‘বৈসাবি’ বয়ে আনুক শান্তি ও সমৃদ্ধি

0
92
boishabi

boishabiদেশের তিন পার্বত্য জেলায় উদযাপিত হচ্ছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রধান ও বৃহৎ সামাজিক উৎসব বৈসাবি।

পুরোনো বছরের বিদায়, নতুন বর্ষকে বরণ করে নিতে পাহাড় সেজেছে ফুলে ফুলে। পাহাড়-হ্রদ আর অরণ্যের শহর রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি আর বান্দরবানের আদিবাসি তিন সম্প্রদায়ের বর্ষবিদায় এবং বর্ষবরণ উৎসবের নাম এই ‘বৈসাবি’।

শুক্রবার সকাল থেকে এ উৎসবকে ঘিরে জেলায় প্রতিটি জনপদ পরিণত হয়েছে পাহাড়ি ও বাঙালীদের মিলন মেলায়। পাড়ায় পাড়ায় চলছে মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই উৎসবের জলকেলি বা পানি খেলা, ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী গড়িয়া নৃত্য আর চাকমাদের বিজু উৎসব। ঘরে ঘরে চলছে পাচন দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন।

বৈসাবি এলেই দেবতার চরণে চৈত্রমাসের ফুল দিয়ে আদিবাসিরা শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।

বৈচিত্রময় ধর্মীয় উৎসব পালনে বাঙ্গালীদের ইতিহাস হাজার বছরের। ঈদ, পূজা, পার্বন কি নেই বাঙ্গালীদের। মুসলিম, হিন্দু, খ্রীস্টান, বৌদ্ধ কিংবা আদিবাসীরা নিজস্ব সংস্কৃতিতে নিজস্ব ধর্মীয় রীতিনীতিতে পালন করে থাকেন এসব ধর্মীয় উৎসব। বাঙ্গালীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র থাকে আদিবাসীদের ধর্মীয় উৎসবে।

চৈত্রমাসের বিদায় ঘন্টা বেঁজে উঠলেই শুরু হয়ে যায় আদিবাসীদের প্রাণের উৎসব বৈসাবির আয়োজন। চাকমাদের ভাষায় এ উৎসবকে বিঝু, ত্রিপুরাদের ভাষায় বৈসুক এবং মারমাদের ভাষায় সাংগ্রাই এবং তংচঙ্গ্যাদের ভাষায় বিসু নামে আখ্যায়িত করা হয়। তিন সম্প্রদায়ের প্রাণের এই উৎসবের নামের আদ্যক্ষর নিয়েই তাই এই মহান উৎসবকে বলা হয় ‘বৈসাবি’ উৎসব।

মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই উৎসব উপলক্ষে শুক্রবার সকালে মারমাদের বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও শোভাযাত্রার বের করা হয়। এর পর শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী জলকেলি বা পানি উৎসব।

এ সময় খাগড়াছড়ি সেনাবাহিনীর রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেড়িয়ার জেনারেল মামুন অর রশিদ পিএসসি, পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, জেলা প্রশাসক আনিসুল হক ভুইয়া, পুলিশ সুপার আবু কালাম ছিদ্দিকসহ জেলার শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

অপর দিকে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বৈসুক উপলক্ষে পাড়ায় পাড়ায় চলছে ঐতিহ্যবাহী গড়িয়া নৃত্য ও চাকমাদের বিজু উপলক্ষে ঘরে ঘরে চলছে বিজুর ঐতিহ্যবাহী পাচন খাবার উৎসব।

বৈসাবি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর উৎসব হলেও এ অঞ্চলের বসবাসরত বাঙ্গালীরাও উৎসবের আনন্দ একাকার হয়ে উপভোগ করছেন। পাহাড়ি কিশোর-কিশোরীদের পাশাপাশি বাঙ্গালী তরুণ-তরুণীরাও দল বেধে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায়। অতিথিদের আপ্যায়ন করছেন যে-যার সামর্থ অনুয়ায়ী।

