কর জালে আটকে আছে পুঁজিবাজার

0
69
Share Taka
Share Taka

Share_Taka_2বাংলায় একটি প্রবাদ আছে ‘লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়’। পুঁজিবাজারের ব্রোকারেজ হাউস ও বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনাই ঘটছে। নিজের অর্থ ও  শ্রম দিয়ে পাওয়া মুনাফার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ চলে যাচ্ছে কর বাবদ। কার্যত কর জালে আটকে আছেন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন,করের যে স্তর রয়েছে,তা সংশোধন করা দরকার। ব্যবসাবান্ধব কর স্তর করা জরুরী বলেও মনে করেন তারা। এছাড়া কর স্তরের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্যও রয়েছে। এ বৈষম্য দূর করারও দাবী জানান তারা।

বর্তমানে পুঁজিবাজার দ্বৈত করের শিকার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারচেয়েও বেশি। বিধি অনুসারে, তালিকাভুক্ত প্রত্যেক কোম্পানিকে তার মুনাফার উপর কর দিতে হয়। আবার ওই মুনাফার ভিত্তিতে বিতরণ করা লভ্যাংশ থেকে কেটে রাখা হয় ১০ শতাংশ উৎসে কর। অর্থাৎ একই আয়ের উপর কর দিতে হয় দুই বার। যেসব বিনিয়োগকারীর আয় করযোগ্য তারা কেটে রাখা কর তার সামগ্রিক করের সঙ্গে সমন্বয় করার সুযোগ পান। কিন্তু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যাদের আয় করযোগ্য নয়, তারা কেটে রাখা কর সমন্বয়ের সুযোগ পান না। আবার তা ফেরতও পান না।

অন্যদিকে স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য প্রতিষ্ঠানও (বর্তমানে ট্রেকহোল্ডার) কর বৈষম্যের শিকার। জানা গেছে,আগে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সদস্য প্রতিষ্ঠান ব্রোকারেজ হাউসগুলো আগে লিমিটেড কোম্পানি ছিল না। কিন্তু ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এ ডিরেকটিভসের মাধ্যমে লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরে বাধ্য করে। কোনো কোম্পানি নিজ ইচ্ছায় লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে বাধ্য করা হয়েছে। ফলে কোনও কোনও ক্ষেত্রে ডাবল,ট্রিপল ট্যাক্স দিতে হচ্ছে।

আগে ডিএসইর সদস্য প্রতিষ্ঠান ব্রোকারেজ হাউসগুলো মুনাফার ২৫ শতাংশ কর দিয়েই মুনাফার বাকি অর্থ খরচের অধিকার পেতেন। অর্থাৎ কোনও ব্রোকারেজ হাউস যদি এক কোটি টাকা মুনাফা করে,তাহলে ২৫ শতাংশ কর পরিশোধ করে ৭৫ লাখ টাকা খরচ করতে পারতেন। কিন্তু ব্রোকারেজ হাউসকে লিমিটেড কোম্পানি করায় তাকে আগের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি কর পরিশোধ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ এক কোটি টাকা মুনাফা থেকে প্রথমে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ কর পরিশোধ করতে হচ্ছে। এরপর সে ওই টাকা খরচ করতে পারে না। খরচের অধিকার পেতে লভ্যাংশ ঘোষণা করতে হচ্ছে। আবার ঘোষিত লভ্যাংশের ওপর ১০ শতাংশ সোর্স ট্যাক্স কেটে রাখা হয়। এরপর ১৫ শতাংশ ফাইনাল ট্যাক্স দিতে হয়। এতে লিমিটেড কোম্পানির মোট ৪৬ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকার স্বত্ত্বাধিকারী হয়। এখানেই বৈষম্য থাকছে ২৮ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ এক্ষেত্রে লিমিটেড কোম্পানিকে ডাবল ট্যাক্স দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ তাকে ৫৩ দশমিক ১২৫ কর পরিশোধ করতে হয়। অথচ লিমিটেড কোম্পানি করার আগে এসব ব্রোকারেজ হাউস মাত্র ২৫ শতাংশ কর দিত। কিন্ত লিমিটেড করায় তাকে দ্বিগুণের বেশি কর দিতে হচ্ছে।

অন্যদিকে ব্যাংক ব্রেকারেজ হাউসের ক্ষেত্রে এ বৈষম্য আরও বেশি। ব্যাংক ব্রোকারেজ হাউসকে ট্রিপল ট্যাক্স দিতে হচ্ছে। কেননা,ব্যাংক সরাসরি ব্রোকারেজ হাউস পরিচালনা করতে পারে না। তাকে সাবসিডিয়ারি কোম্পানি করতে হয়। এখানেও বাধ্যবাধকা আরোপ করা হয়েছে। ফলে তৃতীয় ধাপে কর দিতে হয়। ফলে ব্যাংক ব্রোকারেজ হাউসকে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ কর পরিশোধ করতে হচ্ছে।

কোনও ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি যদি এক কোটি টাকার মুনাফা করে প্রথমে তাকে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে কর পরিশোধ করতে হয়। এরপর ব্যাংক ২০ শতাংশ হারে কর দিয়ে খরচের অধিকার পায়। কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে যেতে আরও ১০ শতাংশ সোর্স ট্যাক্স এবং ১৫ শতাংশ চুড়ান্ত কর পরিশোধ করতে হয়। সেক্ষেত্রে ব্যক্তি পর্যায়ে মোট খরচের অধিকার পায় ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরাও জানিয়েছেন,এসব কারণেই ব্যবসায়ীরা কর দিতে চায় না।

অন্যদিকে কোম্পানির গেইনের ওপর ট্যাক্স নেই। কিন্তু লভ্যাংশের ওপর ১০ শতাংশ সোর্স ট্যাক্স এবং ১৫ শতাংশ চুড়ান্ত কর দিতে হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগকারী শেয়ার ধরে না রেখে বিক্রি করে গেইন করছেন। এতে পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব বৈষম্য দূরের আহ্বান জানান পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি আহমেদ রশিদ লালী বলেন, এ বিষয়ে আমরা অর্থমন্ত্রী এবং এনবিআরের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তারা কমানোর আশ্বাসও দিয়েছেন। করদাতাদের জন্য এটি বিষফোঁড়া।

আগামি অর্থবছরের বাজেটে কর্পোরেট ট্যাক্স কমানোর আশ্বাস দিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন। তিনি জানান,বাংলাদেশের কর্পোরেট ট্যাক্সের হার পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ। এটি কমিয়ে ব্যক্তি করের সমান করা হবে। তবে তা করতে ৫ বছর সময় লাগবে। অর্থাৎ আগামি ৫ বছরের মধ্যে কর্পোরেট ট্যাক্স ব্যক্তি পর্যায়ে নামিয়ে আন হবে। যা আগামি বাজেটে তার প্রতিফলন থাকবে।

অর্থসূচক/জিইউ