দেবের দেব মহাদেব

0
238
শিব পূঁজা

শিব পূঁজাপুরো শরীর লালচে-হলুদ রঙের বিভূতি বা ভস্ম দিয়ে মাখানো। চুলগুলো জটাবদ্ধ। শরীরের অর্ধেক ঢাকা বাঘের ছাল দিয়ে। মাথার ওপর ফণা তুলে বসে আছে একটা কৃত্রিম সাপ। কপালে রং দিয়ে আঁকা একটি চোখ। হাতে লোহার তৈরি একটা ত্রিশূল। দুই হাতে দুইটি বালা। পায়ে ঘাগর। হাতে ডমরু নামে এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র, বিভিন্ন রঙে সাজানো তার মুখ। সব মিলিয়ে হয়ে উঠলেন ক্ষমতাধর এক মহানায়ক।

তার প্রকৃত নাম অমৃত লাল। সন্যাসী বাড়ির ছেলে তিনি। তবে আজ হিন্দু ধর্মের শিব পূঁজায় তিনি সবার কাছে মহামূল্যবান। বিশেষ করে কুমারী মেয়েদের কাছে তার মূল্য সোনার মতো। কারণ তিনি ইচ্ছা শক্তি, জ্ঞানশক্তি ও ক্রিয়া শক্তি এই ইতন শক্তিধর। তিনি শিব পূঁজার নেতা। দেবের দেব মহাদেব। তার আশীর্বাদে কুমারী মেয়েরা ভবিষ্যতে কাঙ্ক্ষিত পুরুষ পাবে।

হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী চৈত্র মাসের শেষ দিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তি। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বাংলা বছরের শেষদিন হিসেবে এ পূঁজার আয়োজন করে থাকে। একে কেউ বলে শিব পূঁজা, আবার কেউ বলে  কাচ নাচানি।

চীনা রীতি অনুসরণ করে এখনও গ্রামবাংলার মেঠোপথ পেরিয়ে দূর-দূরান্তের গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিবের গাঁজন গেয়ে নীল উৎসবের নাচ নেচে ছোট-বড় সবাইকে আনন্দ দিয়ে থাকে।

মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ি থানার আব্দুল্লাহপুর গ্রামে রোববার আয়োজন করা হয়েছে শিব পূঁজার। শ্রী শ্রী শিব মন্দিরে দিনব্যাপী চলেছে এই শীব লিঙ্গ পূঁজা। হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ নারী-পুরুষ ও যুবক-যুবতীরা এসেছে এ পূঁজায়।

সন্যাসী বাড়ি থেকে প্রথমে শুরু করতে এই পূঁজা। মহাদেবের সাথে থাকে দশ-বার জনের একটি দল। তাদেরকে বলা হয় শিবের অনুচর। প্রত্যেকেই সুঠামো দেহের অধিকারী। সবার দুই হাতে দুইটা ক্রীজ । পূঁজার নিয়ম অনুযায়ী এরা সাধারণত দয়ালু প্রকৃতির। দেবের পথ অনুসরণ করে পথ চলবে তারা। কোনো কারণে তাঁদের প্রভু বা দেব রাগ হলে তারা প্রভুর সঙ্গে ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠেন। এই কারণে গণেশ গণপতি নামেও ঢাকা হয় এই শিবকে।

শিব যেমন ভয়ংকর তেমনই দয়ালু ও মঙ্গলময়। তিনি অর্ধেক পুরুষ অর্ধেক নারীদেহধারী। এর মানে হল- এই বিশ্বের পবিত্র পরমাশক্তি একাধারে পুরুষ ও নারীশক্তি। শিবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল কপালে তাঁর তৃতীয় চোখ। এই চোখ দিয়ে  শিব কামকে ভস্ম করেছিলেন।

একটি থালা, গ্লাস, তামা বা পিতলের সাধারণ ছোটো পাত্র, সাদা চন্দন, আতপ চাল, কয়েকটি ফুল ও দুটি বেলপাতা, ধূপ, দীপ। পানীয়, প্রণামী (টাকা) ও একটা ঘণ্টা দিয়ে সাজানো হয়েছে পূঁজামণ্ডপটি। চারদিকে ঢোল আর বাঁশির শুর। একটু পরপর দেবের দেব মহাদেব। আর তার সাথে মানুষের আনোন্দের চিল্লচিল্লি। সব মিলিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে মণ্ডপ।

নিয়ম অনসারে উত্তরমুখে বসে এ পূঁজা করা হয়। শিবলিঙ্গকেও উত্তরমুখী রাখা হয়। হিন্দু ধর্ম রীতি অনুযায়ী উত্তরদিক ব্রহ্মলোকপথ। তাই পরমব্রহ্মময় শিবের পূঁজা উত্তরদিকে বসে করা নিয়ম। শিবলিঙ্গকে তামা বা পাথরের পাত্রে বসানো হয়ে থাকে।

সকাল বিকেল ও সন্ধ্যা তিন পর্বে হয়েছিল পূঁজা।  চৈত্রের শেষ সপ্তাহব্যাপী পূঁজা হলেও মূলত শেষদিন জমে ওঠে বেশি।  সন্যাসী বাড়ি থেকে মূল দল বের হোয়ার পর গ্রামের অন্যান্য বাড়ি থেকে বের হয় আরও কয়েকটি দল। প্রত্যেক দলে একজন করে সন্যাসী সাজে। তারা দলে দলে গ্রামে বাড়ি বাড়ি ঘুরে সবাইকে ভক্তি জানায়।

পূঁজামণ্ডপ থেকে বের হওয়ার পর ধীরে ধীরে তারা কিছুটা ধ্যানে চলে যায়। ধ্যানে যাওয়া মানে দেবকে খুশি করা। এ সময় তারা এদিক সেদিক হেলে-দুলে পড়ে। দলের সাথে থাকা অন্যরা তাদের ধরে রাখে। তবে ভয়ংকর বিষয় হল তাদের হাতে থাকা ক্রীজগুলো। পথ চলতে গিয়ে ক্রীজগুলো এদিক সেদিক নাড়াচাড়া করে। তখন কিছুটা ঝুঁকি থাকে। তা অন্যরা সামাল দেয়।

তবে অন্যান্য পূঁজার মতো শিবলীঙ্গ পূঁজায় মেয়েদের কাজ থাকেনা বলেল চলে। এ দিন মেয়রা উপোষ থাকে মাত্র। পূঁজার আগের দিন রাত ১২টা থেকে মেয়েরা খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করবে। পূঁজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো খাবার খাবেনা তারা।

বস্তুত, শিবের পরিচয় ত্রিশূলেই। ত্রিশূল হলো কুঞ্চিকা বা চাবি। মানুষ সিন্দুকে ধনরত্ন রেখে প্রয়োজনে চাবি দিয়ে তা উন্মুক্ত করে ধনরত্ন বের করে । শিবের ঐশ্বর্য-ভাণ্ডার তত্ত্বময়।  ত্রিশূলের ৩টি ফলক-সত্ত্ব, রজ, তমোগুণের প্রতীক। এগুলোর অর্থ হল সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের প্রতীক ।

জেইউ/সাকি/এআর