ত্রিপুরারা ধর্মীয় এবং সামাজিক রীতি নীতিতে চৈত্র মাসের শেষের দুইদিন ও নববর্ষের প্রথমদিনটিসহ মোট তিনদিন ধরে বৈসুক পালন করে। চৈত্রমাসের শেষ দুদিনের প্রথম দিনটিকে ত্রিপুরারা ‘হারি বুইসুক’এবং শেষ দিনটিকে ‘বুইসুকমা’ এবং তৃতীয় দিনকে ‘বিসিকাতাল’ নামে অভিহিত করে থাকে। আর নববর্ষের প্রথমদিনটিকে তারা বলে ‘বিসিকাতাল’। উৎসবের প্রথমদিন ত্রিপুরা ছেলেমেয়েরা গাছ থেকে ফুল তোলে। ফুল দিয়ে ঘর সাজায়। পরিচ্ছন্ন কাপড় চোপড় পরে ছেলেমেয়েরা গ্রামের ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়ায়। বৈসুক শুরুর দিন থেকে ‘গরাইয়া’ নৃত্য দল গ্রামে গ্রামে গিয়ে প্রত্যেক ঘরের উঠোনে নৃত্য করে।

ত্রিপুরারা বিশ্বাস করেন, কোনো শিল্পী যদি একবার এই গরাইয়া নৃত্যে অংশ নেয় তবে তাকে তিনবছর পর পর এই নৃত্যে অংশ নিতে হয়, নতুবা তার অমঙ্গল এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। এই লোকনৃত্যটিতে ১৬ জন থেকে ১০০/১৫০/৫০০ জন পর্যন্ত অংশ নিতে পারে।

বৈসাবি উৎসবের ‘সা’ আদ্যক্ষরটি পাহাড়ের অন্যতম নৃগোষ্টী মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ উৎসব থেকে নেওয়া। মারমারা সাধারণত চন্দ্রমাস অনুসারে এই দিনটি পালন করে থাকে। বছরের শেষ দুইদিন এবং নববর্ষের প্রথমদিন-এই তিনদিন পালিত হয় এই উৎসব। সাংগ্রাই উৎসব উদযাপনের সময় মারমা যুবক-যুবতীরা পিঠা তৈরি করার জন্য চালের গুঁড়া প্রস্তুত করে। সাংগ্রাই উৎসব এবং পানি খেলা এখন যেনো একে অপরের সমার্থক হয়ে গেছে। এই খেলার সময় এক জায়গায় পানি ভর্তি রেখে যুবক যুবতীরা একে অপরের দিকে পানি ছুড়ে মারে। সি্নগ্ধতায়, ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায় ভিজিয়ে দেয় পরস্পরকে। চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে সাংগ্রাই উৎসব পালন করা হয় বলে ধারণা করা হয়। সংক্রান্তি শব্দ থেকেই সাংগ্রাই শব্দটি এসেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় আদিবাসী সম্প্রদায় হলো চাকমা। চাকমাদের ধর্মীয় উৎসব বিঝু। এই উৎসবের সাথে তাই যেন দুলে উঠে সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম। উৎসবরে প্রথমদিনকে চাকমারা বলে ফুলবিঝু। এই দিন বিঝুর ফুল তোলা হয় এবং ফুল দিয়ে ঘর সাজানো হয়। সে ফুল দিনান্তে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। হরেক রকম সবজি আর তরকারির সমন্বয়ে রান্না করা হয় উৎসবের প্রধান খাবার পাজন। গ্রাম্য ছেলেমেয়রা ঘিলা খেলা, গুদু (হাডুডু) খেলায় মেতে ওঠে আর আকাশ প্রদীপ জ্বালায় এবং বাজী ফোটায় মহানন্দে। বয়স্করা মদ, ডাবা, জগরা বা কাজ্ঞি পান করে। বিঝু উৎসবের সময় কোনো প্রাণী হত্যা করা হয় না। তবে নববর্ষের দিন মাছ-মাংসসহ মজার মজার সব খাবারের আয়োজন থাকে। কেননা এই দিন ভালো কিছু খেলে সারাবছর ধরে ভালো খেতে পাওয়া যায় বলে তারা বিশ্বাস করে।

প্রতিবছর বৈসাবি উৎসব আসলেই পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ে উৎসব আনন্দ। নবআনন্দে জাগে পাহাড়ের আদিবাসী প্রাণ। রঙ্গীন ফুলে সেজে উঠে পাহাড় আর পাহাড়ী ঘরবাড়ি।

কেএফ