পুঁজিবাজারে ফের হাহাকার অস্থিরতা, নেপথ্যে চার কারণ

0
120

DSEX Redআবার অস্থির হয়ে উঠেছে পুঁজিবাজার। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা জেঁকে বসছে বিনিয়োগকারীদের ভেতর। ছড়িয়ে পড়ছে হাহাকার। চরম মন্দ একটা সপ্তাহ পার করার পর নতুন সপ্তাহের লেনদেনও শুরু হয়েছে একই ধারায়। বাজারের এ ধারায় কর্পুরের মতো উবে যাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের আস্থা, স্বস্তি।

গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স ১৩৫ পয়েন্ট কমেছিল। ওই সপ্তাহে লেনদেন হয়েছিল চারদিন। আর ওই চারদিনের প্রতিদিনই সূচক কমেছে বাজারে।

আজ রোববার সপ্তাহের প্রথম দিনে নিম্নমুখী ধারায় লেনদেন শুরু হওয়ায় প্রবল আতঙ্ক পেয়ে বসে বিনিয়োগকারীদের। আগের সপ্তাহের মতো টানা দর পতন হতে পারে এমন আতঙ্কে যে কোনো মূল্য শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে নিরাপদ অবস্থানে চলে যাওয়ার জন্য অনেকে ব্যাকুল হয়ে উঠেন। এতে বাজারে বিক্রির চাপ বেড়ে যায়। দর হারায় লেনদেনে অংশ নেওয়া ৬৫ ভাগ কোম্পানির শেয়ার। ডিএসইএক্স কমে যায় ৬২ পয়েন্ট। লেনদেন কমে ২৪ শতাংশ।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মূলত চার কারণে বাজারের অবস্থা নাজুক হয়ে উঠেছে। এ কারণগুলো হচ্ছে- পুঁজিবাজারে ব্যাংকের সীমাতিরিক্ত বিনিয়োগ সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থান, আগামি অর্থবছরের বাজেট নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আশাভঙ্গ, ফের রাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার আশংকা এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বড় অংশের দূর্বল পারফরমেন্স তথা তাদের মুনাফা কমে যাওয়া।

আলোচিত কারণগুলোর মধ্যে মাত্র একটি সরাসরি বাজার সংশ্লিষ্ট। বাকী তিনটি কোনো না কোনোভাবে সরকার ও তার নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থার এখতিয়ারের সঙ্গে যুক্ত। তাই সরকার চাইলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।

ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রহমত পাশা বাজার আচরণ সম্পর্কে বলেন, মূলত তিনটি কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্য আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংককে পুঁজিবাজারে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ কমিয়ে সীমার মধ্যে নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ কঠোর অবস্থান নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

আসছে বছরের বাজেটকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ভেবেছিলেন বাজেটে তাদের জন্য কোনো ধরনের প্রণোদনা থাকতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সম্পর্কে যে আভাস পাওয়া যাচ্ছে তাতে বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য যে তেমন কিছু থাকছে না-তা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এছাড়া জানুয়ারির নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সংঘাত ও অস্থিরতা কেটে গেছে বলেই মনে করেছিলেন সবাই। কিন্তু সম্প্রতি আবার এক ধরনের চাপা উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

অন্যতম শীর্ষ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের বাজার বিশ্লেষণেও দর পতনের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা সংক্রান্ত মনস্তাত্ত্বিক চাপকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টের বাজার পর্যালোচনা রিপোর্টে বাজারের গতি হারানোর পেছনে কোম্পানিগুলোর দূর্বল পারফরমেন্সকেও অনেকটা দায়ী করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি খাত গত বছরের শেষভাগের রাজনৈতির অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সম্ভবত সে কারণেই বেশিরভাগ কোম্পানির আয় গত প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) কমেছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিত ও অর্থনৈতিক অবস্থা স্বাভাবিক থাকলে চলতি প্রান্তিকেই (এপ্রিল-জুন) হয়তো কোম্পানিগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তবে তা নির্ভর করবে অনেকটা সরকারের উপর। দেশে আবার কিছুটা রাজনৈতিক অস্থিরতার আভাস স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে সম্ভাব্য অস্থিরতা এড়াতে হবে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত তার অবস্থানে কঠোর না থেকে সামগ্রিক পরিস্থিতি ও পুঁজিবাজারের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। ব্যাংকগুলোকে শিগগীরই বাড়তি বিনিয়োগ সমন্বয়ের চাপ দিলে বাজারে তার তীব্র প্রভাব পড়বে। কারণে বর্তমান মন্দা বাজারে এসব প্রতিষ্ঠান শেয়ার বিক্রি শুরু করলে তাতে মন্দা আরও দীর্ঘায়িত হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকেও লোকসানে শেয়ার বেচতে হবে। কিন্তু বাড়তি বিনিয়োগ সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত সময় পেলে সুবিধাজনক সময়ে, যখন বাজার কিছুটা গতিশীল থাকে তখন ধীরে ধীরে শেয়ার বিক্রি করতে পারবে। তাতে বাজারেও তেমন চাপ পড়বে না।

এছাড়া বাজেটে দ্বৈত কর প্রত্যাহার, করপোরেট কর হার কমানো, পুঁজিবাজারের জন্য বিশেষ বরাদ্দ ইত্যাদি রাখা যেতেই পারে। তাতে সাময়িকভাবে সরকারের রাজস্ব কমলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা আরও বাড়বে।