তোঘলকি সিদ্ধান্তে বাড়লো ঝুঁকি, বাড়লো বঞ্চনার বেদনাও

0
32
ঈদে বাড়ি যাওয়ার বিষয়ে হঠাৎ নাটকীয়ভাবে অবস্থান বদল করেছে সরকার। গত কিছুদিন ধরে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের অনেক নীতিনির্ধারক ঈদে বাড়ি না যেতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। যে যেখানে অবস্থান করছেন, সেখানেই ঈদ করতে বলা হয়েছে বার বার। এমনকি সর্বশেষ দফায় সাধারণ ছুটি বাড়িয়ে যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে, সেখানেও ঈদে বাড়ি না যাওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে হঠাৎ ইউটার্ন করা হয়েছে। শিথিল করা হয়েছে বাড়ি যাওয়ার শর্ত। তবে নতুন শর্তে শুধু ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকরাই বাড়ি ফিরতে পারবে।
অন্যদিকে একদিন আগেও পুলিশের আইজি ঈদে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন, যাতে ঈদে কেউ বাড়ি না যায়। গ্রামেরবাড়িমুখী মানুষদের হুমকী দিয়েছিলেন, যারা বাড়ির উদ্দেশ্য যাচ্ছেন তারা বাড়িতে ঈদ করতে পারবেন না, রাস্তাতেই ঈদ করতে হবে। কিন্তু হঠাৎ র‍্যাবের ডিজি জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত গাড়ি থাকলে যাওয়া যাবে। বলেছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাড়ি যাওয়ায় আপত্তি নেই। যেসব বিধি মানার কথা বলা হয়েছে, তা মানতে হলে অবশ্যই ব্যক্তিগত গাড়ি থাকতে হবে; তা সেটি সেডান কার হোক অথবা এসইউভি কিংবা মাইক্রোবাস।  খুবই দুঃখজনক, অনেক হতাশার বিষয় এটি।
করোনাভাইরাস মহামারির মতো জাতীয় দুর্যোগকালে দেশে ধনী-গরীবের বিদ্যমান বৈষম্যটা কী এমন কটুভাবে প্রকাশ না করলে চলতো না? করোনাকালে এমনিতে দেশের নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের কষ্টের শেষ নেই। তাদের এমন অমানবিক দুর্ভোগে রাষ্ট্র বা আমরা ঠিকভাবে পাশে দাঁড়াতে পারিনি। সারা বছর কষ্টে থাকা এই মানুষগুলোর জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে করোনাভাইরাস। নিজেদের দরিদ্র অবস্থার কারণে নিশ্চয়ই তাদের আক্ষেপের শেষ নেই। হয়তো প্রতিনিয়ত তারা ভাগ্যকে দোষারুপ করেন। হয়তো চোখের জলে সৃষ্টিকর্তার কাছেও জানতে চান গরীব করে পৃথিবীতে পাঠানোর কারণ। এমন পরিস্থিতিতে আমরা তাদের কাটা গায়ে নুনের ছিটা দিলাম!
গাড়ির মালিকদের দেওয়া বিশেষ সুবিধা সংবিধানের লংঘন। সমতার চেতনার পরিপন্থী
চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে অথবা আগামী মাসের প্রথমভাগে দেশে করোনার সংক্রমণ পিকে (Peak) পৌঁছাতে পারে বলে আশংকরা করা হচ্ছে। বড় বিপর্যয় এড়াতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকদিন আগে থেকেই ঈদের পুরো ছুটি পর্যন্ত কারফিউ জারি করার পরামর্শ দিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা। সেই জায়গায় আমরা সাধারণ বাধাটুকু সরিয়ে নিয়েছি। স্বাভাবিক কারণেই অনেকগুলো প্রশ্ন উঠে আসছে।
০১. এই যে গাড়ির মালিকদের ঈদে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো, এর কী করোনাপ্রুফ? এদের মধ্যে কেউ সংক্রমিত নেই-এমন নিশ্চয়তা কে দিয়েছে?  যদি এদের মধ্যে যদি সংক্রমিত মানুষ থাকেন তাহলে তাদের মাধ্যমে কী গ্রামের বাড়ির আত্মীয়-স্বজনরা সংক্রমিত হবেন না?
