‘ঘুষ ছাড়া চাকরি হয়’-এবার দেখালো ‘কর অঞ্চল-১০’

রহমত রহমান

0
758

‘বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি ঘুষ ছাড়া চাকরি হয়েছে। কর বিভাগে টাকা ছাড়া এত দ্রুত ও স্বচ্ছ নিয়োগ হয় কাউকে বলে বিশ্বাস করাতে পারছি না’- কথাগুলো আবেগাপ্লুত হয়ে অর্থসূচককে বলেছেন কর অঞ্চল-১০এ সদ্য নিয়োগ পাওয়া আলীম উদ্দীন খান।

আজ বৃহস্পতিবার তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন কর অঞ্চল-১০, ঢাকায় অফিস সহকারী-কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। শুধু আলীম উদ্দীন খান নয়, তার মতো ৭ ক্যাটাগরিতে মোট ২৫ জন নিয়োগ পেয়েছেন।

কর অঞ্চল-১০ এত দ্রুত নিয়োগ প্রদান করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এর আগে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ঘুষ ছাড়া নিয়োগ প্রদান করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর দৃষ্টান্ত স্থাপন ও প্রশংসা কুড়িয়েছে।

আলীম খান উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘লিখিত পরীক্ষায় প্রথম হয়েছি। যোগ্যতা আর মেধার মূল্যায়নের ভিত্তিতে চাকরি পেয়েছি। ঘুষ দেওয়ার কথা অনেকে বলেছে। কিন্তু ঘুষ কাকে দেব? কারো কথা বিশ্বাস করিনি। বিশ্বাস ছিল লিখিত পরীক্ষায় টিকলে চাকরি হবে-তাই হয়েছে’।

তিনি বলেন, এনবিআর বিশেষ করে কর বিভাগ সম্পর্কে বাইরে শুনেছি-ঘুষ ছাড়া চাকরি হবে না! কিন্তু শুধু ঘুষ নয়, এত দ্রুত, স্বচ্ছ ও স্বল্প সময়ে নিয়োগ হবে কল্পনা করতে পারিনি। কর অঞ্চল-১০ এর কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ।

৫ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে- এমন প্রশ্নে আলীম বলেন, আমি এর আগে সরকারি ১০-১২ জায়গায় লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। এত দ্রুত, স্বচ্ছ কোথাও নিয়োগ হয়নি। আমার বাবা মারা গেছে। কর অঞ্চল-১০ এ নিয়োগ পেতে পরীক্ষার ফিস ১০০ টাকা আর আবেদনপত্র পাঠাতে ১২ টাকা লাগছে। ৫ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়া তো দূরের কথা এত টাকা কোনোদিন দেখিনি। বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি শতভাগ স্বচ্ছ নিয়োগ হয়েছে।

কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে নিয়োগ পাওয়া পাপিয়া আক্তার অর্থসূচকে বলেন, ‘নিয়োগ অত্যন্ত ফেয়ার হয়েছে। কোনো টাকা পয়সা লাগেনি। এত দ্রুত, ঘুষ ছাড়া নিয়োগ হবে ভাবতেও পারিনি’।

তিনি বলেন, এর আগে একটি অধিদপ্তরে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। শুনেছি টাকা লাগবে। আমার বাবা নেই, ঘুষ দিয়ে চাকরি নেওয়ার ক্ষমতাও নেই। কর বিভাগ সম্পর্কে বাইরে যেসব কথা শুনেছি কর অঞ্চল-১০এ নিয়োগ পেয়ে তা সবই মিথ্যা প্রমাণিত হল।

উচ্চমান সহকারী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মো. চাঁন মিয়া অর্থসূচকে বলেন, সম্পূর্ণ ফেয়ার নিয়োগ হয়েছে। টাকা পয়সা কিছুই লাগেনি। কর বিভাগ সম্পর্কে ধারণাই পাল্টে গেছে।

তিনি বলেন, আমি অত্যন্ত গরীব। ঘুষ দেয়ার মতো কোনো অবস্থাও নেই। নিয়োগ বোর্ডে যারা ছিল তারা তো দূরের কথা এ বিভাগের কেউ কোনো টাকা চায়নি। আমার জানা মতে ঘুষ এবং দ্রুত নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন দৃষ্টান্ত নেই। শুক্রবার লিখিত পরীক্ষা হয়েছে। বৃহস্পতিবারে নিয়োগ পাওয়া সত্যিই দৃষ্টান্ত। এত স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এ প্রথম দেখলাম আমি।

