‘প্রবৃদ্ধি অর্জনে টেকসই নদীপথের উন্নয়নের বিকল্প নেই’

নিজস্ব প্রতিবেদক

0
56

প্রবৃদ্ধি অর্জনে টেকসই নদীপথের উন্নয়নের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান।

আজ রাজধানীর লেকশোর হোটেলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘অভ্যন্তরীণ নৌপথ: আর্থিক সম্ভাবনার সুযোগ’ বিষয়ক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭% এর বেশি রয়েছে। তবে দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় নীতিমালার সংস্কার করা হলে প্রবৃদ্ধির এ ধারাকে ৮.৫% হতে ৯% উন্নীত করা সম্ভব। তিনি সকল সমুদ্র বন্দর, নদীবন্দর এবং স্থলবন্দর সমূহের অবকাঠামো উন্নয়ন ও নিয়োজিত মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নের উপর বিশেষভাবে জোরারোপ করেন।

তিনি অরোও বলেন, ভারতের সঙ্গে ট্রান্সশিপমেন্ট কার্যকর ভাবে চালু করতে  হলে ভারতের সঙ্গে এ বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা প্রয়োজন। ট্রান্সশিপমেন্ট ব্যবস্থা চালু হলে আয় কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তেমন নেই বরং আমাদের বন্দরের পাশাপাশি সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে। তিনি দ্রুততম সময়ে পণ্য খালাসের জন্য কাস্টম অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনা দক্ষতা আরোও বাড়ানোর উপর জোরারোপ করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের নৌ মন্ত্রণালয় বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রাক্তন চেয়ারম্যান নূর-ই-আলম চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার পাঁনগাও এবং পায়রাবন্দর স্থাপনের মাধ্যমে দেশের নৌপথের উন্নয়নে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে পাঁনগাও বন্দর কর্তৃপক্ষের আওতায় ৩টি, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ২টি, বিআইডব্লিউটিসির ৩টি এবং বেসরকারি মালিকানায় ৫০টি জাহাজ পরিচালনার অনুমোদন করেছে।

চৌধুরী বলেন, পাঁনগাওবন্দরে কন্টেনার পরিববহনের ক্ষেত্রে ৩ বছরের জন্য শুল্ক চার্জ প্রায় ৭০% হ্রাস করেছে এবং মোংলাবন্দরে কন্টেনার পরিবহনের ক্ষেত্রে শুল্ক চার্জ ৩ বছরের জন্য ৬৫-৭০% কমিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, পাঁনগাও বন্দর হতে চট্রগ্রাম বন্দর পর্যন্ত প্রতি কন্টেনারের চার্জ হলো ১০০ মার্কিন ডলার। মোংলাবন্দর দীর্ঘদিন যাবত পরিচালিত হলেও বড় জাহাজের কন্টেনার হ্যান্ডলিং-এর জন্য এখনও পর্যন্ত কোনো ক্রেন নেই। তিনি বেসরকারি মালিকানায় পরিচালিত বন্দরসমূহের সুষ্ঠু বিকাশে নীতিমালা ও আইন প্রণয়নের উপর জোরারোপ করেন। তিনি পণ্য খালাসে জটিলতা ও ব্যয় হ্রাসে গভীর সমুদ্র এলকায় ভাসমান বন্দর স্থাপনের প্রস্তাব করেন। তিনি উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণে শিল্প-কারখানা ও অর্থনৈতিক অঞ্চল সমূহে স্টোরেজ ব্যবস্থাপনা আরো সম্প্রসারণের জন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান।

স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি এবং এক্ষেত্রে নৌপরিবহন খাতের অবস্থান আরোও নাজুক।

তিনি বলেন, বিশেষত চট্রগ্রাম বন্দর হতে কন্টেইনার পরিবহনে আমাদের সড়ক ও রেল পথের উপর বেশিমাত্রায় নির্ভরশীল। তবে এ ক্ষেত্রে নৌপথ ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হলে সময় এবং ব্যবসায় ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। তিনি প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সমূহের সঙ্গে নৌপথ ও সমুদ্রবন্দর সমূহের সঙ্গে যোগযোগ বাড়াতে কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।

