ক’টা টাকার জন্য মিসকিন হয়ে গেল আমার ছেলেটা !

0
153
old woman

old womanভাইয়ার বিদেশ থেকে পাঠানো টাকায় সংসার চলত আমাদের। কোনো মাসে টাকা আসতে দেরি হলেই বাবা অস্থির হয়ে পড়তেন। কখন টাকা আসবে?

পরিবারের আট সদস্যের মুখে অন্ন দেওয়া ও আমাদের পাঁচ ভাই-বোনের লেখাপড়ার খরচ বাবা একা সামলাতে পারতেন না। তাই তো ভাইয়া ইন্টারমিডিয়েট পাশ করতে না করতেই বাবা তাকে সৌদি পাঠিয়ে দিলেন।

তখন অনেক কেঁদেছিলেন আমার বৃদ্ধ মা। অনুনয় বিনয় করে বাবাকে বলেছিলেন, ও এখানেই কোথাও কাজ করবে বিদেশে যাওয়ার কী দরকার?

তবু স্বনির্ভর ভবিষ্যতের আশায় বাবা ভাইয়াকে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন।

দীর্ঘ পাঁচটি বছর কাটিয়ে আমার পরবাসী ভাইটা দেশে বেড়াতে এল। আমরা মহাখুশি। অনেক অনেক উপটৌকন পেয়ে মনে হলো এই বুঝি সুখ, এই ত স্বনির্ভরতা।

অর্থকড়ি নিয়ে আর চিন্তা করে কপালে ভাঁজ ফেলবে না বাবা। মাসের শেষভাগে সংসারের জ্বালা সইতে না পেরে মা কাঁদবেন না। এই স্বনির্ভরতার আনন্দের চেয়ে কিইবা বড় হতে পারে আমার।

বিদেশের পরিবেশে থেকে ভিন্ন জলবায়ুতে ভাইয়া অনেক স্বাস্থ্যবান হয়েছেন। ভাইয়ার আলুথালু স্বাস্থ্যের বাহবা দিয়ে বাবা আমার মায়ের উদ্দেশে বললেন, তখন তো  কিছুতেই যেতে দিতে চাইছিলে না এখন দেখেছ ছেলেটা আমার কত ভালো আছে। স্বাস্থ্যটা মাশাল্লাহ ভালোই হয়েছে, কি বলো?

মা কিছু বলেন না। ভাবেন আর তো ক’টা দিন। ছুটি শেষ হয়ে গেলেই ছেলেটাকে চলে যেতে হবে। এ কষ্টটা সব সুখকে ম্লান করে দিয়েছিল আমার মায়ের কাছে।

ছুটি শেষ হয়ে আসছে। ঘনিয়ে এল ভাইয়ার আবারও বিদেশ পাড়ি দেওয়ার দিনটি। এক রাত্রিবেলায় মায়ের ফোঁপানো কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম মমতার সেই প্রতিমাকে। ভাঙা গলায় জানতে চাইলাম, মাগো- ভাইয়া চলে যাচ্ছে বলেই কি তুমি কাঁদছো?

আমার ছোট ছোট হাত দিয়ে মায়ের চোখ মুছে দিলাম। মা বলল, ওই দেশে নাকি তোর ভাইয়াকে মিসকিন বলে সম্বোধন করে। ক’টা টাকার জন্য মিসকিন হয়ে গেল আমার ছেলেটা।

সম্পদ না থাকলেও আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার দুঃখে মা আমার কান্না থামাতেই পারছিলেন না সেদিন। আমিও না বুঝে মায়ের কান্নায় যোগ দিলাম।

সেদিন বুঝিনি, তবে আজ বুঝি আমাদের কান্না ভাইয়ার মিসকিন হওয়া কেন ঠেকাতে পারেনি? দেশে থাকলে কি করবে ভাইয়া? কে দেবে খেয়েপড়ে বেঁচে থাকার মতো একটা চাকরি?

তার চেয়ে ঢের ভালো রেমিটেন্স… বিদেশি টাকা।

দেশে শিক্ষিত বেকাররা চাকরি খুঁজে পায়না। কদিন আগে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোতে দেখলাম উচ্চ শিক্ষিত ছেলেরাই বেশি বেকারত্বে রয়েছে।

আজ দেখলাম বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ২৩টি দেশে কারান্তরীন রয়েছে ৪৫৪৬ জন বাংলাদেশি। প্রবাসী শ্রমিকদের এই অপরাধ প্রবণতা জনশক্তি রপ্তানিতে প্রভাব ফেলছে।

এমন আশংকা করে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, প্রবাসী কর্মীরা বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধি। তাদের কাছে অনুরোধ, তারা যেন এমন কিছু না করেন, যাতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।

নিজের দেশের ভাবমূর্তি আর রেমিটেন্স নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত মন্ত্রীকে কি বলব আমি? তিনি ত আর জানেন না মধ্যপ্রাচ্যের ওসব দেশে আমাদের মিসকিন বলে ডাকা হয়। বিদেশ পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ভিসা জালিয়াত চক্রের পাল্লায় পড়ে অনেকে অবৈধ পথেও চলে যায় ওসব দেশে। উৎকোচের মাধ্যমে ওমরাহ ভিসা নিয়ে কত অপরাধী, খুনি, ধর্ষক পাড়ি জমিয়েছে ওই মধ্যপ্রাচ্যে তার ইয়ত্তা নেয়।

আরব দেশগুলোর সাথে বন্দিবিনময় চুক্তি না থাকায় দাগী অপরাধীদের নজর থাকে মধ্যপাচ্যের দেশগুলোর প্রতি।

জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে তবু একটা কথা না বললেই নয়। গণচীন তাদের জনশক্তি কাজে লাগিয়ে উন্নত বিশ্বের সাথে টেক্কা দিচ্ছে। আর আমাদের দেশে সন্তান বড় হলেই বিদেশ পাঠানো ছাড়া উপায় খুঁজে পায় না অভিভাবকরা।

যদি বিদেশ পাঠাতেই হয় তবে বিদেশে যাওয়ার আগে প্রত্যেক কর্মীকে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন কানুন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া দরকার। তাদের জানানো দরকার ওই দেশের রীতিনীতি কী ? চুরির দায়ে, খুনের দায়ে কোন দেশে কী শাস্তি পেতে হবে সবই তাদের জানাতে হবে।

ভুলে গেলে চলবে না বিদেশেও অপরাধীরা রয়েছে, নিজের দেশের খুনিরাও ওসব দেশে আত্মগোপন করে আছে।

ওসব চক্র থেকে সতর্ক থাকার কথা কি তাদের বলা হয়েছে?

তাদের কথা, তাদের ভাবনা তাদের কী কষ্ট তা না জেনেই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়ে যায় আমাদের। কি কষ্ট..কি কষ্ট….

এআর