নোটিশ সার্ভার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া নাইমুল কাউসার অর্থসূচককে বলেন, এত সুন্দর নিয়োগ আমি আমার জীবনে দেখি নাই। ভাবতে পারিনি এত দ্রুত আর টাকা ছাড়া নিয়োগ পাব। এর আগে ২০ থেকে ২৫ জায়গায় পরীক্ষা দিয়েছি, কিন্তু চাকরি হয়নি।

মন্ত্রী, এমপি বা কারো সুপারিশ বা ঘুষ দিতে হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নে নাইমুল বলেন, পরীক্ষার আগে অনেকেই বলেছে, কর বিভাগে ঘুষ লাগে। অনেক উপর থেকে ফোন করাতে হবে, অনেক টাকা ঘুষ দিতে হবে। কিন্তু একটা সিঙ্গেল পয়সাও লাগেনি। আমার বাবা কৃষি কাজ করে, ঘুষ কোথা থেকে দেব। ঘুষ ছাড়া নিয়োগ পেয়ে কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না।

গাড়ীচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মো. মাইনউদ্দিন অর্থসূচকে বলেন, কোনো টাকা ছাড়াই নিয়োগ পেয়েছি-বিশ্বাস করতে পারছি না। লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক আর ব্যবহারিক পরীক্ষায় যোগ্যতা আর মেধাকে মূল্যায়ন করে এ কর অঞ্চল নিয়োগ দেওয়ায় তাদের ধন্যবাদ।

তিনি বলেন, আগে কর বিভাগ সম্পর্কে শুনতাম টাকা ছাড়া চাকরি হয় না।

ঘুষ আর ঘুষ। কিন্তু বর্তমান চেয়ারম্যানের সময় সব পাল্টে গেছে শুনে আবেদন করেছি। ঠিকই যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পেয়েছি। অনেকেই বলেছে তদবির করতে, কারো কথাই বিশ্বাস করিনি। আজ রেজাল্ট দেখে চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছি না।

উচ্চমান সহকারী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ফারহানা ববি অর্থসূচককে বলেন, কালকে ভাইভা দিয়েছি, আজকে রেজাল্ট হয়েছে-ভাবতেও অবাক লাগে। কত গল্প শুনলাম, টাকা ছাড়া চাকরি হবে না। কিন্তু একটি কর অঞ্চলে এত দ্রুত নিয়োগ হবে বিশ্বাস হচ্ছে না। আমার বাবা নেই, ওপরে লোকও নেই। ঘুষ দিয়ে চাকরি নিতে হলে আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

নিয়োগের বিভাগীয় নির্বাচন কমিটির সদস্য সচিব ও উপ-কর কমিশনার (সদর দপ্তর, কর অঞ্চল-১০) মো. জাহেদুল ইসলাম অর্থসূচকে বলেন, ২০১৬ সালের ১৮ মে ১১তম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেডে ৯টি ক্যাটাগরিতে ৩৮ জন কর্মচারি নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এরমধ্যে কম্পিউটার অপারেটর ১ জন, ব্যক্তিগত সহকারী ২ জন, উচ্চমান সহকারী ৩ জন, সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক কাম-কম্পিউটার অপারেটর ৪ জন, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর/অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক ৬ জন, গাড়িচালক ৬ জন, নোটিশ সার্ভার ৪ জন, অফিস সহায়ক ৪ জন ও নিরাপত্তা প্রহরী ৮ জন নেওয়ার কথা বলা হয়। ২০ জুন আবেদনের মেয়াদ শেষ হয়। এতে ৫ হাজার ৪৭১টি আবেদন জমা পড়ে। এরমধ্যে যাচাই শেষে ৫ হাজার ২৮ জন আবেদনকারীকে প্রবেশপত্র পাঠানো হয়।

তিনি বলেন, নিয়োগ দ্রুত ও স্বচ্ছ করার জন্য এ প্রথম কোনো দপ্তর প্রবেশপত্রে লিখিত, মৌখিক, ব্যবহারিক পরীক্ষা ও ফলাফল প্রকাশের সময়, তারিখ উল্লেখ করা হয়। ৬ অক্টোবর সকাল ৯ থেকে ১২ পর্যন্ত ২ শিফটে উত্তরা হাই স্কুল এন্ড কলেজে পরীক্ষা নেওয়া হয়। লিখিত পরীক্ষায় ২ হাজার ১৯৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। কোডিং পদ্ধতিতে খাতা মূল্যায়ন শেষে একই দিন ৬ অক্টোবর রাত ১১টা ৫৮ মিনিটে লিখিত পরীক্ষার ফলাফল দেওয়া হয়। এতে ১৭৮ জন উত্তীর্ণ হয়।

