বিপ্লবী মার্কসীয় তাত্ত্বিক পুরুষ রেবতী মোহনের ৬২তম মৃত্যু বার্ষিকী

0
243
রেবতী মোহন বর্মণ

শ্রেণি সংগ্রামের তত্ত্বই সমাজ বিবর্তনের সূত্র-এ সূত্রে বিশ্বাসী, শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আজীবন বিপ্লবী সৈনিক, মার্কসীয় তাত্ত্বিক পুরুষ রেবতী মোহন বর্মণের ৬২তম মৃত্যু বার্ষিকী আজ। ১৯৫২ সালের ৬ মে মৃত্যুর পর থেকে ৬২ বছরের ব্যবধানে নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানেনা তাঁর জন্ম-মৃত্যু, জীবনবোধ ও জীবনচর্চার কালোত্তীর্ণ ইতিহাস। অন্যদিকে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্রতম ও নানা সংকটে নিপতিত বাংলাদেশে বিজ্ঞানমনস্ক, সাম্প্রদায়িকতা ও কুসংস্কারমুক্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে তাঁর কর্মকে নতুন করে আবিস্কারের তাগিদ অনুভব আজ সময়ের দাবি বলে অনেকেরই ধারণা।

রেবতী মোহন বর্মণ
রেবতী মোহন বর্মণ

রেবতী মোহন বর্মণ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সেই ঐতিহাসিকক্ষণে বর্তমান ভৈরব উপজেলার শিমূলকান্দি গ্রামে এক শিক্ষিত বিত্তশালী বর্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হরনাথ বর্মণ ছিলেন একজন নামকরা আইনজীবী। ইংরেজদের প্রতি আনুগত্যের জন্য তিনি রায়উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে চতুর্থ রেবতী মোহন বর্তমান ব্রাক্ষ্মণণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার চুন্টা গ্রামের একটি স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। ছাত্রাবস্থায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে অসহযোগ ও স্বদেশী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ায় হুলিয়া জারির কারণে বিভিন্ন স্কুল পরিবর্তনের পর ১৯২২ সালে কিশোরগঞ্জ আজিমুদ্দিন হাই স্কুলের ছাত্র হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। একই বছর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯২৮ সালে কৃতিত্বের সাথে এম.এ পাশ করার পর বেণুনামক একটি মাসিক পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নেন।

রেবতী বর্মণের রাজনীতি শুরু স্কুল জীবন থেকেই। বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজের জীবনাদর্শের প্রভাবে তিনি মার্কসীয় তত্ত্বে আকৃষ্ট ঢাকার শ্রী সংঘেরসদস্য হিসেবে কলকাতা, বাকুড়া, ও বীরভূমের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। ফলে ১৯৩০ সালে রাজপুতনায় ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক গ্রেপ্তার হয়ে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত কারাগারে বন্দী থাকেন। জেলে থাকাকালীন তিনি সমাজ বিবর্তনমূলক অসংখ্য গ্রন্থের পান্ডুলিপি রচনা করেন। সেসব পান্ডুলিপি থেকে পরে ১৭টিকে বই আকারে প্রকাশ করা হয়। যা বর্তমানে অত্যন্ত মূল্যবান গ্রন্থ হিসেবে বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়ে সারা বিশ্বে পঠিত হচ্ছে।

জনশ্রুতি রয়েছে, জেলে থাকাকালীন ব্রিটিশ সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে ওই বিপ্লবী নেতার দেহে কুষ্ঠের জীবানু অনুপ্রবেশ ঘটালে তিনি ঘাতকব্যাধি কুষ্ঠে আক্রান্ত হন এবং ১৯৪৯ সালে নিজ জন্মভূমি ভৈরবে চলে আসেন। সে সময় তিনি কুষ্ঠুরোগাক্রান্ত পঁচন ধরা আঙুলে রশি দিয়ে হাতের সাথে কলম বেঁধে রচনা করেন তাঁর অমর গ্রন্থ সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ।

১৯৩৮ সালে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে এলাকার শিশুদের শিক্ষিত করে তুলতে স্থাপন করা হয় একটি প্রাইমারী স্কুল। যা পরবর্তিতে শিমূলকান্দি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে পরিগনিত হয়। কুষ্ঠু আক্রান্ত রেবতী মোহন ভৈরবে আসার পর শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ঘরের বেড়ার (পার্টিশনের) আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখে অপর পাশ থেকে ছাত্র পড়াতেন।

১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িক চেতনায় বিভক্ত ভারত বর্ষের পাকিস্তান অংশে অসাম্প্রদায়িক সমাজ সংস্কারক রেবতীর বিরুদ্ধে ধর্মান্ধগোষ্ঠী এলাকাবাসীকে ক্ষেপিয়ে তোলে। তাঁর বিরুদ্ধে নেতিবাচক কথা-বার্তা শুরু হলে ১৯৫০ সালে তিনি তাঁর প্রিয় জন্মভূমি ভৈরব ছেড়ে ভারতের আগরতলায় চলে যেতে বাধ্য হন। সেখানে ১৯৫২ সালের ৬ মে আত্মীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজনবিহীন একান্ত নিভৃতে এক খড়ের চালায় ৪৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন কালোত্তীর্ণ এ মহাপুরুষ।

ভৈরবের শিমূলকান্দি গ্রামের যে বাড়িটিতে তিনি হেঁটে বেড়াতেন আপনমনে, পরিকল্পনা করতেন শাসক ও শোষকগোষ্ঠী ইংরেজদের তাড়াতে কিংবা সমাজ বিবর্তনের নতুন কোন সূত্র লিখতেন কাগজের সাদা জমিনে। স্বপ্ন দেখতেন শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠছে এলাকার অনগ্রসর সমাজ। সে বাড়িতে আজ তাঁর কোন স্মৃতিই অবশিষ্ট নেই। চরম অযতেœর ফলে পিতৃভিটায় থাকা ইট-সুড়কির দালানটিও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। রয়ে গেছে কেবল বাড়ির পিছনের দুটি পুকুর। পুকুরের দুপাশের গাছ-গাছালি। জোড়া জোড়া তালের গাছ, মেঠোপথ। অসাম্প্রদায়িক রেবতীকে ধর্মের বিভাজনের জন্য জন্মভূমি ছেড়ে চলে যেতে হলেও, তালগাছের শাখে বাবুই-চড়–ইপাখিরা মিলে-মিশে আছে আজও। মানুষের মতো হয়তো ওরা দ্বি-জাতি তত্ত্বের উত্তাপ পায়নি বলে। তবে খুব বেশি দেরি হয়ে গেলেও, নতুন প্রজন্ম কালোত্তীর্ণ রেবতীমোহন বমর্ণকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। সে ভাবনার ফল হিসেবে প্রগতি কেন্দ্র ১৯৯৯ সালে রেবতীমোহন স্মারকগ্রন্থ কালোত্তীর্ণ রেবতীমোহন বমর্ণপ্রকাশ করে। অপরদিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে শিমূলকান্দি হাই স্কুলের সামনে একটি স্মৃতি ফলক নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতি বছর স্থানীয়ভাবে ৬ মে নানা কর্মসূচীতে পালন করছে ভৈরববাসী।

সাকি/