বাহাদুর শাহ্ পার্ক আজও বিপ্লবীদের কথা মনে করিয়ে দেয়

0
104
বাহাদুর শাহ পার্ক

বাহাদুর শাহ পার্কজগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক বাঙালি জাতির এক দুঃসহ স্মৃতি বহন করে চলেছে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আরকাননে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হওয়ার একশ বছর পর ১৮৫৮ সালে বাহাদুর শাহ পার্কে ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়া ভারতের শাসনভার গ্রহণের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। তখন এ পার্কের নামকরণ করা হয় ভিক্টোরিয়া পার্ক। তবে ১৮৫৭ সালে এই পার্কে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সিপাহী বিদ্রোহে অন্তত ১১ জন সিপাহীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

১৮৫৭ সালে সম্রাট বাহাদুর শাহকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে ঢাকায় সিপাহী বিদ্রোহ হয়। সেই অসম যুদ্ধে যারা ইংরেজদের হাতে ধরা পড়েছিলো তাদের ফাঁসি দেওয়া হয় বাহাদুর শাহ পার্কে। ফাঁসির পরে শহীদদের গাছে গাছে ঝুলিয়ে রেখে প্রদর্শনী করা হয়েছিল। শহীদগণের সেই স্মৃতি বহন করছে এই পার্কটি।

ইতিহাস মতে, ১৮৩৮ সালে ঢাকার লক্ষ্মীবাজার ও কলতাবাজার এলাকায় কিছু আর্মেনীয় পরিবারের বাস ছিল। এ এলাকার সংযোগ সড়কের মাথায় ছিল ডিম্বাকার একটি মাঠ। মাঠের মাঝখানে একটি ক্লাবঘর ছিল, যেখানে আর্মেনীয়রা বিলিয়ার্ড খেলত। নিম্ন শ্রেণীর কর্মচারীরা বিলিয়ার্ড বলকে ‘আন্টা’ বলত। স্থানীয় বাসিন্দারা তাই এ স্থানটিকে ‘আন্টাঘর ময়দান’ নামে ডাকত। মাঠের চার কোণে ছিল চারটি কামান। পরে ইংরেজরা মাঠটি আর্মেনীয়দের কাছ থেকে কিনে নেয়।

১৮৮৫ ইং সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি খাজা নবাব স্যার সলিমুল্লাহর জৈষ্ঠ পুত্র নবাবজাদা খাজা হাফিজুল্লাহ স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছিল এবং তৎকালীন স্মৃতিস্তম্ভে পার্কটির নামকরণ করা হয়েছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক। ১৯৫৬ ইং সনের তৎকালীন নবাব খান বাহাদুর এই ভিক্টোরিয়া পার্কের নাম পরিবর্তন করেন এবং ১৯৫৭ ইং সন থেকে পার্কটির নামকরণ করা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক।

বর্তমান অবস্থা: নবাবজাদা খাজা হাফিজুল্লাহ স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি ঠিক পূর্বের ন্যায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে কালের স্বাক্ষি হয়ে। স্থানীয়ভাবে প্রাত: ভ্রমনকারী সংঘ গড়ে তোলা হয়েছে। এই সদস্যরা তিনভাগে বিভক্ত। যেমন-প্রাত:ভ্রমণকারী সংঘ। বৈকাল ভ্রমণকারী সংঘ। সান্ধ্যকালীন ভ্রমণকারী সংঘ। এই সংঘের সদস্যরা এখানে তিন বেলায় বিভক্ত হয়ে হাটাহাটি করতে আসেন এবং কেউ কেউ যোগ ব্যায়ামও করেন। আর অবশিষ্ট যারা আছেন সবাই নানা পেশা ও চাকুরীজীবী, পথচারী, ছাত্র-ছাত্রী ও সাধারণ জনগণ।

ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধি ৬১ অনুযায়ী রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মহাপরিকল্পনাভুক্ত স্থাপনা হিসেবে ঐতিহাসিক গুরুত্বের বিবেচনায় বাহাদুর শাহ পার্ককে সংরক্ষণের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়; কিন্তু বর্তমানে পার্কটির বেহাল অবস্থা চলছে।

নানা সমস্যায় জর্জরিত: ঐতিহাসিক স্থান হওয়া সত্বেও পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কটি বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত। পার্কের মাঝখানে আছে একটি জলহীন ফোয়ারা। সেটিরও বেহাল দশা। চারদিকের দেয়ালের নিচের মাটি সরে গেছে। ভেতরে আছে একটি টয়লেট, পরিচ্ছন্নতার লেশ নেই তাতে। ট্যাঙ্ক থেকে পানি নিচ্ছে হকার-দোকানদাররা। স্মৃতিস্তম্ভের ওপর জুতা পায়ে বসে থাকে দর্শনার্থীরা। ডিম্বাকার এ পার্কটির বাইরের রেলিং কেটে নিচ্ছে নেশাখোররা। রাতে বসে মাদকসেবীদের আড্ডা। পার্কের উত্তরের রাস্তায় ডাস্টবিন, ময়লার ছড়াছড়ি। উত্তর-দক্ষিণের ফুটপাতে দোকান এবং রিকশার জট। নষ্ট হচ্ছে পার্কের সৌন্দর্য। পশ্চিম দিকের প্রবেশদ্বার বন্ধ। পূর্ব দিকেরটা খোলা। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টাই খোলা থাকে পার্কটি।

দর্শনীয় জিনিষ: বাহাদুর শাহ পার্কে দর্শনীয় জিনিষগুলোর মধ্যে রয়েছে নবাবজাদা খাজা হাফিজুল্লাহ স্মরণে তৈরী স্মৃতিস্তম্ভ। খাজা হাফিজুল্লাহ স্মরণে নির্মিত স্মৃতিফলক। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক নির্মিত ফোয়ারা। বাহাদুর শাহ পার্কের গাছপালা বেষ্টিত ছায়াঘেরা মনোরম পরিবেশ।

পরিদর্শনের সময়সূচী: প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত। সকাল ১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বিরতি। বিকেল ৩টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে। কোন প্রকার সাপ্তাহিক বন্ধ নাই। পার্কে প্রবেশ পথ ২টি। বর্তমানে ১টি গেট বন্ধ আছে। ১টি খোলা এবং প্রবেশের জন্য কোন টিকেটের প্রয়োজন নেই। সর্ব সাধারণের জন্য উন্মুক্ত। পার্কটি বর্তমানে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে আছে।

এম আই/সাকি