দেবতার চরণে চৈত্রমাসের ফুল

0
98
images

imagesদেবতার চরণে চৈত্রমাসের ফুল। পুরোনো বছরের বিদায়, নতুন বর্ষকে বরণ করে নিতে পাহাড় সাজবে ফুলে ফুলে। পাহাড়-হ্রদ আর অরণ্যের শহর রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি আর বান্দরবান। এখানকার আদিবাসী তিন সম্প্রদায়ের বর্ষবিদায় এবং বর্ষবরণের উৎসব ‘বৈসাবি’ এখন কড়া নাড়ছে পাহাড়ের দোরগোড়ায়।

বৈচিত্র্যময় ধর্মীয় উৎসব পালনে বাঙালিদের ইতিহাস হাজার বছরের। ঈদ, পূজা, পার্বন কি নেয় বাঙালিদের। মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ কিংবা আদিবাসীরা নিজস্ব সংস্কৃতিতে নিজস্ব ধর্মীয় রীতিনীতিতে পালন করে থাকেন এসব ধর্মীয় উৎসব। বাঙালিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্য থাকে আদিবাসীদের ধর্মীয় উৎসবে।

চৈত্রমাসের বিদায় ঘণ্টা বেজে উঠলেই শুরু হয়ে যায় আদিবাসীদের প্রাণের উৎসব বৈসাবির আয়োজন। চাকমাদের ভাষায় এ উৎসবকে বিঝু, ত্রিপুরাদের ভাষায় বৈসুক এবং মারমাদের ভাষায় সাংগ্রাই এবং তংচঙ্গ্যাদের ভাষায় বিসু নামে আখ্যায়িত করা হয়। তিন সম্প্রদায়ের প্রাণের এই উৎসবের নামের আদ্যক্ষর নিয়েই তাই এই মহান উৎসবকে বলা হয় ‘বৈসাবি’ উৎসব।

ত্রিপুরারা ধর্মীয় এবং সামাজিক রীতিনীতিতে চৈত্র মাসের শেষের দুইদিন ও নববর্ষের প্রথমদিনটিসহ মোট তিনদিন ধরে বৈসুক পালন করে। চৈত্রমাসের শেষ দুইদিনের প্রথম দিনটিকে ত্রিপুরারা ‘হারি বুইসুক’ এবং শেষ দিনটিকে ‘বুইসুকমা’ এবং তৃতীয় দিনকে ‘বিসিকাতাল’ নামে অভিহিত করে থাকে। আর নববর্ষের প্রথমদিনটিকে তারা বলে ‘বিসিকাতাল’। উৎসবের প্রথমদিন ত্রিপুরা ছেলেমেয়েরা গাছ থেকে ফুল তোলে। ফুল দিয়ে ঘর সাজায়। পরিচ্ছন্ন কাপড় চোপড় পরে ছেলেমেয়েরা গ্রামের ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়ায়। বৈসুক শুরুর দিন থেকে ‘গরাইয়া’ নৃত্যদল গ্রামে গ্রামে গিয়ে প্রত্যেক ঘরের উঠোনে নৃত্য করে।

ত্রিপুরারা বিশ্বাস করেন, কোনো শিল্পী যদি একবার এই গরাইয়া নৃত্যে অংশ নেয় তবে তাকে তিন বছর পর পর এই নৃত্যে অংশ নিতে হয় নতুবা তার অমঙ্গল এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। এই লোকনৃত্যটিতে ১৬ জন থেকে ১০০/১৫০/৫০০ জন পর্যন্ত অংশ নিতে পারে।

বৈসাবি উৎসবের ‘সা’ আদ্যক্ষরটি পাহাড়ের অন্যতম নৃ-গোষ্ঠী মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ উৎসব থেকে নেওয়া। মারমারা সাধারণত চন্দ্রমাস অনুসারে এই দিনটি পালন করে থাকে। বছরের শেষ দুইদিন এবং নববর্ষের প্রথমদিন-এই তিনদিন পালিত হয় এই উৎসব। সাংগ্রাই উৎসব উদযাপনের সময় মারমা তরুণ-তরুণীরা পিঠা তৈরি করার জন্য চালের গুঁড়া প্রস্তুত করে। সাংগ্রাই উৎসব এবং পানি খেলা এখন যেনো একে অপরের সমার্থক হয়ে গেছে। এই খেলার সময় এক জায়গায় পানি ভর্তি রেখে তরুণ-তরূণীরা একে অপরের দিকে পানি ছুড়ে মারে। স্নিগ্ধতায়, ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায় ভিজিয়ে দেয় পরস্পরকে। চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে সাংগ্রাই উৎসব পালন করা হয় বলে ধারণা করা হয়। সংক্রান্তি শব্দ থেকেই সাংগ্রাই শব্দটি এসেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় আদিবাসী সম্প্রদায় হলো চাকমা। চাকমাদের ধর্মীয় উৎসব বিঝু। এই উৎসবের সাথে তাই যেনো দুলে ওঠে সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম। উৎসবরে প্রথম দিনকে চাকমারা বলে ‘ফুলবিঝু’। এই দিন বিঝুর ফুল তোলা হয় এবং ফুল দিয়ে ঘর সাজানো হয়। সে ফুল দিনান্তে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। বিঝুতে চাকমাদের ঘরে ঘরে রান্না করা হয় ‘পাজোন’ নামের এক বিখ্যাত খাবার। হরেক রকম সবজি আর তরকারির সমন্বয়ে রান্না করা হয় এই উৎসবে। গ্রাম্য ছেলে-মেয়েরা ঘিলা খেলা, গুদু (হাডুডু) খেলায় মেতে ওঠে আর আকাশ প্রদীপ জ্বালায় এবং বাজী ফোটায় মহানন্দে। বয়স্করা মদ, ডাবা, জগরা বা কাজ্ঞি পান করে। বিঝু উৎসবের সময় কোনো প্রাণী হত্যা করা হয় না। তবে নববর্ষের দিন মাছ-মাংসসহ মজার মজার সব খাবারের আয়োজন থাকে। কেননা এই দিন ভালো কিছু খেলে সারাবছর ধরে ভালো খেতে পাওয়া যায় বলে তারা বিশ্বাস করে।

প্রতিবছর বৈসাবি উৎসব আসলেই পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ে উৎসব আনন্দ। নব আনন্দে জাগে পাহাড়ের আদিবাসী প্রাণ। রঙিন ফুলে সেজে উঠে পাহাড় আর পাহাড়ী ঘরবাড়ি।

এসএসআর/কেএফ