মোস্তাইনের আচরণে বিব্রত পুলিশ!

নিজস্ব প্রতিবেদক

0
77

ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সার্জেন্ট মোস্তাইনের আচরণে বিব্রত পুলিশ। একজন ফটো সাংবাদিককে শারীরিক হেনস্তা করার স্থির চিত্র ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ফলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন সার্জেন্ট মোস্তাইন। এতে বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাও তার এ আচরণে বিব্রত হয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন।

গতকাল বুধবার বিকেলে রাজধানীর মৎস্য ভবন সিগন্যালে দৈনিক মানবজমিনের ফটো সাংবাদিক নাসির উদ্দিনকে মারধর করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক দক্ষিণ বিভাগের ওই সার্জেন্ট। তীব্র সমালোচনার মুখে মোস্তাইনকে প্রত্যাহার করা হলেও বিব্রত হয়েছেন পুলিশ বাহিনী।

ডিএমপি’র গণমাধ্যম শাখার সাবেক একজন কর্মকতা আবু ইউসুফ। যিনি ট্রাফিক উত্তর বিভাগে কাজ করছিলেন বর্তমানে তিনি মৌলভী বাজার জেলার কুলাউড়া সার্কেলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, ‘প্রত্যেক সার্জেন্টকে পুলিশ-সাংবাদিক সম্পর্ক প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। তারা আমাদের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।’

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের রংপুর বিভাগে কর্মরত আছেন পুলিশের সাব ইনস্পেক্টর সালেহ ইমরান। তিনি ফেসবুকে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সার্জেন্ট মোস্তাইনের মারধরের ছবি দিয়ে ওই স্ট্যাটাসে তিনি যা লিখেছেন; তা পাঠকদের জন্য হু বহু তুলে ধরা হলো-

“আইন আপনাকে ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার শিক্ষা দেয়নি। দায়িত্ব পালনে কেউ বাধা দিলে ভদ্র ভাবে বুঝিয়ে বলুন। যদি কেউ আইনের সঠিক কাজটি করতে বাধা প্রদান করে প্রয়োজনে আপনার সাথে যে স্মার্ট ফোনটা আছে সেটা সহকর্মীকে দিয়ে ভিডিও করতে বলুন।

আপনার কাজের বৈধতা থাকলে কেউ ছবি তুলে বা ভিডিও করেও কিছু করতে পারবেনা যদিনা আপনার কোন দুর্বলতা না থাকে। আর দুর্বলতা থাকলে কখনো এই পেশার লোকের সাথে লাগতে যাবেন না। আপনাকে কোন পর্যায়ে নামিয়ে দিবে কল্পনাও করতে পারবেনা।

মনে রাখবেন, আপনার পজিটিভ ইমেজ যেমন পুরো বাহিনীর ইমেজ উপরে নিয়ে যায় ঠিক তেমনি বাহিনীর একজনের নেগেটিভ ইমেজ পুরো বাহিনীর ইমেজকে নিচে নামিয়ে দেয়। তাই, ভেবে চিন্তে, ঠান্ডা মাথায় কাজ করুন।

পুলিশ এবং সাংবাদিক কেউ কারো প্রতিপক্ষ নয়। দেশের জন্য এই দুই পেশার মানুষের অবদান অনেক অনেক বেশী। সাংবাদিক মানেই কারো কারো কাছে চুলকানী এই কনসেপশন থেকে বের হয়ে না আসলে এই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঘটবে এটাই স্বাভাবিক।

মনে রাখবেন দিন শেষে এই সাংবাদিকের কারণেই কন্সটেবল শের আলীর কান্না দেশের কোটি কোটি মানুষকে আবেগাপ্লোত করেছে। কনস্টেবল পারভেজ দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। উলটো পথে আসা বড় বড় রথী মহারথীরাও লজ্জায় মুখ লুকিয়েছে!

আপনার বা আমার কর্মকান্ডের কারণে সেই একই লজ্জায় কেন পুরো বাহিনী মুখ লোকাবে?

ঢালাওভাবে কোন ব্যক্তির দায়ভার কখনোই পুরো পেশার সাথে মেলানো কাম্য নয়। হোক সে পুলিশ, সাংবাদিক, ডাক্তার বা অন্য যে কেউ। প্রত্যেকেরই উচিৎ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তার বৈধ কাজে সহযোগীতা করা। বাধা সৃষ্টি করা নয়।”

ডিএমপির নিজস্ব নিউজ পোর্টালে বলা হয়েছে, বুধবার মৎস্য ভবন ক্রসিংয়ে ট্রাফিক সার্জেন্টের হাতে একজন ফটো সাংবাদিককে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নজরে এসেছে। এ ঘটনায় জড়িত সার্জেন্ট মোস্তাইনকে ক্লোজড করা হয়েছে। এ সংক্রান্তে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দৈনিক মানবজমিনে কর্মরত ফটো সাংবাদিক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমি প্রেসক্লাব থেকে কাজ শেষ করে বিকেলে মোটরসাইকেলে করে আমার অফিসে যাচ্ছিলাম। মৎস্য ভবনের সামনে আসার পর সার্জেন্ট মোস্তাইন আমাকে মোটরসাইকেল থামানোর নির্দেশ দেন।

এরপর আমি মোটরসাইকেলটি থামিয়ে দেই। আমার সঙ্গে দৈনিক জনকণ্ঠের ফটো সাংবাদিক জীবন ঘোষ ছিলেন। তখন সার্জেন্ট আমার কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির কাগজপত্র দেখতে চান। আমি তাকে কাগজপত্র সব দেই। এরপরও দেখি তিনি মামলা দিচ্ছেন।

আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, মামলা দিচ্ছেন কেন? সার্জেন্ট আমাকে বললেন, হেলমেট নেই, সে জন্য মামলা দিচ্ছি। তখন তাকে আমি বলি, ভাই কয়েকদিন আগে আমার হেলমেট হারিয়েছে, দ্রুত হেলমেট কিনে ফেলব। বেতন পেলেই কিনব। আমাকে ছেড়ে দিন। তিনি তারপরও মামলা দেন।

আমি তাকে অনুরোধ করতে থাকি। তখন তিনি আমাকে হলুদ সাংবাদিক বলেন। আমি প্রশ্ন করি, হলুদ সাংবাদিক বললেন কেন? আমি আমার ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে একটা ছবি তোলার চেষ্টা করি। তখন তিনি আমার গেঞ্জির কলার ধরে ক্যামেরা কেড়ে নেন। কিল-ঘুষি দিতে দিতে আমাকে পুলিশ বক্সের ভেতরে নিয়ে যান। সেখানে নিয়েও থাপ্পড় দেন।

এ সময় আমার সঙ্গে থাকা জীবন ঘোষ এই মারধরের ছবি তুলতে গেলে তাকেও ধাওয়া দেন, অন্য ট্রাফিক পুলিশদের তাকে ধরতে বলেন। জীবন তখন দৌড়ে প্রেস ক্লাবের দিকে যান। আর আমাকে পুলিশ বক্সে আটকে রাখেন। আমার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার হুমকি দেন। গালিগালাজ করতে থাকেন। ৪/৫ জন ট্রাফিক পুলিশ বক্সে ঢুকে আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে থাকেন। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসে সার্জেন্টকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন।

অর্থসূচক/মুন্নাফ/জেডআর