গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণ ও সেচ প্রকল্প দাবিতে বিক্ষোভ

0
66
গঙ্গা ব্যারেজ

গঙ্গা ব্যারেজনদী ভাঙনের কবল থেকে রাজশাহী জেলাকে রক্ষা এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণ ও উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে রাজশাহীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।

সোমবার বেলা ১১ টায় নগরীর কোর্ট শহীদ মিনারে এ বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। পরে বিক্ষোভ মিছিল শেষে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পেশ করা হয়। এর আগে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে বক্তারা এ অঞ্চলের কৃষি ও কৃষকদের বাঁচাতে প্রস্তাবিত উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান।

বক্তারা বলেন, রাজশাহীর দক্ষিণ-পূর্ব পাশ ঘেঁষে পদ্মা নদীর প্রায় ৭০ কিলোমিটার বিস্তৃত। পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের করাল গ্রাসে এ অঞ্চলের নদী তীরবর্তী এলাকায় বিদ্যমান সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা, ফলের বাগান ও অন্যান্য কৃষি জমি প্রতি বছরই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কৃষি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে নি:স্ব হচ্ছে মানুষ। বক্তারা উল্লেখ করেন, নদী ভাঙন রোধে পাউবো রাজশাহী বেশ কয়েকটি ডিপিপি মন্ত্রনালয়ে দাখিল করেছে। যা অনুমোদন হলে এ এলাকার নদী ভাঙন সমস্যা দূরীভূত হবে।

বক্তারা আরো বলেন, পদ্মা এবং মহানন্দা নদীর বামতীর সংরক্ষণের মাধ্যমে গোদাগাড়ীর বালিয়াঘাটায় মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি রক্ষা, বিওপির রক্ষাকরণ প্রকল্প এলাকায় নদী ভাঙ্গনের ঝুঁকি হতে টেকসই আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়নের লক্ষ্যে রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলায় রাজাবাড়ি হইতে বালিয়াঘাটা পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প-২য় পর্যায় চালু করতে হবে।

এছাড়া বাঘা উপজেলার সরের হাট, গোকুলপুর, আলাইপুর, মিরগঞ্জ এবং চারঘাট উপজেলার রাওথা, ইউসুফপুর ও টাঙ্গনে পদ্মা নদীর বামতীরে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় নদী ভাঙ্গন অব্যহত রয়েছে উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, নদী ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বেশ কয়েকটি স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ ফসলি জমি, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, রাজশাহী-চারঘাট-বাঘা-পাবনা আঞ্চলিক মহাসড়কের একাংশ নদী গর্ভে বিলীন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা হুমকির সম্মুখীন হবে। তাই চারঘাট ও বাঘা ও পবার চর খিদিরপুরে গঙ্গা নদীর বামতীরে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের অগ্রাধিকারমূলক স্থানসমূহ নদীভাঙ্গন হতে রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি লিয়াকত আলীর সভাপতিত্বে বিক্ষোভ সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান, রাজশাহী চেম্বার সভাপতি আবু বাক্কার আলী, প্রবীন সাংবাদিক মোস্তাফিজুর রহমান খান, রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক মঞ্জুর হাসান মিঠু, সাংগঠনিক সম্পাদক দেবাশিষ প্রামাণিক দেবু, নারী উদ্যোক্তা হাসনা আরা বেগম সুচি বেগম, ডা. সেলিনা বেগম, শাহনাজ বেগম ও ছাত্রনেতা মতিউর রহমান মতি প্রমুখ।

বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে বক্তারা অবিলম্বে রাজশাহী জেলাকে রক্ষা এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণ ও উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানান। পরে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তিন পাতার মুদ্রিত স্মারকলিপি পেশ করা হয়। স্মারকলিপির অনুলিপি পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়, অর্থ ও পরিকল্পনা এবং কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরেও পাঠানো হয়।

স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, রাজশাহীর গোদাগাড়ী মডেল থানার সামনে ভগবন্তপুর, রেলবাজার, সারেংপুর, সুলতানগঞ্জ এবং রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধের শ্মশানঘাট হতে তালাইমারী শহীদ মিনার এবং বুলনপুর হতে নবগঙ্গা, নবগঙ্গা হতে সোনাইকান্দি পর্যন্ত এবং পবা উপজেলাধীন খানপুর, খিদিরপুর ও চরমাজারদিয়া এলাকা পদ্মা নদীর ভাঙ্গন রোধকল্পে নদী তীর সংরক্ষণ কাজ অতিসত্বর বাস্তবায়ন করা অতীব প্রয়োজন।

পক্ষান্তরে টি-গ্রোয়েন, ২-বি স্পার, দরগাপাড়া স্পার ও বড়কুঠি স্পার সংস্কারের অভাবে হুমকি কবলিত হয়ে পড়ায় বন্যাকালীন বড় ধরনের দূর্ঘটনা ঘটার সমূহ শঙ্কা রয়েছে। কৃষি প্রধান উত্তরাঞ্চলের মানুষ বড় অসহায় ও সরকারি সাহায্য সহযোগীতা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় হতাশাগ্রস্থ অবস্থায় কালাতিপাত করছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক ও কৃষি বান্ধব সরকার হিসেবে ইতোমধ্যেই বেশকিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যা বাস্তবায়িত হলে কৃষি উৎপাদন উত্তরোত্তর বৃদ্ধিসহ এতদঞ্চলের কৃষকের ব্যাপক উন্নতি সাধিত হবে। কিন্তু ভূ-পরিস্থ পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ছাড়া কৃষিখাতে কাঙ্খিত সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়। বর্তমানে ভূ-গর্ভস্থ পানি নির্ভর সেচ ব্যবস্থায় পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। অদুর ভবিষ্যতে ভূমি ধ্বংস ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের উপায় এখুনি খুঁজে বের করতে হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেশের বরেন্দ্র অঞ্চল অন্যান্য অঞ্চল থেকে অবহেলিতে হওয়ায় উন্নয়নের ধারা থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

বৃহত্তর রাজশাহীতে শিল্প কারখানা গড়ে না ওঠায় এখনও কৃষি জীবন ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু কৃষিতে এখনও আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত সেচ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বরেন্দ্রর ভূ-প্রকৃতি, আবহাওয়া, প্রাকৃতিক পরিবেশ দেশের অন্য অংশ থেকে ভিন্নতর। বন্যা কবলিত অঞ্চল হয়েও বরেন্দ্র ভূমি বন্যামুক্ত। কৃষি বিশেজ্ঞদের মতে ভূ-উপরিস্থ পানি নির্ভর সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হলে বন্যামুক্ত বরেন্দ্র এলাকায় তিনটি ফসল ফলানো সম্ভব। বরেন্দ্র এলাকায় পদ্মা নদীর ভূ-উপরিস্থ পানির পূর্ণমাত্রায় সেচ প্রদান করা সম্ভব হবে এবং বছরে ১৮০ কোটি টাকা মূল্যের অতিরিক্ত ২.৫০ লক্ষ মে. টন খাদ্যশস্য উৎপাদন সম্ভব হবে। বিধায় বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি নির্ভর আঞ্চলিক ও জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্ব বিবেচনা পূর্বক বরেন্দ্র অঞ্চলের জনগনের প্রাণের দাবি উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি।

উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ ৩০ বছরের স্থায়ী পানি চুক্তি দেশের উত্তরাঞ্চলের জন্য আর্শীবাদ। তাই ভূ-উপরিভাগের পানি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আরও সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

এমআই/সাকি