প্রভুভক্তিতে বিখ্যাত ৪ কুকুর

অর্থসূচক ডেস্ক

0
119

বিশ্বস্ততা ও প্রভুভক্তির জন্য কুকুর ইতিহাসে বিখ্যাত। মানুষ তার দৈনন্দিন নানা কাজে কুকুরকে কাজে লাগায়। মনিবের জন্য প্রভুভক্ত কুকুর ‘হাসিমুখে’ তার জীবন পর্যন্ত দিয়েছে এমন গল্প আমরা বহু পড়েছি। মনিবের মৃত্যুতে শোকে বিহ্বল হয়ে অশ্রুসজল চোখে নিজেও মারা গেছে, এরকম উদাহরণও আছে অসংখ্য।

এরকমই ৪ বিখ্যাত কুকুরের কথা জেনে নেয়া যাক-হাচিকো

সে ছিল আকিতা ইনু জাতের এক পুরুষ কুকুর। জাপানের পার্বত্যময় উত্তরাঞ্চলে পাওয়া যায় কুকুরের এই প্রজাতি। ১৯২৪ সালে তৎকালীন টোকিও ইমপেরিয়াল ইউনিভার্সিটির (বর্তমান ইউনিভার্সিটি অব টোকিও) কৃষি বিভাগের অধ্যাপক এইজাবুরো উয়েনো যখন তার এক ছাত্র থেকে উপহার হিসেবে হাচিকোকে পান, তখন সে ছিল সোনালি-বাদামি রঙের ছোট্ট এক আকিতা ছানা। উয়েনো তার নাম রাখেন হাচিকো।

প্রতিদিন সকালে সে তার মালিকের সাথে টোকিওর শিবুইয়া রেল স্টেশন পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে যেতো। উয়েনো যখন ট্রেনে করে তার কাজে চলে যেতেন, হাচিকো আবার ঘরে ফিরে আসতো। সন্ধ্যাবেলায় উয়েনো যখন আবার ট্রেনে করে ফিরে আসতেন, হাচিকো শিবুইয়া স্টেশনের টিকেট গেটের সামনে অপেক্ষা করতো তার মনিব উয়েনোর জন্য।
১৯২৫ সালের ২১ মে ক্লাসে লেকচার দেওয়ার সময় অধ্যাপক এইজাবুরো উয়েনো মস্তিকের রক্তক্ষরণে মারা গেলেন। ঐদিকে মনিবের অপেক্ষায় টিকেট গেটের সামনে ঠায় বসে আছে বছর দেড়েকের ‘ছোট্ট’ হাচিকো। কিন্তু তার প্রিয় মনিব তো আর ফেরে না।

একদিন না, এক সপ্তাহ না, এক মাসও না, এমনকি এক বছরও না; হাচিকো তার মনিবের জন্য পাক্কা নয় বছর নয় মাস পনেরো দিন অপেক্ষায় ছিল। তার অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় ১৯৩৫ সালের ৮ মার্চ, যখন সেদিনের সেই ছোট্ট হাচিকো ১১ বছর বয়সে মারা যায়। তাকে শিবুইয়ার রাস্তায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
২০০৯ সালে ১৬ মিলিয়ন ডলার খরচ করে নির্মিত হয় Hachi: A Dog’s Tale নামের ৯৩ মিনিটের এক চলচ্চিত্র।

লাইকা

মহাকাশে পৃথিবীর কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করা প্রথম প্রাণী মস্কোর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো এক বোহেমিয়ান কুকুর- লাইকা। প্রায় ছয় কেজি ভরের লাইকা ছিল সংকর টাইপ (Mongrel) মেয়ে কুকুর; অর্থাৎ সে ছিল আধেক সাইবেরিয়ান হাস্কি ও অর্ধেক টেরিয়ার।

তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশ বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, রাস্তার কুকুর হিসেবে ক্ষুধা ও ঠাণ্ডায় লাইকারা বেশ সহ্যশক্তিসম্পন্ন হবে। তারা লাইকাসহ তিনটি কুকুরকে মহাকাশে প্রেরণের উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করলো। লাইকা ছাড়া বাকি দুই কুকুরের নাম দেওয়া হয়েছিল- আলবিনা ও মুশকা। তাদের ছোট্ট খাঁচায় রেখে পুষ্টিকর জেল জাতীয় খাবার খাওয়ানোর অভ্যাস করাতে লাগলো সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ।

১৯৫৭ সালের অক্টোবরে স্পুটনিক-১ এর সফলতার পর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্ব দানকারী নিকিতা ক্রুশ্চেভ রুশ বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকী উপলক্ষে ৭ নভেম্বর আরেকটি মহাকাশযান মহাশূন্যে পাঠানোর আদেশ দেন। সোভিয়েত বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে শেষতক ১৯৫৭ সালের ৩ নভেম্বর লাইকাকে নিয়ে বাইকোনুর রকেট স্টেশন (বর্তমান দক্ষিণ কাজাখস্তান) থেকে মহাশূন্যে যাত্রা করে স্পুটনিক-২।

