লাগাম ছাড়া লাফার্জ, খোদ কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন

0
165
lafarge surma price correction
লাফার্জ কোম্পানি ও লোগো

lafarge surma price correctionতালিকাভুক্তির পর থেকে জেড ক্যাটাগরিতে পড়ে থাকা লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট লিমিটেডের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে। লাগাম ছাড়া ঘোড়ার মত ছুটছে এই শেয়ার। গত এক মাসে শেয়ারটির দাম বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ। আর দুই মাসে বেড়েছে প্রায় ৯৫ শতাংশ। রোববার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লাফার্জের আয়ের তুলনায় প্রায় ৩৩ গুণ দামে কেনা-বেচা হয়েছে এর শেয়ার।

লাফার্জ সুরমা সিমেন্টের শেয়ার মূল্যের এ ধারায় উদ্বিগ্ন খোদ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কোম্পানির একজন উর্ধতন কর্মকর্তা অর্থসূচককে বলেন, বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। কোম্পানির প্রবৃদ্ধির ধারা এ মূল্যকে সমর্থন করে না। আগামিতে অলৌকিক কিছু না ঘটলে যে মুনাফা হবে তাতে বিনিয়োগকারীরা তুষ্ট না-ও হতে পারেন। এমন অবস্থায় শেয়ারটির দাম পড়ে যাবে।ক্ষতিগ্রস্ত হবেন অসংখ্য বিনিয়োগকারী। একটি বহুজাতিক কোম্পানি হিসেবে এটি তাদের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর।

তিনি আরও বলেন, অন্য বহুজাতিক কোম্পানি হোলসিমের সঙ্গে একীভুতকরণের কারণে শেয়ার মূল্যের এমন উল্লম্ফনের যৌক্তিকতা নেই। কারণ কোম্পানি দুটি একীভুত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও এখন পর্যন্ত অনেক বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গেছে।এ বিষয়গুলো চূড়ান্ত হতে আরও ৭/৮ মাস সময় লেগে যেতে পারে। তাই এখনই বুঝার উপায় নেই একীভুতকরণের ফলে কিভাবে কতটুকু লাভবান হবেন লাফার্জ সুরমার বিনিয়োগকারীরা।

এদিকে কোম্পানির একটি সূত্র জানিয়েছে, গত ৩১ মার্চ সমাপ্ত প্রান্তিকে মুনাফার পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের চেয়ে কিছুটা কমে যেতে পারে। ২০১৩ সালের প্রথম প্রান্তিকে লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট ৭০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছিল। শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) দাঁড়িয়েছিল ৬০ পয়সা। বিমা পলিসির ক্ষতিপূরণ পাওয়ায় তখন মুনাফা বেড়েছিল বলে জানিয়েছে সূত্রটি। অন্যদিকে গত বছরের সর্বশেষ প্রান্তিকে মুনাফা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বিলম্বিত করের (ডেফার্ড ট্যাক্স) জন্য সংরক্ষিত অর্থ। এবার প্রথম প্রান্তিকে এ ধরণের কোনো আয় যুক্ত হচ্ছে না।

সূত্র জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের শেষভাগে অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট।

বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, লাফার্জ ও হোলসিমের একীভুতকরণকে সামনে রেখে লাফার্জের শেয়ার মূল্য নিয়ে কারসাজি চলছে। বিনিয়োগকারীদের উস্কে ছড়ানো হচ্ছে নানা গুজব। এর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর গুজবটি হচ্ছে-একীভুতকরণ প্রক্রিয়া শেষ হলে লাফার্জের শেয়ারহোল্ডাররা কোনো টাকা ছাড়াই হোলসিমের শেয়ার পাবেন।

