‘অর্থনীতির স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত পুঁজিবাজারের পাশে দাঁড়ানো’

0
123
tanjil chowdhury

Tanjil_Chowদেশের পুঁজিবাজার ক্রান্তিকাল পার করছে। বাজার অনেকটাই গতিহীন। কিন্তু দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এতে প্রাণ সঞ্চার ও বাজারের গভীরতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। কারণ শিল্পায়নের অর্থ যোগানে পুঁজিবাজারই সবচেয়ে সাশ্রয়ী উৎস। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত এ বাজারের পাশে দাঁড়ানো।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স আ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি ও ইস্ট কোস্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানজিল চৌধুরী এ কথা বলেছেন। অর্থসূচককে দেওয়া একান্ত সাক্ষাতকারে পুঁজিবাজারের বিদ্যমান অবস্থা, সমস্যা ও সম্ভাবনার নানা দিক উঠে আসে। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন অর্থসূচক সম্পাদক জিয়াউর রহমান।

তিনি বলেন, নানা কারণে পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট চলছে। বাজারে লেনেদন অনেক কমে গেছে। সূচকও কমছে। একে শুধু সেকেন্ডারি মার্কেটের সমস্যা মনে করলে খুব বেশি যৌক্তিক হবে না। সেকেন্ডারি মার্কেট দীর্ঘদিন খারাপ থাকলে, প্রাইমারি মার্কেট তথা আইপিও’র ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কিন্তু শিল্প-বাণিজ্য ভাল প্রবৃদ্ধি চাইলে প্রাইমারি মার্কেটকে প্রাণবন্ত রাখতেই হবে। আর একই কারণে মনোযোগ দিতে হবে সেকেন্ডারি মার্কেটের দিকেও।

পুঁজিবাজারের ভাল-মন্দের সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের কোনো সম্পর্ক আছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তানজিল চৌধুরী বলেন, অবশ্যই আছে। এ সম্পর্ক নানা মাত্রিক। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি বাণিজ্যক ব্যাংক কোনো না কোনোভাবে পুঁজিবাজারে যুক্ত। অনেক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বা সাবসিডিয়ারি মার্চেন্ট ব্যাংকিং করছে। আবার কয়েকটি ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য (বর্তমানে ট্রেকহোল্ডার) হিসেবে শেয়ার কেনা-বেচা করে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের মুনাফা ও লোকসান মূল ব্যাংকের ব্যালেন্সশীটে অন্তর্ভূক্ত হয়।

এছাড়া ব্যাংকের ঝুঁকি কমানোর জন্যই পুঁজিবাজারের গতিশীলতা দরকার। ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের অর্থে ব্যবসা করে। তাই দীর্ঘ মেয়াদী অর্থায়ন ব্যাংকের জন্য খুব বেশি উপযোগী নয়। তাছাড়া বড় ধরনের প্রকল্পে এককভাবে অর্থায়ন করার সামর্থ এবং সুযোগও কম। তাই পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করার প্রবণতা বাড়লে ব্যাংকের উপর এ ধরণের দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের চাপ কমবে। এটি ব্যাংকের ঝুঁকিও কমিয়ে দেবে।

বিএমবিএ সভাপতি বলেন, ২০১০ সালে পুঁজিবাজারের অস্বাভাবিক উত্থান ও বড় পতনের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু নির্দেশনা ভূমিকা রেখেছে, যেগুলো সময়োপযোগী ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত এসব ইস্যুতে আরও যৌক্তিক ও নমনীয় আচরণ করা। দাতা সংস্থার পরামর্শ অন্ধভাবে অনুসরণ না করে দেশীয় বাস্তবতার আলোকে তা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনো কোনো বিধির কার্যকারিতা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা যেতেই পারে।