৭ অক্টোবর দুপুর ৩টায় বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল ব্যবহারিক পরীক্ষা নেয়। ১১ অক্টোবর সকাল ১১টায় মৌখিক পরীক্ষা শেষে ১২ অক্টোবর সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে ২৫ জনকে চূড়ান্তভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়।

তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত সহকারী ও সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদে ৫৫ জন ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ পাস করেনি। ফলে এ দুইটি পদে কাউকে নেয়া হয়নি। এছাড়া কোটা সংরক্ষিত হওয়ায় ৭ জন নিয়োগ পায়নি। ১২ অক্টোবর যোগদানপত্র পাঠানো হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার ১২টি কোটায় যোগ্য ৩ জন নিয়োগ পেয়েছে।

নিয়োগের বিভাগীয় নির্বাচন কমিটির আহ্বায়ক ও অতিরিক্ত কর কমিশনার (রেঞ্জ-২, কর অঞ্চল-১০) মোহা: আবুল কালাম অর্থসূচকে বলেন, কর বিভাগে অত্যন্ত স্বচ্ছ ও দ্রুত সময়ে কোনো নিয়োগ হয়েছে কি না আমার জানা নেই। পিএসসি থেকে শুরু করে সব মহল এ নিয়োগ নিয়ে প্রশংসা করেছে।

কর অঞ্চল-১০ এর কমিশনার অপূর্ব কান্তি দাস অর্থসূচকে বলেন, দ্রুত ও ঘুষ ছাড়া নিয়োগ দেওয়া আমাদের নিজস্ব নয়, সরকারের দেওয়া দায়িত্ব আমরা পালন করেছি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ছিল ঘরে ঘরে একজন করে চাকরি দেবে। সে নির্দেশনার আলোকে আমাদের জোনে যে ক’টা পদ খালি ছিল তাদের স্বচ্ছভাবে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

তিনি বলেন, লিখিত পরীক্ষা যেখানে হয়েছে অন স্পট আমরা খাতা মূল্যায়ন করেছি। সেখান থেকে রেজাল্ট দিয়েই আমরা বের হয়েছি। ব্যবহারিক পরীক্ষা কম্পিউটার কাউন্সিল স্বচ্ছভাবে নিয়েছে। সেখানে হাতের স্পর্শ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়েছে। আমাদের কারো হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।

তিনি আরও বলেন, এত স্বচ্ছ আর তুমুল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পর মৌখিক পরীক্ষার জন্য আমরা মাত্র ৫৯ জনকে নির্বাচন করি। মৌখিক পরীক্ষা বোর্ডেও সেই পরীক্ষার্থী কিনা পরীক্ষা করে ৬ জনকে পেয়েছি যে তারা লিখিত পরীক্ষা দেয়নি। এমন অবস্থা দেখে মৌখিক পরীক্ষায় ভয়ে আরও ৩ জন অংশ নেয়নি।

কমিশনার বলেন, পরীক্ষা নির্বিঘ্ন, স্বচ্ছ করার জন্য আমরা সব গোয়েন্দা সংস্থাকে চিঠি দিয়েছি। তারা আমিসহ আমাদের সবার মোবাইল নম্বর ট্যাকিং করাসহ সব ধরনের সহযোগিতা করেছে। দুদকের পক্ষ থেকে মনিটরিং করা হয়েছে।

তদবির কেমন এসেছে-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সারাদিন তদবির এসেছে। কারো তদবির শুনিনি। যত বড় জায়গা এমনকি অনেক মন্ত্রীর পক্ষ থেকে তদবির এসেছে কারো তদবির রাখা হয়নি। এ নিয়োগ স্বচ্ছ ও দ্রুত করার জন্য এনবিআর চেয়ারম্যান ও বোর্ড অত্যন্ত সহযোগিতা করেছে বলে জানান তিনি।

ফলাফল দেখতে ক্লিক করুন- http://taxeszone10dhaka.org/uploads/notices/0d9e29d1ffe1622b697537071b33ff6e.pdf

অর্থসূচক/রহমত/এস