২০০৩ সালে গ্রিনফিল্ড কোম্পানি হিসেবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট এখন পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। বিশাল বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সিমেন্ট ফ্যাক্টরি লাফার্জ সুরমা প্রতিষ্ঠার ৫ বছর পর ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো মুনাফার মুখ দেখে। কিন্তু পরের বছরই এটি দূর্ভাগ্যের কবলে পড়ে। পরিবেশবাদীদের করা করা এক মামলার প্রেক্ষিতে ভারতের মেঘালয়ে অবস্থিত নিজস্ব খনি থেকে চুনা পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে গেলে সঙ্কটে পড়ে কোম্পানিটি। দীর্ঘ আইনী লড়াইয়ের পর ২০১২ সালে ভারতের সুপ্রীমকোর্টের রায়ের মাধ্যমে চুনা পাথর উত্তোলনের অধিকার ফিরে পায় কোম্পানিটি। ফলে ২০১২ সালে ফের মুনাফায় ফিরতে সক্ষম হয় লাফার্জ সুরমা। এদিকে চলতি মাসের প্রথম ভাগে বিশ্বের আরেকটি বড় সিমেন্ট প্রস্তুতকারী কোম্পানি হোলসিম ও লাফার্জ একীভুত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আর তার পর থেকেই হুহু করে বাড়তে থাকে লাফার্জ সুরমা সিমেন্টের শেয়ারের দাম।

গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগে শেয়ারটির দাম ছিল ৩৭ টাকা । আর আগের মাসে ছিল ৩১ টাকা। এক মাসের ব্যবধানে এটি বেড়ে হয় ৪৬ টাকা। কোম্পানিটি ভালো মুনাফা করেছে এবং প্রথম বারের মতো লভ্যাংশ দেবে এমন গুজবেই শেয়ার দরের উল্লম্ফন ঘটে। শেষ পর্যন্ত লভ্যাংশ না দেওয়ায় শেয়ারের দাম একটু পড়ে যায়। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই আবার তা ঘুরে দাঁড়ায়। আর হোলসিম-লাফার্জের একীভূতকরণের খবরে শেয়ারের দর বৃদ্ধির পালে নতুন বাতাস লাগে। গত একমাসে শেয়ারটির দাম বেড়ে ৪৬ টাকা থেকে ৭২ টাকা হয়েছে। দাম বেড়েছে ২৬ টাকা বা ৫৭ শতাংশ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিশ্লেষক বলেন, লাফার্জের কাছাকাছি ঘটনা গ্রামীণ ফোন আর  বাংলালিংকের স্পন্সরদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। রাশিয়ার ভিম্পেলকম কিনে নিয়েছে বাংলালিংকের মালিক ওরাসকমকে। অন্যদিকে গ্রামীণফোনের প্রধান স্পন্সর টেলিনরেরও একটি বড় অংশ কিন নিয়েছে ভিম্পেলকম। কিন্তু তাতে স্থানীয় পর্যায়ে গ্রামীণফোন ও বাংলালিংকের কাঠামো, ব্যববসা বা সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আসে নি। লাফার্জ সুরমা এবং হোলসিমের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটতে পারে।

তার মতে, কেন্দ্রীয়ভাবে লাফার্জ ও হোলসিমের একীভূত হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে কোম্পানি দুটির সত্ত্বা আলাদাই থেকে যেতে পারে। কোম্পানি দুটির মালিকানার কাঠামো, সম্পর্ক ও ব্যবসা থাকতে পারে অপরিবর্তিত। এ ক্ষেত্রে এমন হতে পারে-দুটি কোম্পানিই তাদের মুনাফা ও লভ্যাংশের অর্থ পৃথকভাবে মূল কোম্পানির কাছে পাঠাবে। সেখানে গিয়ে এ অর্থ একীভূত কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। এমনটি হলে স্থানীয় তথা বাংলাদেশী শেয়ারহোল্ডারদের ভাগ্যে নতুন কিছুই যোগ হবে না।  তাই অন্ধের মতো এ শেয়ারে বিনিয়োগ না করে যাচাইবাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।