কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর

kader---hang

Kader-Mollaমানবতা বিরোধী মামলায় ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত  আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাত  দশটা এক মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

মানবতা বিরোধী অপরাধ মামলায়  এই প্রথম কারও রায় কার্যকর করা হলো।

দণ্ড কার্যকর করতে সহায়তাকারী জল্লাদের প্রধান ছিলেন শাহজাহান ভুঁইয়া। উপস্থিত ছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক মাঈন উদ্দিন খন্দকার, উপ-কারা মহাপরিদর্শক গোলাম হায়দার, ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শেখ ইউসুফ হারুন, জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক ফরমান আলী, কারাধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান, ঢাকার সিভিল সার্জন আবদুল মালেক, কারা চিকিৎসক রথীন্দ্রনাথ শম্ভু প্রমুখ।
চারজন জল্লাদ তাঁর (কাদের মোল্লা) ফাঁসি কার্যকর করেন। রাতেই অ্যাম্বুলেন্সে করে পুলিশি পাহারায় লাশ ফরিদপুরে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

কারাগার সূত্র জানিয়েছে, ফাঁসি দেওয়ার প্রায় ২০ মিনিট পর ১০টা ২১ মিনিটে তাঁকে নামানো হয়। এরপর কিছু প্রক্রিয়া শেষে কারাগারের দুজন চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

এর আগে রাত নয়টার দিকে কাদের মোল্লাকে গোসল করানো হয়। সাড়ে নয়টায় তিনি নামাজ আদায় করেন। ১৫ মিনিট পর তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। নয়টা ৫৫ মিনিটে কারা জামে মসজিদের ইমাম মনির হোসেন তাঁকে তওবা পড়ান। এরপর ফাঁসির মঞ্চে নেওয়া হয়। প্রথা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক তাঁর হাতে রাখা একটি লাল রুমাল মাটিতে ফেললে প্রধান জল্লাদ শাহজাহান ভুঁইয়া ফাঁসির মঞ্চের লিভার (লোহার তৈরি বিশেষ হাতল) টেনে দেন। এতে পায়ের তলা থেকে কাঠ সরে ফাঁসি কার্যকর হয়।

কারাগারের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এর আগে বিকেল সোয়া চারটায় দিকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজের আদেশ কারা কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছায়। এর পরপরই দুজন ম্যাজিস্ট্রেট কাদের মোল্লার কাছে যান। কাদের মোল্লা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না জানতে চাইলে তিনি ম্যাজিস্ট্রেটদের জানান, রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর প্রায় পৌনে চার বছরের আইনি লড়াই শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে একাত্তরের নির্মমতার বিচারহীনতা থেকে মুক্তি পেল জাতি। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মুক্তিযুদ্ধকালের মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য কারও সর্বোচ্চ সাজা কার্যকর হলো।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় (১০ ডিসেম্বর) কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের ঘোষণা দিয়ে সরকারের সংবাদ সম্মেলন এবং শেষ মুহূর্তে ফাঁসির কার্যক্রমে নাটকীয় স্থগিতাদেশের পর গতকাল রাতে আর কোনো আগাম ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তবে পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি পেয়ে গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে স্ত্রী সানোয়ার জাহান, ছেলে হাসান জামিলসহ পরিবারের ১০ সদস্য কারাগারে গিয়ে কাদের মোল্লার সঙ্গে দেখা করেন।

এর আগে দুপুর ১২টার দিকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কাদের মোল্লার রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) দুটি আবেদন গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় খারিজ করে দেন।

বাংলাদেশে বিচারের শুরু থেকেই জামায়াতে ইসলামীসহ একটি পক্ষ বিচার-প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে। বিশ্বের যেসব দেশে এখন আর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় না, সেসব দেশও সর্বোচ্চ সাজার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান জানিয়ে আসছিল।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়ের সঙ্গে এ দেশের তরুণ প্রজন্মের নাম জড়িয়ে থাকবে চিরদিন। একাত্তরে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে সাড়া জাগিয়ে ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ক্ষমতায় আসার এক বছর পর ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে সরকার বিচার-প্রক্রিয়া শুরু করে। কিন্তু চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলে রায়ে অসন্তুষ্ট তরুণ প্রজন্ম রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সারা দেশে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ।

গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের ফলে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষকে আপিলের সমান সুযোগ দিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩ সংশোধন করে জাতীয় সংসদ। দুই পক্ষই শরণাপন্ন হয় সর্বোচ্চ আদালতের। ছয় মাসের আইনি লড়াই শেষে ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ চূড়ান্ত রায়ে কাদের মোল্লার ফাঁসির আদেশ দেন। এরও প্রায় তিন মাস পর ৫ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের ৭৯০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ৮ ডিসেম্বর কাদের মোল্লার মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। ওই দিনই তা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। এর পরই সরকার সাজা কার্যকরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

গতকাল রাতে কারাগারে কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে শাহবাগে তিন দিন থেকে অবস্থান নেওয়া গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা স্বস্তি প্রকাশ করেন। দণ্ড কার্যকরের বিষয়টি মাইকে ঘোষণার পর আলোর মিছিল করেন তাঁরা।

নিজস্ব আইনে ও দেশীয় আদালতে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করায় বাংলাদেশ ইতিহাস হয়ে থাকবে। কম্বোডিয়াকে এ বিচারের জন্য ৩৭ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, কিন্তু তাদের জাতিসংঘের সাহায্য নিতে হয়েছে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত সময়ে কম্বোডিয়ায় ঘটে যাওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ১৯৯৭ সালে হাইব্রিড ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ওই ট্রাইব্যুনাল ২০১০ সালে প্রথম রায় দেন, ২০১২ সালে কম্বোডিয়ার সুপ্রিম কোর্ট তা চূড়ান্ত করেন।