দুই বছরের সর্বোচ্চ দামে গ্রামীণ ফোন

0
41

GP_Graphপুঁজিবাজারে টেলিকম খাতের একমাত্র কোম্পানি গ্রামীণ ফোন (জিপি) অনেক দিন পর নড়েচড়ে উঠেছে। লেনদেন, শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি-সব দিক থেকেই গতিশীল হয়ে উঠেছে এ কোম্পানির শেয়ার। গত কিছুদিন ধরেই টানা এ শেয়ারের দাম বাড়ছে।

মঙ্গলবার ১১ তম দিনের মত দাম বেড়ে এর অবস্থান দাঁড়ায় ২৬৯ টাকা। এটি গত দুই বছরের মধ্যে এ কোম্পানির সর্বোচ্চ দাম। অবশ্য এর আগের সর্বোচ্চ দামকে পাঁচদিন আগেই ছাড়িয়ে গেছে জিপি। এখনও শেয়ারটির দামের উর্ধগতি বজায় আছে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) জিপির শেয়ারের দাম ছিল ২১৮ টাকা। তবে সেখান থেকে পরের বছরের (২০১৩) এপ্রিল পর্যন্ত দাম শুধু নিচেই নেমেছে। পরে সেখান থেকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে ২০১৩ সালের জালাই মাসের শেষ ভাগে এটি বেড়ে ২৩৮ টাকা পর্যন্ত উঠে। মাঝখানে কিছুটা উঠা-নামার পর গত মার্চ মাস থেকে শেয়ারটির দর ফের উর্ধমুখী হতে থাকে। গত ৭ এপ্রিল এটি গত বছরের সর্বোচ্চ দরকে ছাড়িয়ে যায়।

শুধু শেয়ারের দর বৃদ্ধি নয়, লেনদেনেও বেশ গতি সঞ্চার হয়েছে। মঙ্গলবার ডিএসইতে কোম্পানিটি লেনদেনে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তিনটি কারণে গ্রামীণফোনের শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক বেড়ে থাকতে পারে। এগুলো হচ্ছে-শেয়ারটির মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও যৌক্তিক পর্যায়ের কাছাকাছি থাকা, এনবিআরের সঙ্গে চলমান দেড় হাজার কোটি টাকার কর বিরোধ নিষ্পত্তির সম্ভাবনা এবং সর্বশেষ প্রান্তিকে ভাল মুনাফার আশাবাদ।

বড় মূলধনের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের মূল্য পরিবর্তনে সম্প্রতি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অবস্থান বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা যেসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়ায় সেগুলোর চাহিদা ও দাম বেড়ে যায়। আর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ার রয়েছে পছন্দের সামনের সারিতে।

গত ৬ মাসে প্রায় সব বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ারের দাম অনেক বাড়লেও গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রে ছিল অনেকটা ব্যাতিক্রম। তাই অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় গ্রামীণফোনের মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও কিছুটা কম। তাই এই শেয়ারকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে থাকতে পারেন বিনিয়োগকারীরা।

উল্লেখ, একটি শেয়ারের দাম কতটা বেশি বা কম তা বোঝাতে মূল্য-আয় অনুপাতের আশ্রয় নিয়ে থাকেন বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী। একটি শেয়ারের বাজার মূল্য তার আয়ের কতগুণ তা মূল্য-আয় অনুপাতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। শেয়ারের বাজার মূল্যকে তার আয় দিয়ে প্রকাশ করলে ওই অনুপাত পাওয়া যায়। ধরা যাক-এবিসি কোম্পানির শেয়ার প্রতি আয় ৩ টাকা। আর তার বাজার মূল্য ৪৫ টাকা। এ ক্ষেত্রে  শেয়ারটির মূল্য-আয় অনুপাত হবে ১৫। শেয়ারের দাম বেড়ে গেলে মূল্য-আয় অনুপাতও বাড়ে। তাই তুলনামূলক মূল্য-আয় অনুপাত যত কম হয় সে শেয়ারকে তত বেশি শস্তা ও কম ঝুঁকিপূর্ণ কমে করা হয়। আবার অনুপাত বেশি হলে ওই শেয়ারকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়। সাধারণভাবে মূল্য-আয় অনুপাত ২০ বা তার কম হলে ওই শেয়ারকে বিনিয়োগের জন্য বেশি উপযোগী মনে করা হয়।

ডিএসই থেকে পাওয়া পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বর্তমানে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে গ্রামীণফোনের মূল্য-আয় অনুপাতই সবচেয়ে কম। সর্বশেষ বছরের নিরীক্ষিত হিসাব অনুসারে গ্রামীণফোনের মূল্য-আয় অনুপাত ২৪ তবে সর্বশেষ প্রান্তিকগুলোর ভিত্তিতে নিরুপিত বার্ষিক ইপিএস ও কয়েকটি কোম্পানির সম্প্রতি প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে মূল্য-আয় অনুপাতে কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে সিম প্রতিস্থাপন কর বিষয়ে গ্রামীনফোনসহ চারটি মোবাইল ফোন অপারেটরের সঙ্গে এনবিআরের বিরোধ চলছে। কোম্পানি চারটির কাছে এনবিআর তিন হাজার কোটি টাকা বকেয়া কর দাবি করছে, যার মধ্যে গ্রামীণফোনের রয়েছে ১ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। কোম্পানি চারটি এ দাবিকে অযৌক্তিক ও বাস্তবতাবর্জিত বলে দ্বিমত প্রকাশ করে আসছে। বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকটি আন্ত:মন্ত্রণালয় বৈঠক হলেও তাতে সমাধান আসেনি। কিন্তু গত সপ্তাহে কোম্পানি চারটির সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন জানান, প্রধানমন্ত্রী তাকে দ্রুত এ বিরোধের নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর তাতেই কোম্পানি চারটির মনে আশার সঞ্চার হয়েছে।

এদিকে বাজারে জোর প্রচারণা রয়েছে গত প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) গ্রামীণফোন ভাল ব্যবসা করেছে। বিশেষ করে তৃতীয় প্রজন্মের (থ্রিজি) ফোনে ব্যাপক সাড়া পেয়েছে তারা। ফলে শেয়ার প্রতি ভাল আয়ের (ইপিএস) আসবে বলে আশা করছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

সব মিলিয়ে গ্রামীণফোনের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক বেড়েছে। অন্যদিকে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অনেক শেয়ারের মূল্য-আয় অনুপাত কম হলেও তার উপর আস্থা রাখতে পারেছন না বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী। আর তাতেই বাজারে লেনদেন ও শেয়ারের দাম বাড়ছে। তবে মূল্য-আয় অনুপাত ২০ ছাড়িয়ে যাওয়ায় সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া ভাল হবে বলে বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।