বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডাটা আজ আর নেই

0
92

বিউটি বোর্ডিংপুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিউটি বোর্ডিং পুরনো দিনের আড্ডাময় জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়। বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় সোনালী অতীতের দিকে। মনকে করে তোলে স্মৃতিকাতর। নতুন প্রজন্মকে  কবি-সাহিত্যিকসহ বিখ্যাত মানুষদের মিলনমেলার কথা মনে করিয়ে দিতে কালের সাক্ষি হয়ে আজও স্ব-গৌরবে দাঁড়িয়ে আছে বিউটি বোর্ডিং এর দোতলা সেই ভবনটি।

ভবনটির স্মৃতির পাতায় জড়িয়ে আছে বিখ্যাত মানুষগুলোর খ্যাতনামা সৃষ্টিকর্ম। বিউটি বোর্ডিং আজও বিদ্যমান আছে কিন্তু কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে সৃষ্টিশীল অনেক মানুষ।

এক সময় ঢাকার বিখ্যাত আড্ডাস্থল ছিল এটি। সেকাল-একালের কবি-সাহিত্যিকদের পদচারণায় মুখর থাকত। জমে উঠত সরস আড্ডা। তবে এখন তা ইতিহাসের অংশ মাত্র। বর্তমানে কয়েকটি সংগঠন মাঝেমধ্যে কবিতার আসর বসিয়ে থাকে। নেই আড্ডা, নেই কবি-সাহিত্যিকদের পদচারণা। এখন প্রায় বিরান ভূমির মতো অবস্থা। তবুও কালের সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভবনটি।

বাংলাবাজারে বইয়ের মার্কেট পেরিয়ে শ্রী শ্রী চন্দ্র দাস লেনে ঢুকতেই চোখে পড়ে একটি জমিদারবাড়ি। এটির কোল ঘেঁষেই দোতলা একটি বাড়ি। ছোট লোহার গেট পার হলেই ফুলের বাগান। বাগানের মাঝখানে দূর্বা ঘাসে মোড়ানো ফাঁকা জায়গা- আড্ডাস্থল। পাশেই অতিথিদের খাবারের ব্যবস্থা। হলদে-কালচে রঙের বাড়িটির এক কোনায় লেখা রয়েছে বিউটি বোর্ডিং।

এখনকার বিউটি বোর্ডিং বাড়িটি ছিল নিঃসন্তান জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে সেখানে ছিল সোনার বাংলা পত্রিকার অফিস। কবি শামসুর রহমানের প্রথম কবিতা মুদ্রিত হয়েছিল এ পত্রিকায়। দেশভাগের সময় পত্রিকা অফিসটি কলকাতায় চলে যায়।

এরপর ১৯৪৯ সালের শেষের দিকে প্রহ্লাদ সাহার ভাই নলিনী মোহন সাহা তৎকালীন জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের কাছ থেকে ১১ কাঠা জমি নিয়ে তাতে গড়ে তোলেন এই বিউটি বোর্ডিং। নলিনী মোহনের বড় মেয়ে বিউটির নামেই এর নামকরণ করা হয়। এখনো মাথা উচু করে প্রায় ১৫০ বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অহংকার নিয়ে স্ব-গর্বে দাঁড়িয়ে আছে চিরচেনা বিউটি বোর্ডিংয়ের দোতলা ভবনটি।

তখনকার সাহিত্য আড্ডার জন্য মুসলিম সুহৃদ সম্মিলনী, নবাববাড়ি, ঢাকা প্রকাশের কার্যালয়সহ অনেক জায়গা থাকলেও সবার পছন্দের জায়গা ছিল এই বিউটি বোর্ডিং। বাংলা সাহিত্যের অনেক দিকপালের পদচারণায় এই বোর্ডিং ধন্য হয়েছে। সেসব ব্যক্তিত্ব নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিখ্যাত হয়েছেন। শুরু থেকেই এখানে আড্ডা দিয়েছেন এ দেশের প্রথিতযশা কবি-সাহিত্যিক, চিত্র পরিচালক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কিংবদন্তিরা। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এই ঐতিহাসিক স্থানে এসেছিলেন নেতাজি সুভাস চন্দ্র বসু ও পল্লীকবি জসিমউদ্দীন। এসেছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও।

বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডা দিতে দিতেই অনেকের কলমে বেরিয়ে আসত বিখ্যাত কোনো লেখা বা কোনো মহৎ পরিকল্পনা। অনেকেই তাঁদের জীবনের সেরা অনেক লেখা লিখেছেন এই আড্ডায় বসে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখানে আড্ডা জমানোর জন্য প্রথম পদক্ষেপ নেন কবি বেলাল চৌধুরী ও শহীদ কাদরী। এরপর আসেন আরো অনেকে। এই আড্ডায় বসেই সৈয়দ শামসুল হক লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত সাহিত্যকর্মগুলো, যার মধ্যে অন্যতম আরণ্যক, অনুপম দিন, এক মহিলার ছবি, কয়েকটি মানুষের সোনালী ছবি, জনক ও কালো কফিন, সীমানা ছাড়িয়ে ও রক্ত গোলাপ।

চলচ্চিত্র পরিচালক আব্দুল জব্বার খান এখানে বসেই লিখেছিলেন বিখ্যাত প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর পাণ্ডুলিপি। ‘কাঁচের দেয়াল’-এর পাণ্ডুলিপিসহ সমর দাসের বহু বিখ্যাত গানের সুর এখানে বসেই করা হয়েছে।

