওপর বলপূর্বক ফিলিস্তিনিদের জায়গা দখল করে সেখানে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট ইসরায়েল এসবের তোয়াক্কা করে না।

এলাদ বিবিসিকে বলেছে, এখানে পুরাতাত্বিক অনুসন্ধান চালানো ইহুদিদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন। তারা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান-সম্পর্কিত ইসরায়েলের আইন ও বিধিসমূহ এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখার শর্তগুলো মেনে চলে।

রোমান আব্রামোভিচ তাদের দাতাদের একজন কিনা, এ প্রশ্ন করা হলে এলাদ বলেছে, তাদের নীতি হচ্ছে অর্থদাতাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা।

আব্রামোভিচের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছেন, ‘আব্রামোভিচ ইসরায়েলি এবং ইহুদি সুশীল সমাজের একজন নিবেদিতপ্রাণ ও উদার সমর্থক। গত ২০ বছরে তিনি স্বাস্থ্যসেবা, বিজ্ঞান, শিক্ষা এবং ইসরায়েল ও বিশ্বের অন্যত্র ইহুদি কমিউনিটির জন্য ৫০ কোটি ডলারেরও বেশি দান করেছেন।’

এই অর্থায়ন ছাড়া এলাদ এই ফিলিস্তিনি এলাকাটিতে ইহুদিদের উপস্থিতি শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে এত দ্রুত ও সফলভাবে কাজ করতে পারতো না।

সম্পত্তি আইন: অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা বাস করে এমন কিছু বাড়ি ফিলিস্তিনি মালিকদের কাছ থেকে কিনে নেওয়া হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই জমির প্রকৃত মালিক ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে বলপূর্বক উচ্ছেদ বা বাড়িছাড়া করা হয়েছে। আর এটা করা হয়েছে ‘অ্যাবসেন্টি প্রপার্টি ল’ নামের বিতর্কিত একটি ইসরায়েলি আইনের দোহাই দিয়ে। এই আইনটির মাধ্যমে সংঘাতের কারণে যে ফিলিস্তিনিরা বাড়ি থেকে চলে গেছে বা পালিয়ে গেছে- সেসব বাড়ির দখল নিয়ে নিতে পারে ইসরায়েল। এ রকমই একটি ঘটনার কেন্দ্রে আছে সুমারিন হাউস। এটির অবস্থান এলাদের যে পর্যটন কেন্দ্র- তার ঠিক পাশেই। একটি পরিবারের ১৯ জন সদস্য সেখানে বাস করে- যার মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ জনের বয়স দুই মাসেরও কম।

পরিবারের মা আমল সুমারিন বলছিলেন, আমি বিয়ের পর এখানে থাকতে এসেছিলাম। আমার স্বামী তখন তার চাচা হজ মুসা সুমারিনের সঙ্গে থাকতেন। তার স্ত্রী মারা যাবার পর আমিই তার যত্ন নিতাম, রান্না করে খাওয়াতাম। তিনি গোসলের সময় আমার স্বামী তাকে সাহায্য করতো, তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতো। তিনি আমাকে বলতেন, বাছা এ বাড়ি তোমারই। তোমার আর তোমার স্বামীর জন্যই এ বাড়ি।

মুসা সুমারিন মারা যান ১৯৮৩ সালে। এর চার বছর পর ১৯৮৭ সালে কথিত অ্যাবসেন্টি আইনে ইসরায়েল এ বাড়ির দখল নিয়ে নেয়। বাড়িটি ইহুদি ন্যাশনাল ফান্ড বা জেএনএফের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হেমনুতার কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। জেএনএফের ঘোষিত লক্ষ্য হচ্ছে ইহুদি জনগণের পক্ষ থেকে জমি কেনা এবং বাড়িঘর নির্মাণ করা। ১৯৯১ সালে হেমনুতা আদালতে আর্জি জানানো হয়, যেন সুমারিন পরিবারকে তাদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। এ নিয়ে আইনি লড়াইয়ে সুমারিনদের অর্থায়ন করছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এবং কিছু বেসরকারি সংস্থা।

গত ১০ বছর ধরে সুমারিনদের আইনজীবী হচ্ছেন মোহাম্মদ দাহলে। তিনি বিবিসিকে বলছেন, যদি কোন ফিলিস্তিনির বাড়িকে একবার ইহুদি বা ইসরায়েলি সম্পত্তি বলে ঘোষণা করা হয়, তাহলে তা টিকিয়ে রাখার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। সত্যিই তাই। ২০২০ সালের আগস্ট মাসে সুমারিনদের পরিবার জেরুজালেমের জেলা আদালতে তাদের আপিলের মামলায় হেরে যায়। তারা এখন ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছে। সেখানে মামলার শুনানি হবে ২০২১ সালের এপ্রিলে। এখন এলাদ চেষ্টা করছে উচ্ছেদের তারিখ এগিয়ে আনতে। তারা এজন্য এই মামলার সংশ্লিষ্ট সব আইনি খরচ পরিশোধ করতে রাজি হয়েছে। ১৯৯১ সালে হেমনুতাকে লেখা এক চিঠিতে এর উল্লেখ ছিল। সিলওয়ান এলাকার আরও কয়েকটি পরিবারের উচ্ছেদের মামলার খরচও দিচ্ছে এলাদ।

হেমনুতা মামলার ব্যাপারে কোনও প্রশ্নের জবাব দেয়নি। এলাদ মামলার সব খরচ এখনও দিয়ে চলেছে কিনা – তা তারা নিশ্চিত করেনি। এলাদের দাবি, তাদের সব বাড়ি-জমি নিরপেক্ষ ও আইনগতভাবে পাওয়া। তবে বাস্তবতা হচ্ছে পূর্ব জেরুজালেমের সিলওয়ান এলাকায় বহু ফিলিস্তিনি উচ্ছেদের সঙ্গে এলাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

এলাদের দাবি, ‘সিটি অব ডেভিডে কখনও আদালত, মামলা ও মামলা উপস্থাপনের সুযোগ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কোন ফিলিস্তিনিকে তাদের বাড়ি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়নি।’ তবে মোহাম্মদ দাহলে বলছেন, ‘পরিস্থিতিটা এখানে এমন যে একটি জাতিগত গোষ্ঠী তাদের নিজ স্বার্থের জন্য আইন করছে, আর অন্য জাতিগোষ্ঠী ওই আইনের কারণে দুর্ভোগে পড়ছে।’ অর্থায়নের পাশাপাশি এলাদের প্রভাবও বেড়েছে।

ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফ্রিডম্যান ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ ইহুদি বসতির একজন কট্টর সমর্থক। তিনি সিটি অব ডেভিডে একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র যখন ২০১৯ সালে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তখন ফ্রিডম্যান ছিলেন তার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। ২০২০ সালে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার কথিত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, তখন এলাদের বহু জায়গাকে ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, এসব জায়গার সংরক্ষণ প্রয়োজন। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে বহু ফিলিস্তিনিকে বাড়িছাড়া করে এসব জমি তাদের তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সূত্র: বিবিসি বাংলা।

অর্থসূচক/এএইচআর