ফেসবুক গ্রুপে শেয়ার কারসাজি, কঠোর ব্যবস্থা নেবে বিএসইসি

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ‘সূচক ৫ হাজার ১৪০ পয়েন্টে যাবে। এটি বাজারের টপ পজিশন। তারপর আবার কারেকশন হবে।’ ‘আনোয়রা গ্যালভানাইজিং ১২০ টাকা পর্যন্ত হোল্ড করবেন’, ‘মার্কেট এখন ইন্ডিং মুভমেন্টে আছে, কারেকশন শুরু হবে’।

এরকম বিভিন্ন মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ এবং গুজব ছড়িয়ে ফেসবুকে শেয়ার কারসাজি করছে বিভিন্ন গ্রুপ। এই গ্রুপগুলোতে ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার সদস্যও রয়েছে। তাদের বিভিন্ন গুজবে কান দিয়ে বিনিয়োগকারী ও দেশের পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিনিয়োগকারীদের আস্থার পুঁজিবাজার গড়ে তোলার লক্ষ্যে পুঁজিাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জে কমিশন (বিএসইসি) ফেসবুকের মাধ্যমে কারসাজির সঙ্গে জড়িত গ্রুপ ও গ্রুপের এডমিন এবং মডারেটরদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে নেমেছে।

বিএসইসির সূত্র মতে, ফেসবুক ও হোয়াটঅ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থাকা পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোকে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এসব গ্রুপের একটি তালিকা করা হয়েছে। তার মধ্য থেকে ‘ডিসিশন মেকার গ্রুপ’ এর বিরেুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে কমিশন।

‘ডিসিশন মেকার গ্রুপ’ (Decision Maker Group) নামের এই পাবলিক গ্রুপে ১২ হাজার সদস্য রয়েছে। গ্রুপটিতে এম তালুকদার ও ডিসিশন মেকার নামে মোট দুইজন অ্যাডমিন রয়েছেন। এছাড়াও তৈমুরসহ অন্য আরও দুইজন সদস্য মডারেটর হিসেবে কাজ করছেন।

নাম না প্রকাশের শর্তে বিএসইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অর্থসূচককে বলেন, ডিসিশন মেকার নামক আইডির কথোপকথন থেকে বোঝা যায় প্রতি শনিবার রাতে একটা আডেট বক্তব্য লেখা হয়, যেখানে পুঁজিবাজারের ভবিষৎ গতি প্রকৃতি নিয়ে পূর্বানুমানের মাধ্যমে বাজারের স্বাভাবিক গতি-প্রকৃতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়।

এখানে আকার ইঙ্গিতে বর্তমান সময়ে ডিএসইর ইনডেক্স ৫ হাজার ১৪০ পয়েন্টে যাওয়াকে টপ পজিশন উল্লেখ করে এখন থেকে কারেকশনের সম্ভবনার কথা উল্লেখ করা হয়।

এছাড়াও এখানে বিভিন্ন ধরনের সাবধানতা বা সকর্তার কথা উল্লেখ করে সাবস্ক্রাইবারদের মধ্যে আশঙ্কা ছাড়নোর বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়েছে।

এ ধরনের গ্রুপের এডমিন ও মডারেটরদের আইনের আওতায় এনে গ্রুপগুলোকে দ্রুত বন্ধের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এবিষয়ে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম অর্থসূচককে বলেন, এটি বিএসইসির ভালো উদ্যোগ। দ্রুত এগুলোকে আইনের আওতায় আনা উচিৎ। আর তার জন্য সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বানও জানান তিনি।

বিএসইর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন। তিনি বলেন, ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ এবং পোর্টালের মাধ্যমে বাজারে গুজব ছড়িয়েছে বিনিয়োগকারীদেরকে আতংঙ্কিত করে তুলছে। এসবের মাধ্যমে বাজারকে অস্থির করে তুলে। নতুন কমিশন এই উদ্যোগ নিয়েছে আমি এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।

গত বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) এই গ্রুপের এডমিন এম তালুকদার ডিএম লিখেন, ‘আনোয়ারাগ্যালভা (anwargalv) ওরফে জানোয়ারকে লং টাইমে হোল্ড করার জন্য কয়েকজনকে এই গ্রুপে পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ রাত থেকে আমি হয়তোবা সবসময় থাকবো না। তাই এই স্টকের ট্রায়েলিং স্টপ বলে দিচ্ছি। ট্রায়েলিং স্টপ প্রাইজ ১২০ টাকা। সহজ কথায় যতদিন পর্যন্ত ১২০ টাকার উপরে থাকবে ততদিন হোল্ড করবেন।’

