আইপিও’র শেয়ার যেন ফেরোমন ফাঁদ, বিনিয়োগ করলেই ধরা

0
92

ipoপুঁজিবাজারে নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার যেন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। এসব ফাঁদে বিনিয়োগ করে বড় লোকসানে মুখে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। এক কোম্পানির শেয়ারের লোকসান পুষিয়ে নিতে ঝুঁকছেন অন্য আইপিও’র শেয়ারে। আবার সে শেয়ারে বিনিয়োগ করে আটকে যাচ্ছেন।

সম্প্রতি বাজারে আসা বেশ কয়েকটি কোম্পানির লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করেই এ চিত্র পাওয়া গেছে। তালিকাভুক্তির পর এসব কোম্পানির শেয়ার অস্বাভাবিক উচ্চ মূল্যে লেনদেন হয়েছে। আবার পরবর্তী  কিছুদিনের মধ্যে সর্বোচ্চ দর থেকে ৪০ ভাগ পর্যন্ত নিচে নেমে এসেছে শেয়ারের দাম।

অনেক পরীক্ষিত কোম্পানির শেয়ার দামের দিক থেকে তলানীতে পড়ে থাকলেও আইপিওতে আসা নতুন কোম্পানির শেয়ারে ঘটছে ভিন্ন ঘটনা। লেনদেন শুরুর পর কিছু দিন পর্যন্ত অস্বাভাবিক উচ্চ মূল্যে কেনা-বেচা হচ্ছে এসব কোম্পানির শেয়ার। বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে নানা গুজব। এতে প্রলুব্ধ হয়ে ঝুঁকে পড়ছে অসংখ্য সাধারণ বিনিয়োগকারী। তাদের হাতে শেয়ার যাওয়ার পর থেকেই কমতে শুরু করে দাম। ফাঁদে আটকে পড়ে ছটফট করে থাকে এসব বিনিয়োগকারী।

পুরো ঘটনাটি যেন ফেরোমন ফাঁদের মত। কৃষি জমিতে পোঁকা দমনে এই ফাঁদ ব্যবহার করা হয়। এতে জমির মধ্যে প্লাস্টিকের কৌটার মধ্যে পুরুষ পোকার সেক্স হরমোন রাখা হয়। তার গন্ধে দলে দলে ছুটে আসে স্ত্রী পোকা। আর এসেই ফাঁদে আটকে যায়। পুঁজিবাজারে শেয়ারের লেনদেনের প্রথমভাগের উচ্চ দর ও গুজব ওই হরমোনের মত বিনিয়োগকারীদের টেনে আনে। শেয়ার কেনার কয়েক দিনের মধ্যেই বিনিয়োগকারী বুঝতে পারেন তিনি ভুল করে ফেঁসে গেছেন।

সম্প্রতি বাজারে আসা কয়েকটি কোম্পানির লেনদেন তথ্য বিশ্লেষণ করলে প্রায় অভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়।

গত জানুয়ারি মাসে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় মোজাফফর হোসাইন স্পিনিং মিলস লিমিটেড। ২১ জানুয়ারি অভিষেক দিনে ৪০ টাকা দরে এর শেয়ার কেনা-বেচা শুরু হয়। এদিনই শেয়ারটির দাম উঠে ৪৫ টাকা ৩০ পয়সা। যা ছিল তার আয়ের ৪০ গুণেরও বেশি। মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও এত বিপজ্জনক স্তরে থাকা সত্ত্বে হুমড়ি খেয়ে পড়েন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু তখন থেকেই ধারাবাহিকভাবে কমছে শেয়ারের দাম।

বর্তমানে শেয়ারটির দাম ৩২ টাকা ৫০ পয়সা। সে হিসেবে তিন মাসে শেয়ারটির দাম কমেছে ১৮ টাকা ৭৫ পয়সা বা প্রায় ৫৯ শতাংশ। ওই সময় যারা শেয়ার কিনেছেন তাদের প্রায় সবাই লোকসানে।

প্রাথমিক গণ প্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে বাজারে আসা অ্যাপোলো ইস্পাত অভিহিত মূল্য ১০ টাকা দরে শেয়ার বিক্রি করে। ডিসেম্বরের শেষভাগে তালিকাভূক্তির পর প্রথম লেনদেন দিবসে শেয়ারটির দাম উঠে ৩৮ টাকা। পরদিন থেকে শেয়ারটির কমতে থাকে। জানুয়ারির মাঝামাঝি শেয়ারের দাম বেড়ে ৪১ টাকায় ওঠে। পরে সেখান থেকে আবার শুরু হয় দর পতন। বর্তমানে শেয়ারের দাম ২৭ টাকা ৩০ পয়সা। যারা ৪১ টাকায় শেয়ার কিনেছেন, প্রতি শেয়ারে তাদের লোকসান ১৪ টাকা বা ৩৪ শতাংশ।

৪৫ টাকায় লেনদেন শুরু হয় প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল লিমিটেডের। এক মাসের মাথায় শেয়ারের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ টাকা। কিন্তু তারপর থেকেই চলতে থাকে ধারাবাহিক পতন।বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৪৪ টাকা। ওই সময়ে শেয়ার কিনে ধরে রেখেছেন এমন বিনিয়োগকারীর লোকসান ২৪ টাকা বা ৩৫ শতাংশ।

তালিকাভুক্তির পর ফারইস্ট ফিন্যান্সের শেয়ারের দাম কমেছে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। লেনদেনের প্রথম দিনে কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম উঠে ১৬ টাকায়। দু’মাসের মধ্যে দাম বেড়ে হয় ১৮ টাকা। বর্তমানে প্রতি শেয়ারের দাম ১২ টাকা।এ হিসেবে প্রতি শেয়ারে লোকসান প্রায় ৬ টাকা বা ৩৩ শতাংশ।

গত সপ্তাহে তালিকাভুক্ত হওয়া এমারেল্ড অয়েলের শেয়ার প্রথমদিন ৫০ টাকা দরে কেনা-বেচা হয়। দু’দিনের মাথায় এটি বেড়ে হয় ৫৬ টাকা। বাজারে গুজব ছড়িয়ে পড়ে এক মাসের মধ্যে এ শেয়ারের দাম হবে ১০০ টাকা। তবে পরের দু’দিনে দর কমে আবার আগের অবস্থানে নেমে আসে।

এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক সভাপতি ও বর্তমান পরিচালক শাকিল রিজভী অর্থসূচককে বলেন,পুঁজিবাজারকে বড় করার জন্য নতুন নতুন কোম্পানিকে বাজারে তালিকাভুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। তবে অবশ্যই কোম্পানির মান যাচাই বাছাই করে বাজারে তালিকাভুক্ত করা উচিত। বিনিয়োগকারীদেরও উচিত অপরীক্ষিত কোম্পানির শেয়ারে এতটা ঝুঁকে না পড়ে  বিচার-বিশ্লেষণ করে শেয়ার কেনা।

জিইউ