চট্টগ্রাম কাস্টমসে চালু হচ্ছে স্ক্যানিং বিভাগ

রহমত উল্যাহ

0
93

পণ্যবাহী সকল কনটেইনারকে স্ক্যানিং এর আওতায় আনার জন্য চট্টগ্রাম কাস্টমসে চালু হচ্ছে স্ক্যানিং বিভাগ। জনবল, স্ক্যানার পেলে এ বছরই স্ক্যানিং বিভাগ চালু করা হবে বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম কাস্টমস বিভাগ চালু করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) একটি প্রস্তাব পাঠায়। এনবিআরের যাচাই শেষে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ হয়ে প্রস্তাবটি বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।

এ বিভাগ চালু হলে কনটেইনার জট কমার পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হবে না। তাছাড়া ক্ষতিকর পণ্য প্রবেশ করতে পারবে না, আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে ও দ্রুত মালামাল খালাস ও রাজস্ব আহরণ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।

চট্টগ্রাম বন্দর।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে অর্থসূচকে জানান, ‘এ বিভাগ চালু করতে কাস্টমস তার সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেছে। কাস্টমস হাউজ থেকে এনবিআরে প্রস্তাব দেয়া হয়। এনবিআর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে প্রস্তাবটি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে মতামত পেলে আমরা অর্থমন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবো। পরে মন্ত্রী সভা ও সর্বশেষ সচিব কমিটিতে চূড়ান্ত হবে।

বিষয়টিকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে যত দ্রুত সম্ভব এ বিভাগ চালু করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

চট্টগ্রাম বন্দরের গতিশীলতা আনয়নে আমদানি-রপ্তানি ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে সম্প্রতি নির্দেশ দেয় প্রধানমন্ত্রী। ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শন করেছে এনবিআর চেয়ারম্যান।

চট্টগ্রাম বন্দর।

সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা কাস্টমস খোলা রেখে কিভাবে দ্রুততার সাথে পণ্য খালাস করা যায় সে বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার এএফএম আবদুল্লাহ খানের কাছে এনবিআর চেয়ারম্যান জানতে চাইলে কমিশনার বলেন, স্ক্যানার সংকট রয়েছে। যত দ্রুত স্ক্যানিং করে কনটেইনার খালাস করা যাবে তত সময় বাঁচবে, রাজস্ব বাড়বে। কিন্তু আমাদের কালার স্ক্যানার নেই। সাদা-কালো স্ক্যানিং মেশিনে অনেক ইমেজ দেখানো হয় যা সঠিক হয় না।

এএফএম আবদুল্লাহ খান বলেন, এপ্রিল মাসে ৩১ হাজার ৬৪০টি কন্টেইনার স্ক্যানিং করা হয়েছে। এরমধ্যে ১৯২টি কন্টেইনারে সাসপেক্ট দেখায়। যা পরবর্তীতে পরীক্ষা করে মাত্র ২টি মামলা করা হয়েছে। মে মাসে ২৯ হাজার ৩৯০টি কন্টেইনার স্ক্যানিং করা হয়। যেখানে ১৫৫টি সাসপেক্ট দেখায় আর মামলা হয় ৭টি। জুনে ২৩ হাজার ৬৪টি কন্টেইনার স্ক্যানিং করা হয়। এতে ৯৬টি কন্টেইনার সাসপেক্ট দেখায় আর মামলা হয় ১টি।

কমিশনার আরো বলেন, ১৮৩ জনবল নিয়ে একটি স্ক্যানিং বিভাগ করার জন্য একটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। খুব ধীর গতিতে প্রস্তাবটি যাচ্ছে। জনবল দেয়া হলে দ্রুত বিভাগ খোলা যাবে।

চট্টগ্রাম বন্দর।

বিভাগ হলে কিভাবে কাজ করবেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ১৮৩ জন জনবলের মধ্যে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার রয়েছে। ১৮৩ জনের মধ্যে অর্ধেক টেকনিক্যাল খাতের কর্মকর্তা। তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পর স্ক্যানিং এর দায়িত্ব দেয়া হবে।