গত শুক্রবার তালুকদার তার গ্রুপে যা লিখেন তা হু-ব-হু তুলে ধরা হলো-

‘সালাম নিবেন। কেমন আছেন?
এই আপডেটটা স্বাভাবিক ভাবে লেখার কথা ছিলো শনিবার রাতে। কিন্তু আমি শনিবার রাতে সিলেট থেকে চিটাগং ব্যাক করবো, তাই মার্কেট আপডেট লেখার মত পরিস্তিতিতে নাও থাকতে পারি। আমি চেষ্টা করি আমার ম্যাক্সিমাম এফোর্ট দিয়ে সার্ভিস প্রোভাইড করার হোক সেটা ফ্রি বা পেইড। তেমনিভাবে প্রতিরাতে মার্কেট আপডেট (ফ্রি সার্ভিস) লেখাটাও সার্ভিসের অংশ। যাক কথা লম্বা না করে মার্কেট নিয়ে আলোচনায় চলে আসি।

প্রশ্ন- মার্কেটের ট্রেন্ড কেমন?
উত্তর- আপট্রেন্ড।

প্রশ্ন- মার্কেট নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু আছে?
উত্তর- হ্যাঁ আছে। তবে এইটাকে আমি ভয় পাওয়া বলবো না, বলবো সাবধান হওয়ার প্রয়োজন আছে।

প্রশ্ন- মার্কেট যেহেতু আপট্রেন্ডে আছে সেহেতু সাবধান হওয়ার দরকার কি?
উত্তর- আমি গত কয়েকদিন আগে বলেছিলাম এই মুভমেন্টটা হচ্ছে মার্কেটের এন্ডিং মুভমেন্ট। যখন এই মুভমেন্ট শেষ হবে তখন শুরু হবে কারেকশন। এই কারেকশনটা দুই ভাবে হতে পারে। যেমন-

১) প্রাইজ কারেকশন মানে ইনডেক্স পয়েন্ট হিসাবে কারেকশন করবে।

২) টাইম কারেকশন মানে মার্কেট একই রেঞ্জের মধ্যে চলবে (সাইডওয়ে) যা ইনডেক্সের পয়েন্ট দেখে বুঝা যাবে না মার্কেট কারেকশন হচ্ছে, কিন্তু স্টকের প্রাইজ কারেকশন হবে।

প্রশ্ন- আপনি বলছিলেন দুইটা বড় ক্যান্ডেল আশা করছেন (রেড অথাব গ্রিন)। পরে একটা ক্যান্ডেল পাওয়ার পর আর একটার অপেক্ষায় ছিলেন, তাহলে কি আর একটা ক্যান্ডেল পাওয়া যাবে না?

উত্তর- টেকনিক্যালি মার্কেট এখনো আপট্রেন্ডেই আছে, তাই বলতেই হয় সম্ভাবনা এখনো আছে। কিন্তু যদি আমার ব্যক্তিগত চিন্তা ভাবনার কথা বলি (কনফার্মেশনের আগে) তাহলে মনে হয় ৫১৪০ আপাতত টপ পয়েন্ট থাকবে।

উল্লেখ্য যে আমার কথাটা ভালভাবে বুঝার চেষ্টা করবেন ৫১৪০ এইটা আমার চিন্তা ভাবনার কথা, টেকনিক্যালি কোন প্রকার কনফার্মেশন দেয় নাই। আর যতক্ষণ পর্যন্ত কনফার্মেশন না দিবে ততক্ষণ পর্যন্ত ৫১৪০ হাই পয়েন্ট হিসেবে ঘোষণা দেওয়া যায় না।

প্রশ্ন- আপনি তো ভাই বহুত খারাপ মানুষ দুই দিকেই কথা বললেন। যা হবে তাতেই আপনি সঠিক হয়ে যাবেন?

উত্তর- এমনটা যদি আপনি মনে করেন তাহলে বলতেই হবে আপনার টেকনিক্যাল ধারণা কম আছে। আর আল্লাহর অশেষ রহমতে ইনডেক্স আপডেট নিয়ে লাস্ট কয়েক বছরে এত সব সঠিক আপডেট দিয়ে এসেছি এখন যদি টানা আপডেট ভুল হয় কিছুদিন তাতেই ডিসিশন মেকারের ক্যারিয়ারে সমস্যা হবে না। তাই ভুলভাল বলে নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার ইচ্ছাই নাই। যা সত্য তা এমনিতেই দেখা যাবে। আমার মন্তব্য এখানে একদম ক্লিয়ার ৫১৪০ টপ মনে করছি কিন্তু এইটা সার্টিফাইড করছি না। কারণ টেকনিক্যালি এখনো আমি কনফার্মেশন পাই নাই।

মার্কেট কারেকশনে যাক বা সাইড ওয়ার্ক যাই করুক না কেন মার্কেটের বিহেব কেমন হতে পারে তার একটা ধারণা দিচ্ছি।
এখন সময় এসেছে জুন ক্লোজিং এবং ডিসেম্বর ক্লোজিং উল্লেখ করে আলোচনা করার। বর্তমান সময়ে জুন ক্লোজিং শেয়ারগুলা পেইন দিবে। সহজ কথায় এখন তারা ব্যবসা দিবে না। এতদিন যা ব্যবসা দিয়েছি তার থেকে তারা কিছুটা ফেরত নিবে। এইটা হচ্ছে আমার ক্লিয়ারকাট মন্তব্য।

এখন মনে করেন মার্কেটে জুন ক্লোজিং শেয়ার আছে ১০০টা, তার মধ্যে যদি ১০টা শেয়ার ব্যবসা দেয় আর ৯০টা না দেয় তাহলে আমার সাথে তর্কে আসতে যাবেন না। কারণ আমি লিখি ম্যাক্সিমামকে টার্গেট করে। তাই ব্যতিক্রম কোন কিছু উদাহরণ হতে পারে না।

প্রশ্ন- জুন ক্লোজিং শেয়ার কি টানা কমতেই থাকবে, বের হওয়ার সুযোগ দিবে না?

