সমুদ্র যা কেড়ে নেয় তা আবার ফিরিয়ে দেয়

0
121
Sea

Seaকলেজ পড়ুয়া ছেলে, তখন অনেক কিছুই বোঝতাম না। মুখ ফসকে বেরিযে যাওয়া অসংলগ্ন কোনো কথা কাছের বন্ধুদেরও যে কষ্ট দিতে পারে তা নিয়ে ভেবে দেখার পরিসরটা বরাবরই সীমাবদ্ধ ছিল আমার।

এর মধ্যে একদিন শুনলাম মার্কিন টুইন টাওয়ার উড়িয়ে দিয়েছে ওসামা বিন লাদেন। সেই ভয়ানক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশিসহ হাজারও মানুষ মারা গেছে। বিন লাদেনের এ কর্মকাণ্ডে কষ্ট পাওয়ার পরিবর্তে বিষয়টা আমার কাছে মজার বলেই ঠেকেছিল। মার্কিনীদের শিক্ষা দেওযার কি আশ্চর্য ও ভয়ানক পরিকল্পনাই বিন লাদেন করেছিল। তখনও আমার বোধে আসেনি মৃত্যু কী? জানতাম না কাছের মানুষকে হারানোর ব্যাথা বিষ মাখা তীরের মতো কতটা তীব্র হয়ে বুকে বিধতে পারে? বুঝতাম না কোনো কোনো মানুষের চলে যাওয়া মানে আর ফিরে না আসা!

যথারীতি সেদিনও কলেজে গিয়েছিলাম। বন্ধুদের মুখে শুনলাম আমাদের সহপাঠী লীনার বাবাও নাকি তখন টুইন টাওয়ারে কাজ করতেন। দুর্ঘটনার দিন সকাল থেকেই তার সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না তার পরিবারের সদস্যরা। আজ লীনা কলেজে এসেছে ঠিকই কিন্তু মনটা  তার ভীষণ ভারাক্রান্ত। বন্ধুরা এক এক করে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে আসছে। কিন্তু আমার মাঝে এসব নিয়ে কোনো ভাবান্তরই ছিল না।

উদ্ভিদ বিজ্ঞান ভবনের সিঁড়িতে গাল ফুলিয়ে বসে থাকা লীনার কাছে গিয়ে বললাম- কিরে লিন্টুস, টুইন টাওয়ারে নাকি আঙ্কেলও ছিলেন? উনি কি মারা গেছেন? আমার মুখ থেকে কথাটা বেরোনোর সাথে সাথে লীনার চোখ বেয়ে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়ল। তখন না বুঝেই উল্টো লীনার ওপর রাগ করে ওখান থেকে চলে গিয়েছিলাম আমি। একটিবারও ভেবে দেখিনি আমার একটা কথা কতটা কষ্ট দিয়েছিল তাকে। আপনজন হারানোর বেদনা কী? তা যারা হারায় তারাই বোঝে।

এ ধরনের বিয়োগান্তক ঘটনা পৃথিবীতে অহরহ ঘটছে, তবে এর কোনোটা বড় আবার কোনোটা ছোট আকারের।

এই তো- মাত্র দু’সপ্তাহ আগে চীনের উদ্দেশে রওনা দেওয়া মালয়েশিয়ান একটি বিমান নিখোঁজ হয়। ৮ মার্চ শনিবার স্থানীয় সময় ২টা ৪০ মিনিটে কুয়ালালামপুর থেকে চীনের উদ্দেশে রওনা করে বিমানটি। ওইদিন ১০টা ৩০ মিনিটে বিমানটি বেইজিং-এ পৌঁছানোর কথা থাকলেও পৌঁছায়নি। ভিয়েতনামী সরকারের ওয়েবসাইটে জানানো হয়, দক্ষিণ ভিয়েতনামের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় বিমানটির রাডার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

৫ জন শিশুসহ ২২৭ জন যাত্রী, এবং ১২ জন ক্রু ছিল। কেমন আছে তারা? কেমন করে দিন কাঁটছে তাদের স্বজনদের।

