নদী দখল-দূষণের স্বরূপ ও পরিত্রাণের উপায়

0
99
riber

riber২২ মার্চ বিশ্ব পানি দিবস। ২০১৪ সালে এ দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘পানি এবং জ্বালানী’। ১৯৯৩ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হচ্ছে। জ্বালানী খাতে বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রচুর পরিমাণ পানি ব্যবহার হয়ে থাকে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি সচেনতা সৃষ্টির মাধ্যমে জ্বালানী খাতে পানির ব্যবহার করা প্রয়োজন।

নদী হচ্ছে আমাদের দেশের প্রাণ। পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষা এবং কৃষি উৎপাদনের জন্য নদী ছাড়া আমাদের আর কোনো গতি নেই। কিন্তু সেই নদীই এখন বিষাক্ত নিঃশ্বাস ফেলছে। আর পরিবেশ হয়ে পড়ছে মারাত্মক হুমকির মুখে। মানুষের অত্যাচারে নদীগুলো এখন মৃতপ্রায়। তিস্তার পানি প্রবাহ ব্যাপকহারে কমে গেছে। পদ্মা, তিস্তা এখন মৃতপ্রায়। মেঘনার কোনো কোনো অংশের পানি কালো রং ধরেছে, যুমনায় পড়েছে চর। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতক্ষ্যা দখল ও দূষণের ভাওে বিষাক্ত নিঃশ্বাস ফেলছে।

সামাজিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নদী রক্ষার বিষয়টি মহামান্য হাইকোর্টেও পর্যালোচনা করা হয়। নদী সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের দীর্ঘ শুনানি গ্রহণ করে মহামান্য হাইকোট ২০০৯ সনের ২৫ জুন ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদীর সীমানা সিএস রেকর্ড অনুযায়ী আগামি ৩০ নভেম্বরের মধ্যে নির্ধারণের আদেশ প্রদান করেন। পাশাপাশি তীরবর্তী অবৈধ স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা উচ্ছেদসহ ১২ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আগামি বছরের ৩০ মের মধ্যে নদীর সীমানা নির্ধারণী পাকা খুঁটি (পিলার) স্থাপন করতে হবে। ২০১১ সালের ৩১ মের মধ্যে চারটি নদীর তীরে পায়ে হাঁটার পথ নির্মাণ করতে হবে। ভূমি মন্ত্রণালয় নদীগুলোর তীরবর্তী ৫০ গজ জায়গা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করবে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড চারটি নদীতে প্রয়োজনীয় খননকাজ করবে।

মহামান্য সুপ্রীমকোর্টের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর ব্যবন্থা গ্রহণ না করায় মহামান্য হাইকোট ২০১৪ সনের ২৩ জানুয়ারি কয়েকটি নির্দেশনা প্রদান করেন। ৪৮ ঘন্টার মধ্যে শ্যামপুর এলাকায় নদীতে শিল্প বর্জ্য ফেলা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে ১০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে হবে। শিল্প বর্জ্যরে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব বিআইডব্লিউটিএ, পরিবেশ ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করবেন। নদীর পানি যেন দূষিত না হয় সে বিষয়ে পুলিশ দিয়ে নজরদারি করতে শ্যামপুর ও ডেমরা থানার ওসিকে ব্যবন্থা নিতে হবে। শ্যামপুর এলাকায় জেলা প্রশাসককে প্রতিমাসে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে।

বিআইডব্লিউটিএর হিসাব মতে ঢাকা ও টংগী নদী বন্দর সীমায় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদীর তীরে দুই শতের মত অবৈধ স্থাপনা আছে। কিন্তু পর্যবেক্ষণে ঢাকার চারদিকের নদীতে এখনো বর্তমানে অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। কামরাঙ্গী চর হতে সিকদার মেডিকেল পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা নদীর আদি খাড়িটি বন্দর সীমার অন্তর্ভুক্ত নয় বলে সেখানে অবৈধ স্থাপনাগুলো বিআইডব্লিউটিএর হিসাব নেই। বাস্তবে ঐ খাড়ি পথটি প্রায় সম্পূর্ণ অবৈধ দখলে চলে গেছে। আর বিআইডব্লিউটিএ কেবল গেজেটে উল্লেখিত তীরভূমি ধরে হিসাব করেছে। এর ফলে নদীর প্লাবনভূমিতে নির্মিত ও দখলকৃত কয়েক হাজার স্থাপনা অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