স্পুটনিকে অক্সিজেন জেনারেটর, কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের যন্ত্র থেকে শুরু করে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক ও লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমের সুবিধা থাকলেও ছিল না লাইকাকে ফিরিয়ে আনার কোনো ব্যবস্থা। ফলে মহাশূন্যে গিয়ে মারা যায় লাইকা। স্পুটনিক-২ উৎক্ষেপণের ঠিক কত পরে লাইকা মারা যায়, এটি নিয়ে ধোঁয়াশা আছে।

রিন টিন টিন

অস্কারের প্রথম আসরে সেরা অভিনেতার বিভাগে এক কুকুর মনোনয়ন পেয়েছিল! কিন্তু মানুষ নয় বলে তাকে সেই পুরস্কার দেওয়া হয়নি। আজকের বিশ্ব কাঁপানো বিনোদন জায়ান্ট ওয়ার্নার ব্রাদার্সকে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া থেকে টেনে তোলে এই একই কুকুর! ২৩টি ছবিতে অভিনয় করা এই কুকুরের অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়তো সবাই! তাকে নিয়ে সুজান অরলিয়েন Rin Tin Tin: The Life and the Legend নামে একটা বইও লিখেছিলেন; যাকে শিকাগো ট্রিবিউন মাস্টারপিস বলে আখ্যায়িত করে। তার মৃত্যুতে সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয় ১৯৩২ সালে। আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় এই কুকুরের নাম রিন টিন টিন; ডাকনাম- রিনটি।

১৯১৮ সালের সেপ্টেম্বরে উত্তর ফ্রান্সের যুদ্ধক্ষেত্রে জন্ম নেয় এক জার্মান শেফার্ড।

রিনটির প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র ছিল The Man from Hell’s River (১৯২২); ১৯২৩ সালে Where the North Begins সিনেমাটির মাধ্যমে রিনটি দেশজুড়ে খ্যাতি অর্জন করে; সেই সাথে ধ্বংসের মুখে থাকা ওয়ার্নার ব্রাদার্সকেও টেনে তোলে। রিনটি সর্বশেষ The Lightning Warrior নামে ১২ পর্বের একটি সিরিয়ালে ‘অভিনয়’ করে।
১৯৩২ সালের ১০ আগস্ট প্রায় ১৪ বছর বয়সে রিনটি মারা যায়। প্রিয় কুকুরের মৃত্যুতে ডানকান শোকগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি রিনটিকে নিয়ে একটি কবিতাও রচনা করেন।

 

বব্বি
বছর দুয়েকের স্কচ কোলি জাতের বব্বি ছিল ব্রেইজার পরিবারের পোষা কুকুর। ১৯২৩ সালের গ্রীষ্মকালীন অবকাশে ব্রেইজার পরিবারের সাথে সে-ও আসে ইন্ডিয়ানা স্টেটের ওয়ালকোট শহরে।

ফ্র্যাঙ্ক ও এলিজাবেথ ব্রেজিয়ার তাদের খামারবাড়ির জন্য একটা কুকুর পোষার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাদের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ব্রেজিয়ার পরিবারে আসলো এক ছোট্ট কুকুরছানা। আদর করে একটা নামও দেওয়া হল তার- বব্বি। তার যখন দু’বছর বয়স, ব্রেইজার পরিবার বব্বিসহ ঘুরতে গেলো হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের অরিগন স্টেটে। কোনো এক গ্যাস স্টেশনে গাড়িতে জ্বালানি নেবার সময় সেখানকার স্থানীয় কিছু কুকুরের তাড়া খেয়ে বব্বি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তার মনিবের থেকে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় অরিগনের বব্বি বিখ্যাত হয়ে আছে তার ফিরে আসার মহাকাব্যিক গল্পে।

অবশেষে ছয় মাসের ২, ৫৫১ মাইলের সুদীর্ঘ নিঃসঙ্গ যাত্রা শেষে ১৯২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বব্বি পৌঁছে যায় তার গৃহসকাশে- উইলিয়ামেট উপত্যকার পূর্বকোণের ছোট্ট শহর সিলভার্টনে। ফ্র্যাঙ্ক ব্রেজিয়ারের ছোট মেয়ে নোভা (এতদিন পরে) বব্বিকে দেখে চিৎকার করে ডেকে ওঠে। বব্বিও নোভাকে চিনতে পেরে তার কোলে এসে ঝাঁপ দেয়। বব্বি ফিরে আসে তার আপন ঠিকানায়।

বব্বিকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। বাড়ি ফেরা বব্বি ছিল ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত; তার পা দুটি ছিল ক্ষতবিক্ষত, আহত। অনেক সেবাযত্নের পর সুস্থ হয়ে ওঠে বব্বি। ফিরে আসার পর আরো বছর তিনেক বেঁচে ছিল এই বিস্ময় কুকুর। ১৯২৭ সালে বব্বি মারা যায়। Oregon Humane Society-এর পোষা প্রাণীদের জন্য নির্মিত সিমেট্রিতে তাকে কবর দেওয়া হয়।

সূত্র : ইন্টারনেট

অর্থসূচক/টি এম/কে এম