সিএসআরের টাকা ব্যয়: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মানছে না জনতা ব্যাংক

0
122
janata bank csr

janata bank csrদেশের টেকসই উন্নয়ন ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির এগিয়ে নিতে অর্থ  দিয়ে সহায়তার লক্ষ্যে কোম্পানি সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) চালু করা হয় ব্যাংকিং খাতে। এ তহবিলের অর্থের অপব্যাবহার রোধে একটি গাইডলাইনও তৈরি করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক লিমিটেড এ নির্দেশনার ধার ধারছে না। নিজেদের খেয়ালখুশি মত সিএসআর তহবিলের টাকা ব্যয় করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে সিএসআরের নামে ব্যাংকটির কিছু অর্থ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে অর্থবরাদ্দের কিছু উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, যেগুলো নির্দশনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ২০১৩ সালে ব্যাংকটি হাতিরঝিল প্রকল্পে ৫ লাখ টাকা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনকে ২২ লাখ টাকা, ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ী কেনার জন্য ২ কোটি ৮১ লাখ টাকা,বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন ও অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনকে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা,উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণায় ৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা, আদমজী জুট মিল সংগ্রাম পরিষদকে ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু দরিদ্র ও পশ্চাদপদ  শিক্ষার্থীদের কোনো বৃত্তি দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।

২০১৩ সালে সিএসআর খাতে ব্যাংকটি ৩০ কোটি টাকা খরচ করলেও ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী প্রকৃত সিএসআরে খরচ হয়েছে খুবই কম। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে জনতা ব্যাংকের ব্যয়ের এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় পর্যবেক্ষণের জন্য নির্দেশ দেয় স্বয়ং গভর্নর। এর প্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় পর্যবেক্ষণে নামে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি মাসেই এ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে জনতা ব্যাংকেরই সিএসআর ব্যয়ে এমন তথ্যই দেখা গেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে জনতা ব্যাংক শুধু টাকা দিয়েই তার দায়িত্ব শেষে করেছে। টাকা দেওয়ার সময় অধিকাংশ প্রকল্পই যাচাই করা হয়নি। টাকা দেওয়ার পর প্রকল্প ঠিকভাবে চলছে কিনা তাও জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোন খোঁজ নেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ব্যাংকিং অ্যান্ড সিএসআর বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দ্বায়বদ্ধতা বা সিএসআর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২০০৮ সালে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের শুরু থেকে ব্যাংকগুলো সিএসআর কার্যক্রমে ব্যয় করতে থাকে। সিএসআর-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী দেশের টেকসই উন্নয়ন ও পশ্চাতপদ জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিয়ে আসার জন্য যে টাকা ব্যয় করা হবে তাই হলো সিএসআর ব্যয়। এর মধ্যে দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি প্রদান ও শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ, দূর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ, চিকিংসা সহায়তা প্রদান এবং পিছিয়ে পড়া কোন প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সহায়তা প্রদান ইত্যাদি। কিন্তু বেশিরভাগ ব্যাংকই মূল সিএসআর কার্যক্রমে ব্যয় করছে না বলে জানা গেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আর্থিক সহায়তা করা সিএসআর নয় বলে জানান ওই বিভাগের কর্মকর্তারা। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের সন্মাননা প্রদানের ব্যয়ও সিএসআর কার্যক্রমের অন্তর্ভূক্ত হবে না বলে জানান তারা।

গত ২০ মার্চ বৃহস্পতিবার জনতা ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড.আবুল বারকাত জানান, ২০০৯ সালে ব্যাংকটির সিএসআর ব্যয় ধরা হয়েছিল মাত্র ২৫ লাখ টাকা। আর ২০১৩ সালে ধরা হয়েছে ৩০ কোটি টাকা।২০১৪ সালে এ খাতে ব্যাংকটি ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে বলে জানান তিনি।আর এ খাতের একটি বড় অংশ মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ব্যয় করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জনতা ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় সঠিক খাতে যাচ্ছে না উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ব্যাংকিং ও সিএসআর বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র ম. মাহফুজুর রহমান অর্থসূচককে বলেন, জনতা ব্যাংক সিএসআর খাতে যে ব্যয় করেছে তার অধিকাংশই সিএসআর হিসেবে পড়বে না। সিএসআর-এর মূল লক্ষ্যই হলো দেশের পশ্চাদপদ জনগণকে এগিয়ে নিয়ে আসার জন্য ব্যয় করা।কিন্তু ব্যাংকটি যেসব বড় প্রতিষ্ঠানে এ খাতের টাকা ঢেলেছে তাতে মনে হচ্ছে তারা তাদের দায়বদ্ধতার চেয়ে ব্র্যান্ডকেই বেশি প্রচার করতে চেয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর অর্থসূচককে বলেন,সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে বা মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ব্যয় করা ব্যাংকের কাজ নয়। এর জন্য সরকার আছে। সরকারই তাদের সাহায্য করবে।তবে পিছিয়ে পড়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের সাহাযার্থে ব্যাংক ব্যয় করতে পারে বলে তিনি জানান।

এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম আমিনুর রহমানের সাথে মোবাইলে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

 এসএই