০২. সরকারের তরফে কেউ বলতে পারেন, আক্রান্ত হলেও ঢাকা-ফেরতদের আত্মীয়স্বজনই হবে, তাই এর দায়দায়িত্বও তাদের। অন্যদের মাথা না ঘামলেও চলে। কিন্তু জনাব, এটি তো সরল অঙ্কের হিসাব নয়। ঢাকা-ফেরতদের আক্রান্ত স্বজনদের চলাফেরা ঠেকাবেন কী করে? তারা যে মসজিদে গিয়ে, বাজার করতে যেয়ে নির্দোষ মানুষদের সংক্রমিত করবেন তার দায়িত্ব কে নেবে?
০৩. ব্যক্তিগত গাড়িতে করে বাড়ি যাওয়ার অনুমতির খবরের পর থেকে মহাসড়কগুলোতে মানুষের ঢল নেমেছে। বিভিন্ন টেলিভিশনে ফেরিঘাটগুলোর যে ছবি দেখা যাচ্ছে, কাল-পরশুর চেয়ে আজ সেখানে গ্রামমুখী মানুষের ভিড় বেশি। এই এই মানুষগুলোকে বাধা দেওয়ার নৈতিক অবস্থান কী আর আছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সদস্যদের।
গাড়ির মালিকরা যে করোনায় আক্রান্ত নন, এই গ্যারান্টি কে দেবে, তাদের মাধ্যমে গ্রামের নিরীহ মানুষগুলে সংক্রমিত হলে সেই দায় নেবে কে?
০৪. এখনো মূলত  ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জসহ কয়েকটি শহরই করোনার হটস্পট। বেশিরভাগ জেলা, বিশেষ করে গ্রামগুলোর অবস্থা অনেকটা ভালো। এই গ্রামগুলোকে আমরা জেনেশুনে ঝুঁকিতে ফেলছি কেন?
০৫. বড় শহরগুলোতে তবু কিছু চিকিৎসা অবকাঠামো আছে। উপজেলা পর্যায়ে, এমনকি অনেক জেলা হাসপাতালে ভেন্টিলেটর নেই, অক্সিজেনের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। আছে অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি। সেই গ্রামগুলোতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকলে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা কীভাবে হবে? আমরা কী চিকিৎসাহীনভাবে পথেঘাটে মানুষ পড়ে থাকার দৃশ্য দেখার প্রস্তুতি নিয়ে রাখছি?
আমরা কী অল্পসংখ্যক মানুষ নিয়ন্ত্রিত অভিজাততন্ত্রের দিকে যাচ্ছি?
০৬. গ্রামে সংক্রমণ কম হলেও কিছু সংখ্যক মানুষ তো আক্রান্ত হয়েছে। অনেকে হয়তো নিরবে করোনাভাইরাসের জীবাণু বহন করছে। এদের মাধ্যমে ঢাকা থেকে যাওয়া মানুষজন সংক্রমিত হয়ে আবার ঢাকায় নিয়ে আসবে না তো?
০৭. বিশেষজ্ঞরা ধারণা দিয়েছিলেন, মে মাসের শেষ সপ্তাহ অথবা জুনের প্রথম সপ্তাহে দেশে সংক্রমণ পিকে পৌঁছাতে পারে। লাখ লাখ মানুষের ঈদে বাড়ি যাওয়ার ঘটনা এই পিককে প্রলম্বিত করবে। পিক হবে হয়তো জুনের শেষ অথবা জুলাইয়ের প্রথম ভাগে। পিক যত বিলম্বিত হবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তত বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এই অর্থনৈতিক ক্ষতির দায় কার?
০৮. বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে, দেশে সেডান কারের সংখ্যা ৩ লাখ ৬৮ হাজার ২৬৭ টি। আর স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল বা এসইউভি (সাধারণভাবে জিপ নামে পরিচিত) আছে ৬৫ হাজার ৩৭১টি। আর মাইক্রোবাস আছে ১ লাখ ৫ হাজার ৩৯৬টি। সাধারণ মাইক্রোবাসগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধিত এবং এগুলো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। যদি এগুলোকেও ব্যক্তিগত গাড়ি ধরা হয়, তাহলে মোট ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৩৪টি। যদি প্রত্যেক গাড়িধারী পরিবারের ৫ জন সদস্য ধরা হয়, তাহলে ব্যক্তিগত গাড়ির সুবিধাভুগী মানুষের সংখ্যা মাত্র ২৬ লাখ ৯৫ হাজার। এই স্বল্প সংখ্যক মানুষকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে ১৫ কোটি ৭৩ লাখ বা ৯৮ শতাংশ মানুষকে বঞ্চিত করছি। তবে কী আমরা অভিজাততন্ত্রের ( Aristocracy) দিকে এগুচ্ছি? সংবিধানে বর্ণিত গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে যাচ্ছি?
