পুলিশি ক্যাম্পাসে নিরাপত্তাহীনতায় রাবি শিক্ষার্থীরা

0
85
rabi-logo
রাবি লোগো

rabi-logoরাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার সব দায়িত্ব  পুলিশ প্রশাসনের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত  শিক্ষার্থীদের পরিবর্তে পুলিশের পদচারণায় ভারি হয়ে উঠছে রাবি ক্যাম্পাস।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ২০০৯ সাল থেকে রাবি প্রশাসন অস্থায়ীভাবে পুলিশ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণকরলেও ক্যাম্পাস থেকে তাদের আর সরানো হয়নি। বর্তমানে রাবির ১১টি আবাসিক হলে প্রায় ৭০ জন পুলিশ অবস্থান করছেন।

এছাড়া ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদার করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক, কাজলা, বিনোদপুর, চারুকলা গেট, বধ্যভূমি ও বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন গেটে ৭ থেকে ৮ জন করে পুলিশ রাখা হয়েছে। উপাচার্যের বাসভবনের সামনে ও প্রশাসন ভবন-১ এ ৬ জন, সিনেট ভবনে ১০ জন, ছাত্রসংগঠনের টেন্টগুলোতে সর্বদা ৭-৮ জন করে পুলিশ রাখা হচ্ছে। সবমিলিয়ে পুরো ক্যাম্পাসে প্রায় তিন শতাধিক পুলিশ অবস্থান করছে। কিন্তু শুধু নীরব অবস্থান ছাড়া ক্যাম্পাসে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দমাতে পুলিশের কোনো ভূমিকা চোখে পড়েনি কখনো।

এদের সবাইকে সার্বক্ষণিক পরিচালনা করেন পুলিশের দুজন ঊর্ধ্বতন র্কমর্কতা। আর মতিহার থানার ওসির মাধ্যমে পুরো ক্যাম্পাসে পুলিশের সব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। অথচ ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে পুলিশ। পুলিশের ব্যর্থতায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন আতঙ্কে রয়েছেন অপরদিকে তাদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ।

কারণ এসব খোয়াড়ের ভেতরে থেকেও শিবিরের নৃশংস হামলা, ছাত্রসংগঠনগুলোর সংঘাত-সংঘর্ষ, নিরীহ শিক্ষার্থীদের মারধর, ছাত্রলীগের বেপরোয়া চাঁদাবাজী-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে এখন আতঙ্কের ক্যাম্পাসে পরিণত হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এসব ঘটনায় সুস্থভাবে শিক্ষাজীবন শেষ করা নিয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থীরা।

ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন পয়েন্টে তিন শতাধিক পুলিশ মোতায়েন থাকলেও তা কোনো কাজে আসছে না। রাবি ক্যাম্পাসে যতগুলো হত্যা, হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে সবগুলোতে পুলিশ ছিল নীরব দর্শক। আবার এসব খুন, হামলার সঙ্গে কারা জড়িত তারও কোনো রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। তদন্ত চলছে চলছে করে বহমান অনেকগুলো তদন্তের মাধ্যমে এখন শিক্ষার্থীদের সাথে চলছে শুধু প্রহসন।

গত মঙ্গলবার সকালে দুটি আবাসিক হলের মাঝে ছাত্রলীগ নেতা মাসুদ হোসেন ও টগর মোহাম্মদ সালেহের ওপর হামলা চালায় শিবির ক্যাডাররা। প্রথমে একটি ককটেল ফাটিয়ে হামলা চালায় তারা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তারা যেখানে হামলার শিকার হয়েছেন তার ৩০ গজের মধ্যে শহীদ জিয়াউর রহমান ও শহীদ হবিবুর রহমান হল। যেখানে হল গেটে সার্বক্ষণিক ৫-৬ জন পুলিশ থাকে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জিয়াউর রহমান হলের কয়েকজন আবাসিক শিক্ষার্থী জানান, হামলার সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা উচ্চস্বরে চিৎকারও করেছে। কিন্তু তাদের বাঁচাতে পুলিশ এগিয়ে আসেনি। এমনকি হামলা শেষে হামলাকারীরা যখন হবিবুর রহমান হলের মাঠ দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায় তখনও পুলিশের কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। পুলিশের এমন নিস্ক্রিয়তায় এখন আতঙ্কপুরিতে পরিণত হয়েছে রাবি। পুলিশ তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে অপরাধীরা এত সহজে অপরাধ করে পার পেত না বলে মনে করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

এর আগে গত ৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের নিজ কক্ষে দুপুরে খুন হয় ছাত্রলীগ নেতা রুস্তম আলী আকন্দ। ওই সময়েও হল গেটে ৪-৫ জন পুলিশ কর্তব্যরত ছিল। এ ঘটনার এক মাস পার হলেও খুনের ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।

গত ২৭ এপ্রিল দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কাজলা গেট এলাকায় হিসাব বিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক ছাত্রীকে ছুরিকাঘাত করে স্থানীয় এক যুবক। ঘটনাস্থলের ১০ গজের মধ্যে কাজলা গেটে একটি পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। যেখানে অন্তত ৮-১০ জন পুলিশ দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু অপরাধীকে ধরতে তারা তাৎক্ষণিক কোনো তৎপরতা দেখাননি।

পুলিশের উদাসীনতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময় অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন অপরাধীরা। ক্যাম্পাসে ছিনতাই, শ্লীলতাহানিসহ প্রায়ই বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটলেও নিস্ক্রিয় ভূমিকায় থাকে পুলিশ।

রাবির বিভিন্ন আবাসিক হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুরো ক্যাম্পাস পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। অথচ পুলিশ নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। রাবি প্রশাসন পুলিশের হাতে দায়িত্ব দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব থেকে অবসরে যাওয়ার ফলেই ক্যাম্পাসে নিয়মিত এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিকেলের পর ক্যাম্পাসের রাস্তায় চলার সময় মোটরসাইকেল দেখলেই আতকে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। মোটরসাইকেল নিয়ে ক্যাম্পাসে ছিনতাই, ছাত্রীদের শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটছে অহরহ। দুর্বৃত্তরা অপরাধ ঘটিয়ে দ্রুত সটকে পড়ছেন মোটরসাইকেল নিয়ে। এ দুর্বৃত্তদের বেশিরভাগ স্থানীয় বখাটে হলেও তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরি মাঠ, পুরাতন ফোকলোর চত্বর, তৃতীয় বিজ্ঞান ভবনের সামনের ও পেছনের রাস্তা, সাবাশ বাংলাদেশ চত্বর, হবিবুর রহমান মাঠ ও বধ্যভূমি এলাকা ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য। এসব এলাকায় প্রায়ই ঘটে ছিনতাইয়ের ঘটনা।

রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (পূর্ব) প্রলয় চিচিম বলেন, ‘পুলিশ তার কাজ করে যাচ্ছে। একজন অপরাধীকে ধরা অনেক কঠিন কাজ। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি’। ক্যাম্পাসে পুলিশ যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে বলে দাবি করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, ‘ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পুলিশের ওপর ন্যস্ত আছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাসহ অপরাধ দমনে তারাই কাজ করছে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে আরও তৎপর হওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

এমআই/সাকি