রাবির পহেলা বৈশাখ

0
68
RU Pic

RU Picনববর্ষে সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে চিরতরে বিদায় জানানোর প্রত্যয়ে সারাদেশের মতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও (রাবি) উদযাপিত হচ্ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। সকাল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রায় জড়ো হতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশা শ্রেণির মানুষেরা।

সোমবার ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে খ্যাত রাবিতে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের ঢল নামে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মেতে ওঠে আনন্দ-উল্লাসে। মেয়েদের পরনে বৈশাখী শাড়ি আর ছেলেদের পাঞ্জাবি, কারও মাথায় জাতীয় পতাকা। আর মুখে আল্পনা এঁকে কোনো কোনো প্রেমিকযুগল মেতেছেন বৈশাখী গানে।

আজ সকাল ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের উদ্যোগে বিশাল মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন। এ সময় শোভাযাত্রায় আরও উপস্থিত ছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহানসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থী। এ সময় ঘোড়া, পেঁচা, বাঘ, হাতিসহ বিভিন্ন ধরনের মুখোশ পড়ে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন অনেকেই ।

দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অশান্তির ঢামাঢোল ভুলে নতুন বছরে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে মঙ্গল শোভাযাত্রায় এবার শান্তির প্রতীক হিসেবে ছিল একজোড়া পায়রা। এছাড়াও ছিল বাঘ, হাতি, ঘোড়া, পেঁচাসহ বিভিন্ন ধরনের মুখোশ এবং বেশ কয়েকটি বৃহদাকার পাখা। পাখার গায়ে লেখা ছিল ‘যাও পাখি বলো তারে, সে যেন ভুলে না মোরো।’ এ লেখাগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সুতার বুননে। শোভাযাত্রায় আরও ছিল চড়কি, নানান রঙের ব্যনার, ফেস্টুন এবং প্ল্যাকার্ড।

সকাল থেকেই ঢাক, ঢোল আর গান বাজনায় মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। বিভিন্ন বিভাগ আর সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও বের করা হয় শোভাযাত্রা। কৃষক, জেলে, সাপুড়ে, বেদেসহ বিভিন্ন সাজে সজ্জিত হয়ে পুরো ক্যাম্পাস মাতিয়ে তোলেন শিক্ষার্থীরা। কেউবা আবার সাজেন বর-কনে ও ঘটক, যা এক ভিন্নমাত্রা এনে দেয় পুরো ক্যাম্পাসে।

শোভাযাত্রা শেষে  সকাল সাড়ে ১০টা থেকে শুরু হয় নববর্ষ উপলক্ষে  মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে সংগীত পরিবশন করেন কণ্ঠশিল্পী তপু, পড়শি, পলাশ, ক্ষুদে গানরাজ অর্পাসহ আরও অনেকে। অনুষ্ঠানে পরিবেশন করা হয়  বিভিন্ন লোকসঙ্গীত,আর বিকেলে পরিবেশন করা হবে বরেন্দ্র অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরা।

‘আয়রে আয়রে সবে বঙ্গ সন্তান, মাতৃভূমি করে আহ্বান।’ এই স্লোগানের মাধ্যমে সকল ভেদাভেদ ভূলে গিয়ে সোনার বাংলা গড়তে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানায় চারুকলা বিভাগের  শিক্ষার্থীরা। তাদের একটি শোভযাত্রা ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে আবার চারুকলা বিভাগের সামনে এসে শেষ হয়।

এছাড়া বর্ষবরণে শোভাযাত্রা বের করে রাবির কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোট। নববর্ষকে স্বাগত জানাতে শোভাযাত্রা বের করে আইন বিভাগ, ইতিহাস বিভাগ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, পরিসংখ্যান বিভাগ, দর্শন বিভাগ, নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগ, বাংলা বিভাগ, ইংরেজি বিভাগ, ভূ-তত্ত ও খনিবিদ্যা বিভাগ, ফলিত গণিত বিভাগ। চারুকলা বিভাগের মেলা চত্বর, পুরাতন ফোকলোর চত্বর, টুকিটাকি চত্বর, শহীদুল্লাহ ও কলাভবন চত্বরসহ লোকারণ্য হয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পাস,যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ফোকলোর চত্ত্বরে বিজনেস স্টাডিজ ফ্যাকাল্টি ডিবেটিং ফোরামের (বিএফডিএফ) উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় গ্রামীণফোন বিএফডিএফ বর্ষবরণ উৎসব-১৪২১। সকাল সাড়ে ৮টায় এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন রাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মিজানউদ্দীন।

এছাড়া বর্ষবরণ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র কলাভবনের সামনে ম্যানেজমেন্ট ফোরামের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে লোকজ ও আধুনিক সঙ্গীতের পাশাপাশি ব্যান্ডসঙ্গীত পরিবশেন করা হয়। বাংলা বিভাগ এবং বাংলা সমিতির উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ কলাভবন চত্ত্বরে আয়োজন করা হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের। পুরাতন ফোকলোর চত্বরে বৈশাখী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে রাবি কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোট। বিজ্ঞান ২য় ভবনের সামনের চত্ত্বরে বর্ষবরণ এবং নবীনবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগ।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাঁধনের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের নার্সারী স্কুল সংলগ্ন মাঠে আয়োজন করা হয়েছে পিঠা ও পান্তা উৎসবের। ডীন কসপ্লেক্সের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক সংগঠন গোল্ড এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা। শহীদ মিনারের মুক্তমঞ্চে বিকেলে অরণী সাংস্কৃতিক সংসদ আয়োজন করবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। রোটারেক্ট ক্লাবের উদ্যোগেও পুরাতন ফোকলোর চত্বরে আয়োজন করা হয়েছে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।

বাংলা বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী আফসানা আক্তার লিজা বলেন, বর্ষবরণ উপলক্ষে পুরো ক্যাম্পাসে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। ক্যাম্পাসকে আজ ভিন্ন রূপে দেখতে পেরে খুব ভালো লাগছে। এ যেন বাঙালি সংস্কৃতির অনন্য এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

এমআই