গণমাধ্যমের বরাতে জানতে পারলাম, দুই সপ্তাহ ধরে নিখোঁজের পর অবশেষে সন্ধান মিলেছে মালয়েশিয়ান বিমানের। ১২ দিন ধরে যখন ২৬ টিরও বেশি দেশ এই বিমানকে খোঁজাখুঁজির জন্য অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছিল ঠিক তখনই বিমানটির ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার কথা জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়ান উদ্ধারকর্মীরা।

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর বিভিন্ন দেশের উদ্ধারকর্মীরা হাল একপ্রকার ছেড়েই দিতে বসেছিল। অনেকেই অনুমান করছিল বিমানটি হয়তো ছিনতাই হয়েছে। কিন্ত শেষ পর্যন্ত  অস্ট্রেলিয়ান অনুসন্ধানকারীরা জানিয়েছে, দক্ষিণ ভারত সাগরের কাছাকাছি নিখোঁজ বিমানের ধ্বংসাবশেষের দুইটি ভাসমান বস্তু খুঁজে পেয়েছে তারা।  তারা বলছে, এটি কোনো ছিনতাই ঘটনার সাথে জড়িত নয়। রাডার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এটি ভারত সাগরেই বিধ্বস্ত হয়েছে।

এর দু’দিন পর চীন দাবি করল তারাও ওই বিমানের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেয়েছে। এরপর খবরের উপাদান হওয়ার জন্য অমুক তমুক সবাই এ ধরনের দাবি করবে এটাই ত স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলের মানুষগুলো নাকি সমুদ্রে লাশ ভেসে যেতে দেখেছে। অনেকে আবার বিমান হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাটিকে প্যারানরমাল একটিভিটিজ বলে দাবিও করছে। এসব গাল গপ্পের নায়কদের কথা শুনলে গা জ্বলে আমার।

ঐ হারিয়ে যাওয়া বিমানটিতে থাকা কারও সন্ধান এখনও মেলেনি। তাদের স্বজনদেনর আহাজারিও থামেনি। এত বড় একটি বিমান কোথায় হারিয়ে গেল?

সন্ধান যদি দেওয়ায় না যায় তবে কেন এত গাল গপ্প। এসব গাল গপ্পগুলো হারানো মানুষগুলোর স্বজনদের বুকে বিষ মাখা তীরের মতোই বিঁধে।

সমুদ্রপাড়ের এক বন্ধুর কথা এখনও কানে ভাসে আমার। সে বলেছিল, এই সাগর যা কেড়ে নেয় তা একদিন ফিরিয়েও দেয়।

হারিয়ে যাওয়া বিমানে থাকা সব মানুষগুলো নিরাপদে ফেরত আসুক এ কামনা তাদের স্বজনদের।  যদি সমুদ্রের মাঝে তারা বিলীন হয়ে থাকে তবে সমুদ্র একদিন তাদের ফিরিয়ে দেবেই।  সাগরপাড়ে পড়ে থাকা অসংখ্য ঝিনুক আর ফসিল দেখে আমি বন্ধুর কথা বিশ্বাস করেছিলাম। সে বিশ্বাস বুকে নিয়ে বলছি, এই সমুদ্র যা কেড়ে নেয় তা একদিন ফিরিয়েও দেয়। হারানো মানুষগুলোর জন্য অনেক কষ্টে কাটছে তাদের স্বজনদের দিন।

লীনার বাবা টুইন টাওয়ারের সে দুর্ঘটনায় মারা যায়নি। সেদিন তিনি অসুস্থ থাকায় সেখানকার  হেলথ ক্লিনিকে ভর্তি ছিলেন। তাই অফিসে যাননি এবং ফোনও রিসিভ করেননি।। সেদিনের অসুস্থতা বড় বাঁচা বাঁচিয়ে দিয়েছিল তাকে। কিন্তু লীনার মনে দেওয়া দুঃখের বোঝাটা এখনও যে আমার কাঁধে।