যুদ্ধাপরাধের বিচার দেশে দেশে

war-crimeএকাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রথম রায় কার্যকর হলো গতকাল বৃহঃবার রাত ১০টা এক মিনিটে। মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায়  ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর প্রায় পৌনে চার বছরের আইনি লড়াই শেষে গতকাল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

 

দেশের ইতিহাসে যুদ্ধাপরাধের দায়ে কারও সর্বোচ্চ সাজা পাওয়ার এটা প্রথম ঘটনা হলেও বহির্বিশ্বে এ ধরনের নজির অনেক রয়েছে। অর্থসূচকের পাঠকদের জন্য আজ সে সব যুদ্ধাপরাধের ঘটনা তুলে ধরা হলো-

ন্যুরেমবার্গ ট্রায়াল

ন্যুরেমবার্গ ট্রায়াল যাত্রা শুরু করে ১৯৪৫ সালের ১৮ অক্টোবর। এই ট্রাইব্যুনাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মানব ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ডের জন্য বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত ২২ জন উচ্চ পদস্হ জার্মান সামরিক অফিসার, রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি ও বিনিয়োগকারীদের বিচারের মুখোমুখি করে। ১৯৪৬ সালের ৩১ আগস্টে ট্রাইব্যুনালের সাক্ষ্যগ্রহণ, শুনানী ও আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন কাজ সমাপ্ত করা হয়। বিচারিক কার্য শেষ হওয়ার পর ১৯৪৬ সালের ১ অক্টোবর রায় দেয়া হয়। ২২ জনের মধ্যে ২ জনকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং ১ জনকে শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ করার দায়ে শাস্তি প্রদান করা হয়। বাকীদের শাস্তি দেয়া হয় যুদ্ধাপরাধ ও চার্টার বর্ণিত অন্যান্য অপরাধ করার জন্য। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল এর রায়ে ১২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। ৩ জনকে মুক্তি দেয়া হয়। বিচারকার্য এখনো শেষ হয়নি; যে কোনো সময়, এমনকি অপরাধীর মৃত্যুর পরও বিচার প্রক্রিয়া চলতে পারে বলে ট্রাইব্যুনালের তরফ থেকে জানানো হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধ করেছে এমন ব্যক্তিদের বিচার এখনও হচ্ছে। সর্বশেষ ২০১০ সালের ২৩ মার্চ জার্মানির একটি কোর্ট সাবেক নাজি সদস্য হেইনরিখ বোয়েরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। শুধু তাই নয়, এখনও নাজি দালালদের খোঁজা হচ্ছে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য।

টোকিও ট্রায়াল

‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফার ইস্ট’-এর চার্টার অনুমোদিত হয় ১৯৪৫ সালের ১৯ জানুয়ারি। একই বছরের ৩ মে ট্রায়ালের বিচারকাজ শুরু হয় জাপানের টোকিওতে। যেসকল নীতিমালার ভিত্তিতে জার্মানীর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হয়েছিল ঐ একই নীতিমালার ভিত্তিতে জাপানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য টোকিও ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এ ট্রায়ালে ২৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল যাদের মধ্যে ২ জন মামলা চলাকালে মারা যায় এবং ১ জনকে মানসিক ভারসাম্য হারানোর ফলে ছেড়ে দেয়া হয়। ১৯৪৮ সালের নভেম্বরে ট্রাইব্যুনাল এর রায় ঘোষণা করেন। যারা যুদ্ধ সংঘটিত ও পরিচালিত করেছিলেন তাদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয় এবং যারা যুদ্ধাপরাধ, মানবতা ও শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ করেছিলেন তাদের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

আইখম্যান মামলা

হিটলারের সময়কালে আইখম্যানের বিরুদ্ধে হাজার হাজার ইহুদিকে হত্যার অভিযোগ উঠে। যুদ্ধ শেষে তিনি জার্মানি থেকে আর্জেন্টিনায় গা ঢাকা দেন। ১৯৬০ সালে ইসরায়েলি গোয়েন্দা বাহিনী আর্জেন্টিনা সরকারের অজ্ঞাতে আইখম্যানকে অপহরণ করে ইসরায়েলে নিয়ে আসে। জেরুজালেমে তার বিচার কাজ শুরু হয়  ১৯৬১ সালের ১১ এপ্রিলে। ইসরাইলের ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট অব জেরুজালেম আইকম্যানকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করেন।

 

