ইতালিতে সিজনাল জব ভিসায় বাংলাদেশ আবারও কালো তালিকায়

0
98
Venice 2

Venice 2আবার তোরা মানুষ হ ! প্রয়াত খান আতা পরিচালিত ছবির নামকরণটি সার্থক হতো যদি আমরা বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে দূর প্রবাসে ‘মানুষ’ হতে পারতাম!  হতে পারি আর না-ই পারি, কয়লা ধুলে যে ময়লা যায় না তা আবারো প্রমাণিত হলো ইতালিতে।

ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলংকা পারলেও আমরা পারলাম না। না প্রিয় পাঠক, ক্রিকেট সংক্রান্ত কিছু নয়। ইতালিতে সিজনাল জব ভিসায় বাংলাদেশের কলঙ্ক নিয়ে কথা। মৌসুমি কাজের জন্য ইতালি সরকারের ইমিগ্রেশন পলিসিতে পরপর দ্বিতীয় বছরের মতো ‘কালো তালিকায়’এ স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশ। কোটা ভিত্তিক সিস্টেমেই বাদ পড়েছে বাংলাদেশের নাম।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে ২৩টি দেশ থেকে ১৫ হাজার সিজনাল কর্মী আনা সংক্রান্ত অফিসিয়াল গেজেট এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশ করা হয়েছে। ঘোষিত তালিকায় ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার নাম থাকলেও বাংলাদেশ নেই। অন্য ২০টি দেশ হচ্ছে- আলবেনিয়া, আলজেরিয়া, বসনিয়া হার্জেগোভিনা, মিশর, ফিলিপাইন, গাম্বিয়া, ঘানা, জাপান, কসোভো, মেসিডোনিয়া, মরক্কো, মরিশাস, মলদোভিয়া, মন্তেনেগ্রো, নাইজার, নাইজেরিয়া, সেনেগাল, সার্বিয়া, ইউক্রেন ও তিউনিসিয়া।

৪ এপ্রিল ২০১৪ থেকে চলতি বছরের জন্য অনলাইনে আবেদন করা শুরু হলেও বিগত বছরগুলোতে একশ্রেণির বাংলাদেশি দালালদের জমজমাট আদম ব্যবসা আর বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বহীনতার খেসারতে গতবারের ন্যায় এবারও আমাদের শুধু তাকিয়ে থাকা ছাড়া যেন কিছুই করার নেই।

ইউরোপজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা সেইসাথে দেশেদেশে বেকারত্ব সত্ত্বেও ইতালি এমন একটি দেশ, নানান পারিপার্শ্বিক কারণে এখানে গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি কাজের জন্য প্রতিবছরই দক্ষ-অদক্ষ হাজার হাজার কর্মীর প্রয়োজন হয়েই থাকে। উত্তরে আল্পস পর্বতমালা থেকে শুরু করে দক্ষিণের সিসিলি দ্বীপ তথা পুরো দেশজুড়ে বিভিন্ন এলাকার কৃষিখামারগুলোতে ব্যাপক ফসলাদি এবং তিনদিকের বিস্তীর্ণ সমুদ্রসৈকত ও পাহাড়িয়া পর্যটন এলাকাগুলোতে লক্ষ লক্ষ পর্যটকের ভিড় সামাল দিতেই সুনির্দিষ্ট দেশ থেকে সিজনাল ভিসায় কর্মী নিয়ে আসার প্রথা প্রচলিত আছে ইতালিয় সরকারের ইমিগ্রেশন পলিসিতে। মৌসুমের শুরুতে বিভিন্ন দেশ থেকে কর্মীরা আসে ইতালিতে, মৌসুম শেষে ইউরোতে পকেট ভরে ফিরে যায় যার যার দেশে। একবার ফিরে গেলে পরের বার ভিসার ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দেয় ইতালিয় ইমিগ্রেশন। ব্যতিক্রম শুধু আমাদের বাংলাদেশ।