সেমিনারে ঢাকা চেম্বারের আহবায়ক ও সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেড-এর অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াসির রিজভী মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

মূল প্রবন্ধে তিনি অভ্যন্তরীণ কার্গো চলাচলের সুযোগ বৃদ্ধি, আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং টেকসই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধির উপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি জানান, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আন্ত:আঞ্চলিক বাণিজ্য বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলগুলোর তুলনায় কম। তিনি অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর সব ধরনের কার্গো হ্যান্ডলিং-এর সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং এ বিষয়ক প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও সংস্কারের উপর আহবান জানান। তিনি ‘ন্যাশনাল মেরিটাইম অ্যান্ড পোর্ট অথরিটি’ নামে একটি কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব করেন।

ডিসিসিআইর প্রাক্তন সভাপতি হোসেন খালেদ-এর সঞ্চালিত মুক্ত আলোচনায় মায়ার্স্ক বাংলাদেশ লিমিটেড-এর কান্ট্রি অপারেশন্স ম্যানেজার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম চৌধুরী, পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কন্টেনার টার্মিনাল-এর টার্মিনাল ম্যানেজার আহামেদুল করিম চৌধুরী এবং মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার (বাংলাদেশ ও মায়ানমার)-এর কান্ট্রি হেড স্বপ্না ভৌমিক অংশগ্রহণ করেন।

মায়ার্স্ক বাংলাদেশ লিমিটেড-এর কান্ট্রি অপারেশন্স ম্যানেজার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম চৌধুরী বলেন, চট্রগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বন্দরের স্টোরেজ ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণ এবং বন্দরের সেবা প্রদানে দক্ষতা বাড়ানো একান্ত আবশ্যক।

পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কন্টেনার টার্মিনাল-এর টার্মিনাল ম্যানেজার আহামেদুল করিম চৌধুরী বলেন, ২০১৬ সালে পাঁনগাও বন্দরের মাধ্যমে ৪০০০ কন্টেনার হ্যান্ডলিং হলেও ২০১৭ সালে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার কন্টেইনার। তিনি অভ্যন্তরীণ নদীপথে পণ্য পরিবহন বাড়ানোর জন্য নদীর নব্যতা বাড়ানোর উপর গুরুত্বারোপ করেন এবং পাঁনগাও সহ অন্যান্য বন্দর ব্যবহারে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় কে এগিয়ে আসার আহবান জানান।

মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার (বাংলাদেশ ও মায়ানমার)-এর কান্ট্রি হেড স্বপ্না ভৌমিক বাংলাদেশ হতে পণ্য আমদানি-রপ্তানি আরোও বৃদ্ধির জন্য আস্থা বাড়ানো এবং পণ্য পরিবহনে সিডিউল কার্যকরের উপর জোরারোপ করেন।

হোসেন খালেদ বলেন, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও আমরা আমাদের নদীপথের ব্যাপারে বরাবরই উদাসীন ছিলাম এবং নৌপরিবহনের জন্য মোট নদীপথের ৬ ভাগের ১ ভাগ অংশে প্রয়োজনীয় নাব্যতা রয়েছে। বন্দরসমূহে পণ্য খালাস ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সংগ্রহের সময় বাচাঁনো সম্ভব হলে আমাদের ব্যবসায় ব্যয় অনেকাংশে হ্রাস পাবে।

অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি কামরুল ইসলাম, সহ-সভাপতি রিয়াদ হোসেন, পরিচালক হোসেন এ সিকদার, ইমরান আহমেদ, খন্দকার রাশেদুল আহসান, মো. আলাউদ্দিন মালিক, মোহাম্মদ বাশীর উদ্দিন, নূহের লতিফ খান, ওয়াকার আহমেদ চৌধুরী এবং মহাসচিব এএইচএম রেজাউল কবির এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

অর্থসূচক/রহমত/জেডআর