বিবির জালে বন্দী বাজার

0
68

Share at BB Netদীর্ঘ পতনের পর গত ডিসেম্বর মাসে ছন্দ ফিরে এসেছিল দেশের পুঁজিবাজারে। জানুয়ারির মাঝামাঝি ছিল বাজারের গতিশীলতা। তারপরই শুরু হয় ছন্দ পতন। আর এ পতনের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের (বিবি) অতিমাত্রায় হস্তক্ষেপকে দায়ী করছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা কিছু নির্দেশনার প্রভাবেই টানা পতন শুরু হয়েছে। অস্থির হয়ে উঠেছে বাজার। উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুঁজিবাজার বিশ্লেষক বলেন, ২০১০ সালের অঘটনের পেছনেও ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের অদূরদর্শী কিছু সিদ্ধান্ত ও উদাসীনতা। সময়মত লাগাম টেনে না ধরায় ব্যাংকগুলো অতিমাত্রার বিনিয়োগে জড়িয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের উদাসীনতায় অনেক শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য নেওয়া ঋণ প্রকৃত খাতে বিনিয়োগ করে পুঁজিবাজারে নিয়ে এসেছিল। এসব বিষয় পুঁজবাজারের অস্বাভাবিক তেজী হয়ে উঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবার শেষ দিকে এসে হঠাৎ কঠোর হয়ে ওঠা ও বিনিয়োগ নির্ধারিত সীমার নিচে নামিয়ে আনার নির্দেশনার প্রভাবে বাজারে বিক্রির চাপ বেড়ে যায়। এতে তাসের ঘরের মত হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ে তা। নামে স্মরণকালের ধস।

তিনি বলেন, ধসের দীর্ঘ রেশ কাটিয়ে বাজার যখন আবার স্বাভাবিক অবস্থার দিকে যাচ্ছিল, তখনই আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ। আবারও একতরফা কিছু নির্দেশনা। এসব নির্দেশনার কারণে বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তার প্রভাবে জানুয়ারির শেষভাগে দর পতন শুরু হয়, যা এখনও চলছে।

তার মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকই যেন হয়ে উঠেছে পুঁজিবাজারের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক। বাজার যেন আটকে আছে বাংলাদেশ ব্যাংকের জালে।

উল্লেখ, গত বছরের নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্রড ইন্ডেক্স ডিএসইএক্স ৩ হাজার ৭০০ এর কাছাকাছি অবস্থান করছিল। দৈনিক লেনদেন দুইশ থেকে আড়াইশ কোটি টাকার ঘরে ঘুরপাক খাচ্ছিল। ওই মাসের শেষ ভাগে সূচক ও লেনদেন বাড়তে থাকে। জানুয়ারির শেষভাগে ডিএসইএক্স সূচক উঠে আসে ৪ হাজার ৭০০ পয়েন্টের কাছাকাছি। আর দৈনিক লেনদেন বেড়ে হয় প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। সবাই যখন আশা করছিল, লেনদেন সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে লেনদেন হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে তখনই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত আসে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা। সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কোম্পানিকে (যারা মার্চেন্ট ব্যাংকিং ও ব্রোকারেজ সেবা দিয়ে থাকে) নির্দেশ দেওয়া হয়, তারা প্রতিদিন কি পরিমাণ শেয়ার কিনছে, কোন কোম্পানির শেয়ার কেনা হচ্ছে, কি দামে কেনা হচ্ছে-এসব তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।

এর রেশ শেষ হতে না হতেই সাবসিডিয়ারি কোম্পানির বিনিয়োগের নতুন সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। বলা হয়, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ সীমার অতিরিক্ত হলে ২০১৬ সালের মধ্যে তা নিচে নামিয়ে আনতে হবে।

চলতি মাসের মাঝামাঝি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য প্রতিদিন বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানোর উদ্দেশ্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে। এবার বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়ায়।

পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে গত সপ্তাহে ব্যাংকগুলোর কাছে পাঠানো বিশেষ চিঠিকে কেন্দ্র করে। এ চিঠিতে ব্যাংকগুলোকে বাড়তি বিনিয়োগ কিভাবে সমন্বয় করা হবে সে বিষয়ে পরিকল্পনা জমা দিতে বলা হয়।

২০১০ সালের ধসের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশ ছিল, পুঁজিবাজারকে প্রভাবিত করতে পারে এমন যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিএসইসির সঙ্গে পরামর্শ করার। কিন্তু এ নির্দেশনাকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজের খেয়ালখুশিমত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি যে নতুন করে আরও কোনো নির্দেশনা দেবে না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে না পারায় ভয়ও কমছে না বিনিয়োগকারীদের। আর এ কারণেই ব্যাংকটির হাতে পুঁজিবাজারের ভাল-মন্দ আটকে আছে বলে মনে করছেন তারা।