লিবিয়ায় মানবপাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন হাজী কামাল

নিজস্ব প্রতিবেদক

0
146

লিবিয়ায় ২৬ জন বাংলাদেশি নিহতের ঘটনায় মানব পাচারকারী চক্রের মূল হোতা হাজী কামাল হোসেনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। এরপর জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন গত ১০/১২ বছরে অবৈধভাবে প্রায় ৪০০ বাংলাদেশিকে লিবিয়ায় পাঠিয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন হাজী কামাল।

আজ সোমবার (১ জুন) দুপুরে বিফ্রিং করে এসব তথ্য দেন র‌্যাব-৩ এর প্রধান লে. কর্নেল রকিবুল হাসান।

র‌্যাব বলছে, হাজী কামাল বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে মানবপাচারকারীর মূল হোতা। এরসঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান করছে র‌্যাব।

বিফ্রিংয়ে লে. কর্নেল রকিবুল হাসান বলেন, লিবিয়া ছাড়াও হাজী কামাল মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবৈধ প্রক্রিয়ায় লোক পাঠান। এছাড়াও তিনি একজন টাইলস কন্ট্রাক্টর। অনেক টাইলস শ্রমিক তার সংস্পর্শে আসেন। সেই সুযোগে তিনি শ্রমিকদের প্রলুব্ধ করে বলেন- বাংলাদেশে তোমরা ৫০০-৮০০ টাকা আয় করতে পারো। কিন্তু লিবিয়াতে গেলে তোমরা প্রতি দিন ৫০০০-৬০০০ টাকা আয় করতে পারবা। লিবিয়াতে টাইলস মিস্ত্রীদের অনেক চাহিদা।

র‌্যাব কর্মকর্তা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে জানান, কামাল শ্রমিকদের বলেন—লিবিয়াতে যাওয়ার পূর্বে মাত্র ১ লাখ টাকা আমাকে দিবে এবং বাকি ৪ লাখ টাকা লিবিয়াতে পৌঁছানোর পর তোমার পরিবার আমাকে দেবে।

এমন ফাঁদে ফেলে শ্রমিকদের বিদেশে পাঠান তিনি। পরে শ্রমিকরা লিবিয়াতে পৌঁছানোর পরে সেখানে অবস্থান করা অন্যান্য পাচারকারী দলের সদস্যরা ভিকটিমদের জিম্মি করে অতিরিক্ত টাকা দাবি করে। এমনকি শারীরিক নির্যাতন করে। সেই নির্যাতনের ভিডিও ভিকটিমদের পরিবারের কাছে পাঠানো হয়।

লে. কর্নেল রকিবুল হাসান বলেন, আমারা একাধিক দালাল পেয়েছি। তারা মাদারীপুর, শরিয়রতপুরসহ বিভিন্ন জেলার লোক রয়েছে। তারা প্রথমে বাইরুটে ঢাকা থেকে কলকাতা নেয়া হয়। এই হাজী কামালই সবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা বাংলাদেশ থেকে ১০-১৫ দিন লাগে বেনগাজীতে যাওয়ার। এ চক্রটি লিবিয়াতে যাওয়ার পরই তারা টাকার জন্য পেশার দেয়া শুরু হয়।

র‌্যাব জানায়, লিবিয়ার ত্রিপোলিতে কিছু কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এই বেনগাজীতে পৌঁছানোর পরই তাদের পরিবারের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়। এরপর তাদের ত্রিপোলিতে নিয়ে যাওয়া হয়। ত্রিপোলিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আবারও পরিবারের কাছে ২ থেকে তিন লাখ টাকা দাবি করা হয়।

‘সেখানে আদের শুরুতে ভূমধ্যসাগরে বোট চালানোর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তিনি গত ১০-১২ বছরে ৪শ’ লোককে পাঠিয়েছেন। তার সঙ্গে যুক্ত আছেন ১৫-১৬ জন। আমরা পুরো সার্কিটের তথ্য পেয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে এ অভিযান চলতে থাকবে।’

র‌্যাব জানায়, বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় প্রেরণের ক্ষেত্রে চক্রটির সদস্যরা বেশ কয়েকটি রুট ব্যবহার করে থাকে। আবার রুটগুলো তারা সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী মাঝেমধ্যে পরিবর্তন অথবা নতুন রুট নির্ধারণ করে থাকে। সম্প্রতি লিবিয়াতে প্রেরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-কলকাতা-মুম্বাই-দুবাই-মিশর-বেনগাজী-ত্রিপলি (লিবিয়া) রুট ব্যবহার করা হচ্ছিল।

দুবাইয়ে পৌঁছে তাদের বিদেশি এজেন্টদের তত্ত্বাবধানে ৭/৮ দিন অবস্থান করানো হয়। বেনগাজীতে প্রেরণের লক্ষ্যে বেনগাজী হতে এজেন্টরা কথিত ‘মরাকাপা’ নামক একটি ডকুমেন্ট দুবাইতে প্রেরণ করে থাকে। যা দুবাইয়ে অবস্থানরত বিদেশি এজেন্টদের মাধ্যমে ভিকটিমদের নিকট হস্তান্তর করা হয়। অতঃপর ওই ডকুমেন্টসহ বিদেশি এজেন্ট তাদের মিশর ট্রানজিট দিয়ে বেনগাজী লিবিয়ায় প্রেরণ করে। বেনগাজীতে বাংলাদেশি এজেন্ট তাদের বেনগাজী হতে ত্রিপলীতে স্থানান্তর করে।

ভিকটিমরা ত্রিপলিতে পৌঁছানোর পর ত্রিপলিতে অবস্থানরত বাংলাদেশি কথিত কয়েকজন এজেন্ট তাদের গ্রহণ করে। পরে তাদের ত্রিপলিতে বেশ কয়েকদিন অবস্থান করানো হয়। অতঃপর ত্রিপলিতে অবস্থানকালীন সময়ে দেশীয় প্রতিনিধির দ্বারা ভিকটিমদের আত্মীয়-স্বজন হতে অর্থ আদায় করা হয়।

লে. কর্নেল রকিবুল হাসান আরও জানান, অতঃপর ভিকটিমদের ত্রিপলির বন্দর এলাকায় একটি সিন্ডিকেটের নিকট অর্থের বিনিময়ে ইউরোপে পাচারের উদ্দেশ্যে তাদের হস্তান্তর করা হয়। একটি নির্দিষ্ট দিনের ভোররাতে একসঙ্গে কয়েকটি নৌ-যান লিবিয়া হয়ে তিউনেশিয়া উপকূলীয় চ্যানেল হয়ে ইউরোপের পথে রওনা দেয়। এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথে গমনকালে ভিকটিমরা ভূমধ্যসাগরের মাঝে মধ্যেই দুর্ঘটনার শিকার হয় এবং জীবনাবসানের ঘটনা ঘটে।

অর্থসূচক/কেএসআর