ঢাকা মহানগরীর জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর  গুরুত্ব অপরিসীম। এসব নদীর পানি দূষণ একটি মারাত্বক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন নেই বললেই চলে। ফলে মৎস্য ও জলজ প্রাণীর বিলুপ্তিসহ বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী আজ মৃতপ্রায় । ঢাকা  মহানগরী, টঙ্গী, গাজীপুর, সাভার, নরসিংদী, নারায়নগঞ্জ, কেরানীগঞ্জের পয়ঃবর্জ্য, গৃহস্থালী বর্জ্য ও শিল্প কারখানার বর্জ্য, নৌযানের বর্জ্য এবং হাজারীবাগ এলাকায় অবস্থিত ট্যানারীসমূহের বর্জ্য ঢাকার চারপাশের নদীগুলো দূষণের অন্যতম কারণ।

ঢাকা ওয়াসার হিসাব মতে ঢাকা মহানগরীতে পয়ঃবর্জ্যরে পরিমাণ ১৩ লক্ষ ঘনমিটার। যার মধ্যে ১ লক্ষ ২০ হাজার ঘনমিটার পরিশোধন ক্ষমতা সম্পন্ন পাগলা পয়ঃবর্জ্য পরিশোনাগারের মাধ্যমে মাত্র ৫০ হাজার ঘনমিটার পরিশোধন করা হচ্ছে। বাকি ১২ লক্ষ ৫০ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত অবস্থায় সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে নদীর পানির গুণগত মানের অবনতি; মাছ ও জলজ প্রাণীর ক্ষতি; শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি ও গৃহস্থালী কাজে ব্যবহার অনুপযোগী; জীবানুজনিত দূষণ; মানুষের স্বাস্থ্যের হুমকীর কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিশোধনের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন – পবা ২০১৩ সালের জুন মাস থেকে নিয়মিতভাবে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা নদীর বিভিন্ন স্থানের উঙ, ঢ়ঐ ও ঊঈ-র পরিমাণ পরীক্ষা করে আসছে। পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা নদীর বিভিন্ন স্থানের উঙ ও ঢ়ঐ-এর ফলাফল

নদীর পানি বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের উপযোগিতা নিরুপণের ক্ষেত্রে দ্রবিভূত অক্সিজেনের গুরুত্ব অপরিসীম। নদীর পানিতে প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রাম বা তদুর্ধ্ব দ্রবিভূত অক্সিজেনের উপস্থিতি মৎস চাষ, সেচকাজ, শিল্পকারখানা ও বিনোদনমূলক কাজে এবং প্রতি লিটারে ৬ মিলিগ্রাম বা তদুর্ধ্ব দ্রবিভূত অক্সিজেনের উপস্থিতি কেবল জীবানুমুক্তকরণের মাধ্যমে সরবরাহের জন্য সুপেয় পানির উৎস হিসেবে ব্যবহার উপযোগী।

করণীয়ঃ

সিএস রের্কড অনুযায়ী নদীগুলোর সিমানা নির্ধারণ করা, অবৈধ স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা উচ্ছেদ করা, নদী নিয়মিত খনন করা আঞ্চলিক নদীগুলোর পানি প্রাপ্তির লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা, পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন; গৃহস্থালী বর্জ্য পানি প্রবাহে ফেলা থেকে বিরত থাকা; ট্যানারীগুলো জরুরিভিত্তিতে স্থানান্তর এবং বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন ও বর্জ্য পরিশোধন করা; শিল্পকারখানায় বর্জ্য পরিশোনাগার স্থাপন এবং নিয়মিত তা পরিচালনা করা; নৌযানের ডিজাইনে বর্জ্য সংরক্ষণ বা ধারণ করার স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলা; বিআইডব্লিউ কর্তৃক নৌযানের বর্জ্য সংগ্রহকরণ ও তা পরিশোধনপূর্বক পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ; নৌযানের বর্জ্য ও তেল নদীতে ফেলা থেকে বিরত থাকা এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করা।