সাশ্রয়ী উৎস হওয়া সত্ত্বেও দেশের অনেক বড় প্রতিষ্ঠানই পুঁজিবাজারের বাইরে রয়ে গেছে। এ বিষয়ে তার মূল্যায়ন  জানতে চাইলে তানজিল চৌধুরী বলেন, এটা ঠিক, দেশের বেশিরভাগ বড় ও ভাল কোম্পানি এখনো পুঁজিবাজারের বাইরে। এসব কোম্পানিকে বাইরে রেখে পুঁজিবাজারের গভীরতা তেমন বাড়ানো সম্ভব নয়। তাই কোম্পানিগুলোকে বাজারে নিয়ে আসতে হবে। বাজারে ভাল ও বড় কোম্পানির সংখ্যা যত বাড়বে ততই শেয়ার নিয়ে কারসাজির মাত্রা কমে আসবে। শেয়ার দরের অস্বাভাভাবিক উঠা-নামার প্রবণতাও কমবে। অন্যদিকে এ বাজার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধিতে আরও বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে।

প্রাথমিক গণ প্রস্তাব (আইপিও) সম্পর্কে তিনি বলেন, ভালো কোম্পানিকে আইপিওতে নিয়ে আসতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অতিরক্ষণশীল অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। কোম্পানির সম্পদ, মুনাফা, সম্ভাবনা ইত্যাদির নিরিখে শেয়ারের যৌক্তিক প্রিমিয়াম দিতে হবে। বিনিয়োগকারী ও ইস্যুয়ার (কোম্পানির উদ্যোক্তা)-উভয়ের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে হবে।

হিসাব কারসাজি করে বাড়তি মুনাফা দেখিয়ে অনেক দূর্বল কোম্পানিও আইপিওতে প্রিমিয়াম নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন অবস্থায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) রক্ষণশীল না হলে বিনিয়োগকারীরা প্রতারিত হতে পারেন। এ বিষয়ে বিএমবিএ সভাপতি বলেন, মূল সমস্যাই হিসাব নিয়ে। প্রিমিয়াম ছাড়া আইপিও’র অনুমোদন পেলেই যে বিনিয়োগকারীর স্বার্থ সংরক্ষিত হবে সে নিশ্চয়তা নেই। বরং এখানেই শংকা ও সন্দেহ বেশি। দূর্বল ও লোকসানী কোম্পানির ক্ষেত্রে যে কোনো মূল্যে বাজারে শেয়ার ছাড়তে পারলেই লাভ।

তাই হিসাব কারসাজি কতটা কমিয়ে আনা যায় সে চেষ্টা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বুক বিল্ডিং পদ্ধতির মত ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতেও নীরিক্ষক নিয়োগে শর্ত আরোপ করা যেতে পারে। অনুমোদিত কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন দিয়েই কেবল আইপিও’র আবেদন করতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা আরোপ করা যেতে পারে।

উল্লেখ,বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক কোনো অডিট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত নীরিক্ষা প্রতিষ্ঠানই কেবল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাব নিরীক্ষা করতে পারে।

এক সঙ্গে একাধিক কোম্পানির আইপিও এলে সেকেন্ডারি মার্কেটে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টির সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেন বিএমবিএ সভাপতি। তিনি বলেন, যারা প্রাইমারি মার্কেটে বিনিয়োগ বা আইপিও’র শেয়ারের জন্য আবেদন করেন, তাদের বড় অংশই সেকেন্ডারি মার্কেটের সঙ্গে যুক্ত নন। তাই এর তেমন প্রভাব পড়ার কথা না। যতটুকু পড়ে তা মনস্তাত্ত্বিক কারণে পড়ে।

তিনি আইপিওতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও বড় ব্যাক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য আইপিও’তে কোটা রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এর পক্ষে তার যুক্তি-এ ধরনের কোটা থাকলে বড় আকারের আইপিও এলেও আন্ডার সাবসক্রাইবড (শেয়ার অবিক্রিত থাকা) হওয়ার আশংকা থাকবে না। অন্যদিকে এ ধরণের বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ধারণের ক্ষমতা বেশি। এক সঙ্গে তাই একাধিক আইপিও এলেও বাজারে শেয়ার সবরাহের চাপ পড়বে না,  মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে।