দূষণ ও দখলে মৃতপ্রায় বুড়িগঙ্গা

0
154
burigongga nodi

burigongga nodiপানি দিবস আসে, পানি দিবস যায় কিন্তু দেশে দূষণমুক্ত বিশুদ্ধ পানি মেলে না। পানি দিবসকে ঘিরে অনেক মিছিল, মিটিং, মানববন্ধন, র‌্যালির জমকালো উপস্থাপনা মিডিয়ায় দেখা যায়। অনেক লেখালেখি হয় কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। দূষণের ফলে এখনই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

প্রতিটি সরকারই আশ্বাস দিয়েছে অবৈধ দখলমুক্ত এবং নদীর দূষণ দূর করে পরিবেশের উন্নয়ন ঘটানো হবে। স্থানীয় লোকজনের প্রতিবাদ, পরিবেশবাদীদের আহ্বান এবং প্রকৃতির কান্না কি সরকার শুনছে? নাকি ব্যবসায়, দস্যুতা আর রাজনীতির ত্রিভুজ ক্ষমতার কাছে জনস্বার্থ ক্রমাগত মার খেয়ে যাবে? প্রশ্ন একটাই। নদীর অজাতশত্রুরা কি সরকারের ক্ষমতার ঊর্ধ্বে? আদালতের কাজ আদালত করেছেন, দখলদার করছেন দখলের কাজ। প্রশ্ন হচ্ছে, আইনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সরকার কার হয়ে কাজ করছে?

সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অবহেলা আর গাফিলতির কারণে বুড়িগঙ্গা নদীতে দূষণ ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। ম্যাগাসিটি রাজধানী ঢাকার দেড় কোটি মানুষের মলমূত্রসহ বিভিন্ন কলকারখানা এবং গৃহস্থালির ১০ হাজার ঘনমিটারের বেশি বর্জ্য প্রতিদিন বুড়িগঙ্গায় নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। যার ৪০ শতাংশই অপরিশোধিত। ঢাকা সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসার ৪২টি নর্দমা দিয়ে বুড়িগঙ্গায় বর্জ্য যাচ্ছে।

স্থানীয়রা বলেন, সরকারের কিছু মদদপুষ্ট লোক বুড়িগঙ্গা দখল করে আছে। সরকার টাস্কফোর্স গঠন করেও বুড়িগঙ্গা দখলমুক্ত করতে পারছে না। এটা পুরোপুরি সরকারের ব্যর্থতা। তাই সরকারের কাছে আমাদের প্রাণের দাবি অবিলম্বে বুড়িগঙ্গা নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে- বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি দূষণের অন্যতম কারণ হচ্ছে শিল্প প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য। হাজারীবাগের প্রায় ১৮৫টি চামড়া শিল্প কারখানায় প্রতিদিন গড়ে ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্য নির্গত করছে। এই বর্জ্য মূলত বুড়িগঙ্গা নদীর পানি দূষিত করছে।

উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, নদ-নদী ও অন্যান্য দূষণ বন্ধে শিল্প প্রতিষ্ঠানে ইটিপি বসাতে হবে। আবার ঢাকা মহানগরের হাজারীবাগ থেকে চামড়া পাকা করার কারখানাগুলো সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন উচ্চ আদালত। এসব কার্যক্রমে কোনো গতি নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে বুড়িগঙ্গা নদীতে আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে পুরান ঢাকার আশপাশে বুড়িগঙ্গা তীরে পুলিশ পাহারা বসানোর কথা বলেছেন আদালত। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা করা হচ্ছে না।

বুড়িগঙ্গা নদীতে দূষণ ক্রমেই বেড়ে চলছে। বর্তমানে দূষণের মাত্রা শূন্য দশমিক ১২ থেকে শূন্য দশমিক ৪০ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। সদরঘাটের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) পরিমাণ শূন্য দশমিক ৪০ পাওয়া গেছে। ধোলাইখালের মুখে ডিওর পরিমাণ আরও খারাপ, শূন্য দশমিক ৩৮ মিলিগ্রাম।পাগলার শোধনাগারের পরিশোধিত পানি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ডিওর মাত্রা ২ দশমিক ১৬ মিলিগ্রাম। পানগাঁওয়ে শূন্য দশমিক ২৩, এর কাছে ইয়ার্ডে ডিওর পরিমাণ শূন্য দশমিক ১২।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, মৎস্য ও জলজ প্রাণীর জীবনধারণের জন্য পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রাম বা এর ওপরে থাকা প্রয়োজন। কিন্তু তা বর্তমানে নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বুড়িগঙ্গায় দূষণের মাত্রা এত বেশি থাকার কারণের প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই। এটি একটি মৃত নদী। আগে দক্ষিণ পাড়ের পানির মান ভালো থাকলেও এখনকার চিত্র এটাই প্রমাণ করে যে বুড়িগঙ্গার দূষণ আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

বুড়িগঙ্গা থেকে পানি সংগ্রহ করে তা আর সুপেয় করার সুযোগ পাচ্ছে না ঢাকা ওয়াসা। সেই সুযোগ সৃষ্টিতে এবার যমুনা নদী থেকে পানি এনে বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পানি দূষণমুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ঢাকার নৌপথ সচল হবে। তবে খরস্রোতা ও টলটলে পানির বুড়িগঙ্গা দেখতে আরও বছর তিনেক অপেক্ষা করতে হবে নগরবাসীকে।

এম আই/কেএফ