ব্যাংক এশিয়ার প্রশ্নবিদ্ধ সিএসআর

0
113

Bank_asia_sm_183983226কিছুদিন আগে নির্দিষ্ট কিছু এলাকা উল্লেখ করে সেসব এলাকার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বৃত্তি পাওয়ার জন্য আবেদনপত্র আহ্বান করে ব্যাংক এশিয়া লিমিটেড। এক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে স্নাতকে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাংক এশিয়ার নির্দিষ্ট এলাকার শিক্ষার্থীদের মাঝে উপবৃত্তি প্রদান এবং এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিষয় উল্লেখ করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অর্থনীতিবিদরা। এতে প্রকৃত করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তারা। এর ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকার দরিদ্র মেধাবি শিক্ষার্থীরা এবং যারা ভালো বিষয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়নি তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলো বলে উল্লেখ করেছেন তারা। এটাকে চরম বৈষম্যমূলক বলেও আখ্যায়িত করেছেন এসব বিশেষজ্ঞরা।

তবে ব্যাংক এশিয়া দাবি করেছে যেসব এলাকায় তাদের শাখা রয়েছে শুধু সেসব এলাকায় তারা শিক্ষার্থীদের মাঝে বৃত্তি দিবে। এসব এলাকার মানুষের অধিকার আছে বলেই প্রথমে তাদের দিকেই আগ্রহটা বেশি বলে দাবি করেন এ ব্যাংকটির কর্মকর্তারা।

গত ১৪ মার্চ একটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বৃত্তি পাওয়ার জন্য আবেদনপত্র আহ্বান করে ব্যাংক এশিয়া। এ বিজ্ঞাপনে দেশের ১৩ টি জেলার ৩২ টি এলাকা (থানা ও ইউনিয়ন) নির্দিষ্ট করে সেসব এলাকার শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পাওয়ার জন্য আবেদন করতে বলা হয়।

যারা ২০১৩ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিভিন্ন উচ্চমানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষি, ব্যবসায় প্রসাশন, অর্থনীতি, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত, কম্পিউটার সায়েন্স জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা এ ধরনের মূল বিষয়ে ভর্তি হয়েছে শুধু তারাই এ বৃত্তির জন্য আবেদন করতে পারবে বলে বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। বৃত্তি প্রাপ্ত শিক্ষার্থীকে প্রতি মাসে বৃত্তি বাবদ ২ হাজার টাকা এবং প্রতি বছর বই ক্রয় ও টিউশন ফি বাবদ ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে বলে ওই বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর-এর মূল লক্ষ্য হলো সমাজের পিছিয়ে পড়া অসহায় জনগণের উন্নয়নের জন্য কাজ করা। এ কারণে প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সিএসআর কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর মোট সিএসআর খাতে ব্যয় করা অর্থের ৩০ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করতে হবে বলেও নির্দেশনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি প্রদান ও শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ অন্যতম। আর এটা কোন নির্দিষ্ট এলাকা বা নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীদের জন্য প্রদান করা অন্যদের প্রতি চরম বৈষম্য বলে জানান তারা।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এ বি এম মির্জা আজিজ অর্থসূচককে বলেন, কোনো ব্যাংকের পলিসি যদি কোনো নির্দিষ্ট এলাকার উন্নয়নের জন্য হয়ে থাকে তাহলে সেটা খুবই ভালো দিক। তবে এক্ষেত্রে সব ধরণের শিক্ষার্থীদেরই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কিন্তু ব্যাংক এশিয়া যেটা করছে সেটা নৈতিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মনে হচ্ছে তারা নিজেদের স্বার্থের জন্যই এটা করছে। যা সিএসআর-এর মূল লক্ষ্যের মধ্যে পড়ে না বলে জানান তিনি। শিক্ষাবৃত্তিটা মেধার ভিত্তিতে সব ধরণের শিক্ষার্থীদের মধ্যেই দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মুনসুর অর্থসূচককে বলেন, সিএসআর-এর মূল লক্ষ্য হলো জাতিগত উন্নয়নের জন্য কাজ করা। এক্ষেত্রে যে এলাকায় ব্যাংকের শাখা নেই সেই এলাকায় উপবৃত্তি বা সিএসআর করা যাবে না এটা ঠিক নয়। অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকের শাখাগুলো থাকে শহর এলাকায়। তাই ব্যাংকগুলো যদি তাদের শাখাকে কেন্দ্র করে সিএসআর করতে চায় তাহলে দেশের বিরাট একটা অংশ অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। তবে এলাকাটা যদি চরাঞ্চল বা পশ্চাৎপদ এলাকা হয় তাহলে সেটা  অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ব্যাংকিং ও সিএসআর বিভাগের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র ম. মাহফুজুর রহমান অর্থসূচককে বলেন, ব্যাংক এশিয়ার শিক্ষাবৃত্তি প্রদানের বিজ্ঞাপনটি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা এ ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংকটির সাথে যোগাযোগ করে এর কারণ জানতে চেয়েছি।

তিনি বলেন, নির্দিষ্ট এলাকায় সিএসআর করা সিএসআর নীতিমালার পরিপন্থী। এতে অন্য এলাকার লোক বঞ্চিত হবে। তাছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যেও নির্দিষ্ট এলাকায় সিএসআর করার প্রকণতা তৈরি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষাবৃত্তি প্রদানের নামে তাদের প্রচারনা বেশি করছে। এ জন্য তারা বেশি টাকাও খরচ করছে। এতে সিএসআর-এর মূল লক্ষ্যই আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। আর এ কারণে সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সিএসআর-এর জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে আলাদা করে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করার চিন্তা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে ব্যাংক এশিয়া লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মেহমুদ হুসাইন অর্থসূচককে বলেন, যেসব এলাকায় ব্যাংক এশিয়ার শাখা রয়েছে বা যাদের নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি তাদের চাওয়া পাওয়া ও অধিকার রয়েছে। আমরা এ দিকটিকেই প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষাবৃত্তি প্রদানের স্থান নির্ধারণ করেছি। এসব এলাকার মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন পূরণ করাই এ বৃত্তি প্রদানের মূল লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

এসএই/