খুলনা বাণিজ্যমেলায় চলছে প্রতারণা ও ভ্যাট ফাঁকির মহোৎসব

0
117
Khulna-trade-fare

SAMSUNG CAMERA PICTURESপ্রতিদিনই ভিড় বাড়ছে ১৩তম খুলনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায়। মেলায় রয়েছে দেশি-বিদেশি ১৫২টি স্টল ও ৬টি প্যাভিলিয়ন।
সব বয়সী ক্রেতাই আসছে এখানে। আর ছুটির দিনে তো কথাই নেই। কেনাকাটার পাশাপাশি দল বেঁধে দর্শনার্থীরা বাণিজ্য মেলায় আসে ঘুরে বেড়াতে। ইটপাথরের এই শহরে বাণিজ্য মেলা যেন এক টুকরো বিনোদনেরও স্থান।
মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, মধ্য বয়সের নারীরাই বেশি কেনাকাটা করছেন। যেসব প্যাভিলিয়ন ও স্টলে ইমিটেশনের গয়না, মেয়েদের পোশাক, চাদর ও কসমেটিকস প্রদর্শিত হচ্ছে সেসব স্টলে ভিড় বেশি, আর বেচা-কেনাও ভালো।
তবে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের অভিযোগ, বাণিজ্যমেলায় বিদেশি স্টলগুলোতে বিদেশি পণ্যের ভিতরে চলছে বাংলাদেশি পণ্য বিক্রি। না চিনে ঠকছেন ক্রেতারা।
এছাড়া ছেলেদের টি-শাার্ট থেকে মেয়েদের থ্রি-পিস, স্কার্ট, চুলের ক্লিপ-খোপা থেকে রাইস কুকার-কারি কুকার সব পণ্যেরই দাম খুলনার মার্কেটগুলোর থেকে বেশি। কোনো কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে দাম প্রায় দ্বিগুণ। বিভিন্ন ব্রান্ডের পণ্য নির্ধারিত মূল্যে বিক্রয়ে ভোক্তা অধিকার আইনের নিয়মও মানা হচ্ছে না। সব ধরনের খাবারের দাম অনেক বেশি। ফলে মেলায় আসা ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন।
মেলায় ঘুরতে আসা এনজিও কর্মকর্তা সুজন আহমেদ বলেন, মেলায় অনেক পণ্যের দাম খুলনার স্থানীয় বাজারের চেয়ে বেশি।
সরকারি এমএম সিটি কলেজের ছাত্রী আয়েশা খাতুন বলেন, এক দামে চটি ঘর থেকে জুতা কিনব বলে ঠিক করি। কিন্তু জুতার দাম শুনে বুঝতে পারলাম এখানে এক দামের নামে আমাদের সাথে প্রতারণা চলছে। যে জুতার দাম ২৫০ টাকা দাবি করা হচ্ছে খুলনার বড়বাজারে তার দাম সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা। এটি বুঝতে পারার পর আমি থ্রি পিস ও বিভিন্ন কসমেটিকসের দাম জানতে চেষ্টা করি। বুঝতে পারি মেলায় সব ক্ষেত্রে স্থানীয় বাজার থেকে দাম বেশ চড়া। এছাড়া মেলায় ওঠানো পণ্যের মানও তেমন ভালো নয়।
আযম খান সরকারি কমার্স কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রেশমা ও পুতুল বলেন, নিম্নমানের দেশি পণ্য সাজিয়ে বিদেশি পণ্য দাবি করে ক্রেতাদের সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে। আর দাম নেওয়া হচ্ছে স্থানীয় বাজার থেকে বেশি।
বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা শারমিন জানান, ইরানি মেলামাইনের নামে আদতে বিক্রি হচ্ছে ইন্ডিয়া, চায়না সহ বিভিন্ন দেশি প্রোডাক্ট। তুর্কি মেলামাইনের পণ্যের বেলায়ও একই অবস্থা।
তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। তাহলে এভাবে আলাদা আলাদা দেশের স্টল করার কোনো মানেই হয় না।
তবে এসব মেলামাইনের দোকানিরা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
বাণিজ্য মেলায় পণ্য সামগ্রীর বেশি মূল্য নেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি খাবারের মূল্যও বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে।
মেলায় ঘুরতে আসা ক্রেতা-দর্শনার্থীরা জানান, ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে গেলে বা কিছু খেতে মন চাইলে গলাকাটা দাম রাখছে খাবারের স্টলগুলো।
খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সহ-সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম ও পরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম চন্দন বলেন, পণ্যের মূল্য বেশি রাখা ও এক পণ্যের নামে অন্য পণ্য বিক্রির অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা ব্যবস্থা নেব। পাশাপাশি আমরা বলবো ক্রেতাদের সচেতনতা বেশি দরকার।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর খুলনার উপ-পরিচালক (উপসচিব) সৈয়দ রবিউল আলম বলেন, ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন হলে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এছাড়া খুলনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় চলছে ভ্যাট ফাঁকির মহোৎসব। এ ব্যাপারে মেলায় আগত স্টল মালিকরা মানছেন না কোনো নীতিমালা। প্রতিদিন ভ্যাট পরিশোধের নিয়ম থাকলেও কোন স্টল মালিক এ পর্যন্ত ভ্যাট বাবদ রাজস্ব বোর্ডকে কোন প্রকার টাকা পরিশোধ করেননি। এ নিয়ে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে শুধু মালিকদের উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে রাজস্ব বোর্ড।
জানা যায়, এবারের বাণিজ্যমেলায় সাধারণ পণ্যের ভ্যাট বিক্রয়মূল্যের ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। স্টলগুলোতে ক্যাশ রেজিস্ট্রারের নিয়ম থাকলেও কেউ তা ব্যবহার করছেন না। কোনো ধরনের ক্যাশ মেমো ব্যবহার করা হচ্ছে না। ফলে বিক্রয়ের পরিমাণ জানার উপায় না থাকায় ভ্যাট প্রদানের সময় স্টল মালিকরা বিক্রি কম দেখিয়ে ভ্যাট পরিশোধ করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হামকো প্লাস্টিকের প্যাভিলিয়ন থেকে প্রায় ৩ হাজার টাকার পণ্য কিনেছেন সুকুমার সাহা। ক্রয়ের পর বিক্রেতা শাহিন তাকে কোনো ক্যাশ মেমো দেননি। ক্রেতা সুকুমারও চাননি।