ঢাকা-ফেরতদের মাধ্যমে গ্রামে সংক্রমণ
০৯. শুধু ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকদের বাড়ি যাওয়ার সুযোগ দিয়ে আমাদের সংবিধানের মূল চেতনায় আঘাত হানা হয়েছে। সংবিধানের একাধিক জায়গায় বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রে বৈষম্যহীনতার কথা বলা আছে। বলা হয়েছে, সমতার কথা। এমনকি সুস্পষ্টভাবে চলাচলে সবার সমান স্বাধীনতার কথাও বলা হয়েছে তাতে। এ বিষয়ে সংবাধানের ৩৬নং অনুচ্ছেদ বলা হয়েছে, আইন মোতাবেক বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা, এর যে কোন স্থানে বসবাস ও বসতিস্থাপন এবং বাংলাদেশ ত্যাগ ও বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশ করবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে।
করোনা মোকাবেলার জন্য যদি তাদের এই চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে, তাহলে ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকদের চলাচল কেন নিয়ন্ত্রণ হবে না?
সংবিধানের দোহাই দিয়ে আমরা অনেক কিছুই করি, যা করা উচিত নয়। আবার খেয়ালখুশিমত সেই সংবিধানের চেতনাকেই ভূ-লুণ্ঠিত করতে আমাদের বাঁধছে না। এমন পরিস্থিতিতে নিজের অজান্তেই মুখে চলে আসে-‘সত্যি সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ’।
কিন্তু আমরা তো এই বিচিত্র বাংলাদেশ চাই না। এমন দেশের জন্য ৩০ লাখ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হননি। এমন বাংলাদেশের জন্য জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে ফাঁসির দণ্ড নিয়ে সময় পার করেনি। তিনি তো সাত কোটি মানুষেরই নেতা ছিলেন, কতিপয় অভিজাত ধনীদের নন। সারাটি জীবন তিনি সাধারণ মানুষের কল্যাণেই ব্যয় করেছেন। এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসীন হয়েও তিনি তার দরজা খোলা রেখেছিলেন সাধারণের জন্যে, একবারও তা বন্ধ করেননি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। এই দেশ ও মানুষের প্রতি আপনার ভালোবাসা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটি দুর্যোগে আপনার মলিন চেহারাই বলে দেয়, কতটা নিখাঁদ আপনার ভালোবাসা। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে, আপনার চারপাশের কিছু মানুষ, প্রশাসনের কিছু লোক ঠিক সঠিক পরামর্শ আপনাকে দিচ্ছে না। ব্যক্তিগত অথবা তাদের গোষ্ঠিগত (অভিজাততন্ত্রের বাসনা থেকে হয়তো) স্বার্থে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকেই কথিত অভিজাতরা দেশকে বিপথে নিয়ে চলেছে, মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা থেকে সরিয়ে নিচ্ছে। এরা আপনাকেও ভুল পথে চালিত করার চেষ্টা করছে। আপনার, আওয়ামী লীগের কিংবা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষতি হলে তাদের কিছুই যায় আসে না, কারণ তাদের আসল ঠিকানা অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র অথবা নিদেনপক্ষে মালয়েশিয়া। তাদের সব চেষ্টা বৈধ-বৈবধভাবে এখানে সম্পদ অর্জন করে ওই ঠিকানায় পাঠানো। দয়া করে একটু সতর্ক হোন। তাদের তৈরি কৃত্রিম ব্যারিকেড ভেঙ্গে গণমানুষের প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠুন, যেমন গণমানুষের নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু।
* লেখকঃ সম্পাদক, অর্থসূচক
e-mail. ziabd71@gmail.com