এই বোর্ডিং বিভিন্ন সময়ে আরো যাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ছে  তারা হলেন খালেদ চৌধুরী, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, কবি শামসুর রাহমান, রণেশ দাসগুপ্ত, ফজলে লোহানী, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ব্রজেন দাস, হামিদুর রহমান, বিপল্বব দাশ, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, আহমেদ ছফা, হায়াৎ মাহমুদ, সত্য সাহা, এনায়েত উল্লাহ খান, আল মাহমুদ, আল মুজাহিদী, আবু জাফর ওবায়দুলাহ, ফতেহ লোহানী, জহির রায়হান, খান আতা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ শামসুল হক, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সাংবাদিক নির্মল সেন, ফয়েজ আহমদ, গোলাম মুস্তাফা, খালেদ চৌধুরী, সমর দাশ, ফজল শাহাবুদ্দিন, সন্তোষ গুপ্ত, আনিসুজ্জামান, নির্মলেন্দু গুণ, শফিক রেহমান, আসাদ চৌধুরী, জুয়েল আইচ, খান আতাউর রহমান, প্রবীর মিত্র, নায়করাজ রাজ্জাকসহ অনেক গুণী ব্যক্তিত্ব।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও রয়েছে বিউটি বোর্ডিং-এর, প্রগতিশীল লেখকদের নিয়মিত আড্ডার জের ধরে বিউটি বোর্ডিং একাত্তরে হায়েনাদের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হয়। হানাদার ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদরের দৃষ্টিতে পড়ে যায় এটি। প্রগতিশীলদের হত্যা করতে এই চক্র একাত্তরের ২৮ মার্চ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এখানে হঠাৎ অভিযান চালায়।

বোর্ডিংয়ের মালিক প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা, সন্তোষ কুমার দাস, হেমন্ত কুমার সাহা, অহিন্দ চৌধুরী শংকর, প্রভাত চন্দ্র সাহা, নির্মল রায়, খোকা বাবু, হারাধন বর্মণ, প্রেমলাল সাহা, কেশব দেউ আগরওয়ালা, শামস ইরানী, যোসেফ কোরায়া, শীতল কুমার দাস, অখিল চক্রবর্তী, সাধন চন্দ্র রায়, সুখরঞ্জন দে, ক্ষিতীশ চন্দ্র দে, নূর মোহাম্মদ মোল্লাসহ ১৭ জনকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদাররা। পরে রাজাকারদের দখলে চলে যায় বিউটি বোডিংটি।

মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় এটি বন্ধ থাকে। যুদ্ধ শেষে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে প্রহ্লাদ সাহার দুই ছেলে সমর সাহা ও তারেক সাহা দেশে ফিরে বিউটি বোর্ডিং পুনরায় চালু করেন।

বর্তমানে বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের আড্ডা বা পদচারণ নেই। এ অবস্থায় বিউটি বোর্ডিংয়ের ঐতিহ্য ধরে রাখাটাও ভাবনার বিষয় হয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় ১৯৯৫ সালে ইমরুল চৌধুরী গড়ে তোলেন বিউটি বোর্ডিং সুধী সংঘ। তারই তত্ত্বাবধানে ১৯৯৮ সালে ৬০ সদস্যের ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। এই বোর্ডের মাধ্যমে ২০০০ সাল থেকে সম্মাননা দেওয়া শুরু হয়। ইতিমধ্যে সম্মাননা প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন, কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, বেলাল চৌধুরী, কবি আল মাহমুদ, দেবদাস চক্রবর্তী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, আসাদ চৌধুরী, কবি রফিক আজাদসহ বেশ কয়েকজন সাহিত্যিক।

প্রহ্লাদ সাহার পর বর্তমানে বোর্ডিংটির হাল ধরেছেন তাঁর দুই ছেলে তারেক সাহা ও সমর সাহা। দুভাই মিলে বিউটি বোর্ডিং পরিচালনা করছেন। বর্তমানে ভবনটিতে থাকার জন্য ২৫টি কক্ষ রয়েছে।

নগরের ভোজন রসিকরা এখনো এখানে ছুটে আসেন। আর সংস্কৃতিমনাদের জন্য রয়েছে বিশেষ ছাড়।

বিউটি বোর্ডিং এর শুচনালগ্ন থেকেই এখানে থাকা-খাওয়ার চমৎকার ব্যবস্থা থাকলেও খাওয়া-দাওয়ার চেয়ে এখানকার আড্ডাটাই আকর্ষণীয় ছিল সবার কাছে। সামান্য কিছু খেয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেওয়া যেত।

বিউটি বোর্ডিং এর মালিক তারেক সাহা অর্থসূচককে বলেন, ‘বাংলাবাজার থেকে বইয়ের ব্যবসা অন্যত্র স্থানান্তরিত হতে থাকায় লোকজন কমে যাচ্ছে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এখানে লোকজনের সমাগম তুলনামূলক বেশি হয়। তার পরও বাবার স্মৃতি ধরে রাখতে বোর্ডিংটি চালিয়ে যাচ্ছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা চাই নতুন প্রজন্মের কবি-সাহিত্যিকরা এখানে আসুক। আবারও জমে উঠুক বিউটি বোর্ডিং। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির কিংবদন্তিদের ইতিহাস।

এম আই/সাকি