ইরানী মেলামাইনের বিক্রেতা বেলাল হোসেন বলেন, খুলনার মেলায় বেচা-কেনা কম, যেকারণে ক্যাশ মেমো দেই না।
একই অভিমত ব্যক্ত করেন ইরানি কার্পেট কর্নার, তুর্কি মেলামাইন ও পাকিস্তানি স্টলের বিক্রেতারা।
এসব বিক্রেতাদের কাছে ভ্যাট কিভাবে দিবেন জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘একটা বুঝ-ব্যবস্থা করবো।’
এ বিষয়ে কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের এসি সমরজিৎ দাস বলেন, ‘মেলায় কাস্টমসের অফিস থাকার কথা থাকলেও আমরা করতে পারিনি। তবে ভ্যাট সংক্রান্ত কাজের জন্য একজন অফিসার নিয়োগ দেওয়া আছে। তিনি ভ্যাট প্রদানের জন্য সার্বক্ষণিক স্টল মালিকদের উৎসাহ দিচ্ছেন।’
স্টলগুলোর ক্রেতাদের ক্যাশ মেমো না দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মেলায় অভিযান চালিয়ে ভ্যাট আদায় নিশ্চিত করার কাজ চলছে। এ বিষয়ে খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২ মার্চ ১৩তম খুলনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা -২০১৪ সার্কিট হাউজ ময়দানে উদ্বোধন করা হলেও শুরু হয় ৪মার্চ। চলবে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত। খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ও মেসার্স চামেলী ট্রেডার্স যৌথভাবে এ মেলার আয়োজন করেছে।
মেলায় দেশি-বিদেশি রকমারি পণ্যের পসরা সাজিয়ে ১৫২টি স্টল ও ৬টি প্যাভিলিয়ন রয়েছে। প্রতিদিন সকাল  ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দর্শনার্থী ও ক্রেতাদের জন্য মেলা উন্মুক্ত রয়েছে।