যুগোস্লাভিয়া ট্রাইব্যুনাল

সাবেক যুগোস্লাভিয়া অঞ্চলে ১৯৯১ সাল থেকে সংঘটিত যুদ্ধকালীন অপরাধের বিচারের জন্য যুগোস্লাভিয়া ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ১৯৯৩ সালের ২৫ মে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৮২৭নং প্রস্তাব অনুমোদনের মাধ্যমে এ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৩ সালের ১৭ নভেম্বরে ১১ সদস্য বিশিষ্ট সাবেক যুগোশ্লাভিয়ার যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল নেদারল্যান্ডের হেগ শহরে গঠিত হয়। ১৯৯৪ সালের ৮ নভেম্বর থেকে যুগোস্লাভিয়া ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ শুরু হয়। ১৬২ জন অভিযুক্তের মধ্যে ১০০ জনের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম শুরু করেন আদালত। এর মধ্যে ৪৮ জনকে সাজা প্রদান করা হয়, ১১ জনের মামলা স্থানীয় আদালতে প্রেরণ করা হয় এবং ৫ জনকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। ২০১৪ সালের মধ্যে এই বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বিচার কাজ এখনো সমাপ্ত হয়নি।

রুয়ান্ডা ও কম্বোডিয়ার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার

রুয়ান্ডাতে হুতুদের সঙ্গেঁ তুতসিদের জাতিগত বিরোধে ১ লক্ষ হুতুকে হত্যা করা হয়, সেটা ১৯৮০ এর দশকের শেষদিকে। রুয়ান্ডা ও আশপাশের রাষ্ট্রে জেনেভা কনভেনশন ও অন্যান্য অপরাধের সঙ্গেঁ জড়িতদের শাস্তি প্রদান করার জন্য ১৯৯৪ সালের ৮ নভেম্বর নিরাপত্তা পরিষদ একটি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয় ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে। ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল ৯২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন।দু’জন মৃত্যু বরণ করায় এবং  তিনজন পালিয়ে যাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে সাজা কার্যকর করা যায়নি। তবে ১০ জন এরই মধ্যে সাজা ভোগ করে ছাড়া পেয়েছে, ১৭ জন তাদের সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেছে। চারজনের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করা হয়েছে। ১০ জন অপরাধীর বিচার প্রক্রিয়া জাতীয় আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে। সম্প্রতি আরও ৩২ জনের বিচার প্রক্রিয়া চলছে। এই ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া ২০০৮ সালের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় সময় বাড়ানো হয়।

সিয়েরালিওনে যুদ্ধাপরাধের বিচার

সিয়েরালিওনের যৌথ উদ্যোগে জাতিসংঘের সহায়তায় ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় স্পেশাল কোর্ট ফর সিয়েরালিওন। এই বিশেষ আদালত বিচার কার্যক্রম শুরু করে ২০০৪ সালের জুনে। ২০১২ সাল পর্যন্ত মোট ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হলেও ২০০৩ সালের ১০ মার্চ ৭ জনের বিচার কাজ শুরু হয়। এই সাত জনের মধ্যে  দু’জন মারা যাওয়ায় তাদের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। বাকি পাঁচজনের মধ্যে অ্যালেক্স বিমাকে ৫০ বছরের কারাদণ্ড, মরিস কেলনকে ৪০ বছরের কারাদণ্ড, ব্রিমা কামানাকে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড, ইসা সেসাকে ৫২ বছরের কারাদণ্ড, অগাস্টিন গিবাওকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। লাইবেরিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপতি চার্লস টেলরের বিচারকাজ শুরু হয় ২০০৬ সালের ২৯ মার্চ। ২০১২ সালের ৩০ মে বিশেষ আদালত টেলরকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ৫০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। চার্লস টেলর এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। বর্তমানে আপিলের শুনানি চলছে।

রোম-বিধি ও আন্তর্জাতিক আদালত

স্থায়ী কার্যকর আন্তর্জাতিক আদালত গঠনের উদ্দেশ্যে ১৯৯৮ সালের জুলাই মাসে ‘রোম বিধি’ গৃহীত হয়। এর উদেশ্য ছিলো যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি, ব্যক্তিবর্গের বিচার আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বিচারের মুখোমুখি করা।  প্রয়োজনীয় ৬০ রাষ্ট্রের অনুমোদনের পর ২০০২ সালের ১ জুলাই রোমবিধি কার্যকর হলে এর মধ্য দিয়ে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত’ যাত্রা শুরু করে। এখন পর্যন্ত এ আদালত উগান্ডা, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও সুদানের দারফুর ঘটনার বিচার হাতে নেন। এখনও এসব দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম চলছে।