তিনি বলেন, টেকনিক্যাল কর্মকর্তাদের সাপোর্ট দেয়ার জন্য কাস্টমসের আরো ৯০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকবে। আমরা পরিকল্পনা করছি বন্দরের ১২টি গেইটে ১২টি স্ক্যানার বসাবো। এখন রয়েছে মাত্র ৪টি। ১২টি গেইটে ১২টি স্ক্যানার বসানো হলে এ স্ক্যানিং বিভাগ তা নিয়ন্ত্রণ করবে। স্ক্যানিং বিভাগ চালু করা পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরে স্ক্যানিং বিভাগ ও পর্যাপ্ত স্ক্যানার না থাকায় পণ্যবাহী ৫৫ শতাংশ কনটেইনারকে স্ক্যানিংয়ের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। শতভাগ কনটেইনার স্ক্যানিংয়ের আওতায় আনতে ২০১৬ সালের মার্চে স্ক্যানিং বিভাগের কাঠামোর প্রস্তাব এনবিআরে পাঠানো হয়।

প্রস্তাবে বলা হয়, স্ক্যানিং বিভাগের জন্য ১৮৩ জন লোকবল নিয়োগ, ১২টি গেটের জন্য ১২টি স্ক্যানার মেশিন, ১০টি বিস্ফোরক পদার্থ শনাক্তকারী যন্ত্র, ৭টি মাইক্রোবাস, ৩৭টি কম্পিউটারসহ সিসিটিভিসহ বিভিন্ন জিনিসের জন্য প্রস্তাব করা হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শন করছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান।

প্রস্তাবে আরো বলা হয়, স্ক্যানিং বিভাগের কনটেইনার স্ক্যানিং ও বিস্ফোরক পদার্থ শনাক্তকারী যন্ত্র পরিচালনার জন্য একজন অপারেশন ম্যানেজার, একজন কম্পিউটার অপারেশন সুপারভাইজার, একজন সিনিয়র কম্পিউটার অপারেটর নিয়োজিত থাকবেন। প্রতিটি বিস্ফোরক পদার্থ সনাক্তকারী যন্ত্র পরিচালনার জন্য ২ জন কম্পিউটার অপারেটর ও ২ জন ট্রাফিক কো-অর্ডিনেটর (সমন্বয়কারী) পদ রাখা হয়েছে। মোট ৮০ জন কম্পিউটার অপারেটর ও ৮০ জন ট্রাফিক কো-অর্ডিনেটরসহ পুরো বিভাগে মোট ১৮৩ জন ৪ শিফটে ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্র জানায়, ‘চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন’ প্রকল্পের আওতায় অঘোষিত ও বিস্ফোরক জাতীয় পণ্য আমদানির পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে ২০০৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে কন্টেইনার স্ক্যানিং বাধ্যতামূলক করা হয়।

সূত্র আরো জানায়, সাড়ে ৫ বছরের শুধু স্ক্যানিং সংকটের কারণে কোনো ধরনের স্ক্যানিং বা তদারকি ছাড়াই ছাড়করণ এবং জাহাজীকরণ হয়েছে ৩৭ লাখ ৮১ হাজার রফতানি পণ্যভর্তি কনটেইনার। যা মোট হ্যান্ডলিং হওয়া কনটেইনারের প্রায় অর্ধেক।

চট্টগ্রাম বন্দরের স্ক্যানিংয়ের দায়িত্বে থাকা সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান এসজিএসের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট ১২ লাখ ১ হাজার ৫৯৪টি কন্টেইনার স্ক্যানিং করা হয়েছে। এর মধ্যে সন্দেহজনক পণ্য আনার অভিযোগে আটক হয়েছে ৭ হাজার ৪৪৮টি কন্টেইনার।

অর্থসূচক/রহমত/কে এম