উত্তর- মার্কেটে কোন স্টক টানা যেমন বাড়ে না তেমনিভাবে টানা কোন স্টক কমে না এইটা হলো ইউনিভার্সাল ট্রুথ। তাই মাঝে মধ্যে কিছুটা রিকভার করবে আবার কমবে, আল্টিমেটলি আপট্রেন্ড তথা নিউ হাই ক্রিয়েট করার সম্ভাবনা নাই বলেই মনে করছি।

প্রো টিপস- যখন শেয়ার কারেকশনে চলে যায় তখন অনেকেই ভাবে একটু রিকভার করলেই বের হয়ে যাবে। এই চেষ্টার ফলাফল হয় লসের পরিমাণ ইনক্রিস হয়ে। এইটাই ইউনিভার্সাল ট্রুথ। উল্লেখ্য যে যারা টেকনিক্যালি অনেক এক্সপার্ট তারা কিছু হলেও রিকভার করতে পারে এই যা।

ডিসেম্বর ক্লোজিং এখন পর্যন্ত তার স্ট্রেংথ ধরে রেখেছে। মার্কেট যদি সাইডওয়ে বিহেব করে বা আপট্রেন্ড কন্টিনিউ করে তাহলে তাদের খেলা চলতেই থাকবে বা জুন ক্লোজিং এর মত বেশি মাইর খাবে না প্রথম দিকে।

প্রশ্ন- তাহলে কি জুন ক্লোজিং শেয়ার সেল করে ডিসেম্বর ক্লোজিংয়ে এন্ট্রি নিয়ে নিবো?

উত্তর- সেটা একান্ত আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি ঢালাও ভাবে সাজেস্ট করবো না এখন নতুন করে ডিসেম্বর ক্লোজিংয়ে এন্ট্রি নিতে। কারণ মার্কেটের এইটা এন্ডিং মুভমেন্ট, তাই আপনি এক্সপার্ট না হলে টি২-৩তে বের হতে পারবেন কি-না সন্দেহ। তাছাড়া ব্যাংক ফিনান্স নিয়ে এক সপ্তাহ আগেই বলেছিলাম, তাই এখন নতুন করে এখানে এন্ট্রি দেওয়ার কথা বলে নিজের এনালাইসিসকে হুমকির মুখে ফেলতে চাই না।

প্রশ্ন- তাহলে কি সব সেল করে ক্যাশ করে ফেলবো?

উত্তর- নতুন আইন হওয়ার কারণে পূর্বেরমত করে ক্লিয়ার ডিরেকশন দেওয়াটা যৌক্তিক হবে না। তারপরেও একটা ধারণা দেই, সেটা হলো মার্কেট যখন ৪১০০ ক্রস করেছিলো তখন থেকে আজ পর্যন্ত গ্রুপের অনেকেই অনেকবার টাকা ক্যাশ করেছেন। কিন্তু আমি একবারও বলি নাই ক্যাশ করতে। বরঞ্চ আমি পোস্ট দিয়েছিলাম যে মার্কেট যখন ডাউনট্রেন্ডে থাকে তখন মার্কেট বাড়তে পারে ভেবে ইনভেস্ট করা উচিৎ না, তেমনিভাবে মার্কেট যখন আপট্রেন্ডে থাকে তখন কমতে পারে ভেবে টাকা ক্যাশ করা উচিৎ না। আর এখন বলবো যেহেতু মনে হচ্ছে এইটা এন্ডিং মুভমেন্ট তাই আপাতত ৫০ শতাংশ-৫০ শতাংশ পলিসি এপ্লাই করে ব্যবসা করেন। যখন মার্কেট কনফার্মেশন দিবে তখন ১০০ শতাংশ পলিসিতে চলে যাবেন।

প্রশ্ন-উত্তরমূলক আলোচনায় আপনার কাছে কোন প্রশ্ন বা উত্তরটি ভাল লেগেছে তা কমেন্ট করে জানান।

আর এত ক্লিয়ার আলোচনা করার পরেও যদি মনে করেন কোন কিছু বুঝতে সমস্যা আছে তাহলে কমেন্ট করুণ। আমি রিপ্লাই দেওয়ার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ্।

সবাই ভাল থাকবেন, আল্লাহ হাফেজ।’

অর্থসূচক/এমআই/কেএসআর