মেয়াদি ফান্ডের দুর্দিনে বে-মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ছড়াছড়ি

0
86
Mutual-Fund
মিউচ্যুয়াল ফান্ড লোগো

MF-সময় ভালো যাচ্ছে না মিউচ্যুয়াল ফান্ডের। বিশেষ করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ মিউচ্যুয়াল ফান্ড দুঃসময় পার করছে। তালিকাভুক্ত ৪১ ফান্ডের মধ্যে ২৬টির ইউনিট লেনদেন হচ্ছে অভিহিত মূল্য বা ফেস ভ্যালুর নিচে।

বাজারে ইউনিটের দর ভালো না থাকায় প্রাথমিক গণ প্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে নতুন কোনো মেয়াদি ফান্ড আসছে না। এমন পরিস্থিতি বে-মেয়াদি ফান্ড আনার ঝোঁক বেড়েছে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলোর মধ্যে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সূত্রে জানা গেছে, গত তিন মাসে চারটি ফান্ডকে অনুমোদন দিয়েছে। এগুলো হচ্ছে, ইউএফএস ইউনিট ফান্ড, এলআরজিবি ইউনিট ফান্ড, আইসিবি এএমসিএল কনভার্টেড ফার্স্ট ইউনিট ফান্ড এবং সিএপিএম ইউনিট ফান্ড।

ইউএফএস ইউনিট ফান্ড নামে বে-মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের খসড়া ট্রাস্ট ডিড ও চুক্তি অনুমোদন করা হয় কমিশনের ৫১৩তম সভায়।

এই ফান্ডটির আকার ধরা হয়েছে ১০ কোটি টাকা। ফান্ডটির সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে ইউনিভার্সিয়াল ফিন্যান্সিয়াল সলোশন লিমিটেড কাজ করছে। ইউএফএস ইউনিট ফান্ডের ট্রাস্টি এবং কাস্টডিয়ান হিসেবে নিয়োজিত রয়েছে যথাক্রমে বাংলাদেশ জেনারেল ইনস্যুরন্সে কোম্পানি লিমিটেড এবং ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড।

আইসিবি এএমসিএল ১ম মিউচুয়্যাল ফান্ড মেয়াদি ফান্ড থেকে বে-মেয়াদিতে রূপান্তরিত হয়েছে। সেইসঙ্গে ফান্ডটির নাম বদলে হয়েছে আইসিবি এএমসিএল ফার্স্ট কনভার্টেড ইউনিট ফান্ড। কমিশনের ৫১০ তম কমিশন রূপান্তরিত ফান্ডের প্রসপেক্টাস অনুমোদন করা হয়।

আইসিবি এএমসিএল ফার্স্ট কনভার্টেড ইউনিট ফান্ডটির আকার ধরা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। এর মোট ইউনিট সংখ্যা ৫ কোটি, প্রতি ইউনিটের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা।

এই ফান্ডের ইউনিট এর স্পন্সর আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট এবং আইসিবি এএমসিএল ১ম মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটধারীদের মধ্যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফান্ডটির সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ক্যাপিটাল কাজ করছে।

এলআরজিবি ইউনিট ফান্ড নামে আরও একটি বে-মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ৫১১তম সভায় অনুমোদন দেয় কমিশন।

এই ফান্ডের আকার ধরা হয়েছে ১০ কোটি টাকা। উদ্যোক্তাদের অংশ ১ কোটি হবে। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রাথমিকভাবে বরাদ্দ বাকি ৯ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। অভিহিত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা। ফান্ডটির অভিহিত মূল্য ১০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ফান্ডটির সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছে এলআর গ্লোবাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড।

এছাড়া সিএপিএম নামে আরেকটি বে-মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ৫০৭তম সভায় অনুমোদন দেয় কমিশন।

এই ফান্ডের আকার ধরা হয়েছে ১০ কোটি টাকা। উদ্যোক্তাদের অংশ ১ কোটি হবে। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রাথমিকভাবে বরাদ্দ বাকি ৯ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। অভিহিত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ টাকা।

ফান্ডটির সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছে ক্যাপিটাল অ্যান্ড অ্যাসেট পোর্টফোলিও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড।

ডিএসই সূত্রে জানা যায়, তালিকাভুক্ত ৪১টি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৬টির বা ৬৩ শতাংশের ইউনিট দর ফেস ভ্যালুর নিচে রয়েছে। আর বাকি ১৫ টি ফেস ভ্যালুর ওপরে বেচা-কেনা হলেও সেগুলো খুবই সামান্য। যা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ধরে রাখতে পারছে না। কারণ ২০১০ সালের ধসের আগেও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিট দর ফেস ভ্যালুর কয়েক গুণ ওপরে ছিল। ওই সময় অনেকেই মিউচ্যুয়াল ফান্ড কিনেছিল।

তবে এখন একের পর এক দর হারানোর কারণে এ খাতে বিনিয়োগ করে বড় ধরনের আর্থিক লোকসানে রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। পুঁজিবাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে নিরাপদ বিনিয়োগ বলে মনে করেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তবে বাজারে ধসের কারণে এই খাতটিও বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি।

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, পুঁজিবাজারে ধসের কারণে বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছেন তারা। সমাপ্ত অর্থবছরেও ফান্ডগুলো ভালো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। আবার অনেক ফান্ড রিজার্ভ থেকে লভ্যাংশ দিয়েছে। এতে ফান্ডগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কিত তারা।

তবে বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বাজারে ধসের কারণে সবাইকে কম-বেশি ভুগতে হচ্ছে। যেখানে বাজারে সব কোম্পানির শেয়ারের দর কমেছে, সেখানে মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোর সম্পদমূল্য কমাটাই স্বাভাবিক। বরং বাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিসইসির বাধ্যবাধকতার কারণেও তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে জানান।

মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা অনুযায়ী, ফান্ডের ৭৫ শতাংশ অর্থ সেকেন্ডারি মার্কেটে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার, ডিবেঞ্চার বা অন্য কোনো ইনস্ট্রুমেন্টে বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর এ কারণে ২০১০ সালে শেয়ারবাজার যখন অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়ে, তখনও ফান্ডগুলোকে বিনিয়োগ করতে হয়েছে। ফলে বাজারে ধস নামার কারণে ফান্ডগুলোকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। আর ফান্ডগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ায় একদিকে বাজারে দর কমেছে ফান্ডগুলোর, অপরদিকে ইউনিট হোল্ডারদের আকর্ষণীয় লভ্যাংশ দিতে না পারায় আরও দ্রুত দর কমছে এ খাতের। বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে না এলে সহসাই এ খাতে গতি ফিরে আসবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ বলেন, মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ওপর আস্থা ফেরাতে সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় বিএসইসিকে পরিবর্তন আনতে হবে। স্টক মুনাফা দেওয়ার অনুমতি বাতিল করতে হবে।

এছাড়া ৪ শতাংশ কমিশনকে এমনভাবে বিন্যস্ত করতে হবে, যেন ফান্ড ম্যানেজার ভালো করলে ৪ শতাংশ পাবেন। আর দর ফেস ভ্যালুর নিচে নামলে ২ শতাংশ পাবেন।

এসএ/ এআর