ইতালিতে সিজনাল ভিসা আর বাংলাদেশিদের সুযোগের অপব্যবহারের টোটাল ইস্যুটি বারবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ‘গোল্ডেন এ্যাগ’র সেই মুখরোচক গল্পের কথা। আমরা এতোটাই বীরের জাতি যে, গল্প হয়ে যায় সত্যি। প্রতিদিন একটি করে সোনার ডিমে সন্তুষ্ট হতে পারিনি বা পারি না আমরা। আর পারি না বলেই আদম ব্যবসার নামে সোনার ডিম দেওয়া হাঁসটিকে জবাই দেওয়া হয়েছে ইতালিতে। পরিসংখ্যান কিন্তু তাই বলছে।

২০০৮ থেকে ২০১২ সাল এই পাঁচ বছরে ইতালি সরকার প্রায় ১৮ হাজার বাংলাদেশিকে সিজনাল ভিসা প্রদান করলেও তার মধ্য থেকে ফেরত গেছেন মাত্র ৫১ জন। গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে সুযোগের সন্ধান আমরা অবশ্যই করবো কিন্তু তাই বলে সোনার ডিম দেওয়া হাঁসটিকে বলি দিয়ে নয়।

সুযোগসন্ধানী বাংলাদেশিদের অনৈতিক এই অপকর্মটি ঠেকাতে ইতালিয় প্রশাসন গতবছর থেকে বাংলাদেশকে অফিসিয়ালি ব্ল্যাকলিস্টভুক্ত করলেও এর আগেই আখের গোছান চিহ্নিত আদম ব্যবসায়ীরা। গ্রামেগঞ্জে অর্থলোভী কিছু ইতালিয়ানের সাথে হাত করে প্রফেশনাল আদম ব্যবসায়ী নন এমন কিছু বাংলাদেশিও জনপ্রতি ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে ৫-১০ জন করে, কেউ কেউ শ’-দেড়শ’ পর্যন্ত লোক সিজনাল ভিসায় এনে রীতিমতো আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়ে যান। গোটা ইতালি জুড়ে কর্মক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের আকাশছোঁয়া গুডউইল থাকলেও সিজনাল ভিসা কেলেংকারিতে লাল-সবুজ পতাকার ভাবমূর্তি গত কয়েক বছরে মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হয়েছে।

ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন পলিসিতে কালো তালিকাভুক্ত হবার মধ্য দিয়ে ইতালিতে ইমেজ সংকটে আজ বাংলাদেশ। রোমে দায়িত্বরত রাষ্ট্রদূত শাহাদাত হোসেনের অনুভূতি অবশ্য এক্ষেত্রে একটু ভিন্ন আঙ্গিকের। ২৩টি দেশের তালিকায় শ্রীলংকা, পাকিস্তান ও ভারতের নাম থাকলেও বাংলাদেশের নাম না থাকার বিষয়টি আমাদের দেশের ভাবমূর্তির সাথে সাংঘর্ষিক কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন-  না, বিষয়টিকে ঠিক সেভাবে দেখা হচ্ছে না এবং এই ইস্যুতে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, সরকারের নির্ধারিত ক্রাইটেরিয়া বাংলাদেশিরা পূরণ করতে পারছে না বলেই এমনটা হচ্ছে। সিজনাল ভিসায় বাংলাদেশিরা ইতালিতে এসে ফেরত না যাবার বিষয়টি অবশ্য স্বীকার করেন রাষ্ট্রদূত। এই প্রতিবেদককে তিনি জানান, বাংলাদেশের জন্য চলমান এই সংকট উত্তরণে তিনি দেশটির ঊর্ধ্বতন ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠক করবেন।

ইতালিতে বাংলাদেশি বেশকজন কমিউনিটি নেতাদের বলেন, দেশে-বিদেশে চিহ্নিত দালালদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে এবং অবৈধ আদম ব্যবসা বন্ধ করতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের অবশ্যই দায়বদ্ধতা রয়েছে। যদিও সম্ভাবনা কম তথাপি আগামিতে যদি বাংলাদেশের কোটা আবার চালু হয়, সেক্ষেত্রে সিজনাল ভিসায় ইতালিতে আসা প্রতিটি বাংলাদেশি সিজন শেষে বাংলাদেশে ফিরে যাবেন এই নিশ্চয়তা অবশ্যই বাংলাদেশ সরকার ও রোমের বাংলাদেশ দূতাবাসকেই দিতে হবে।

কেএফ