‘আর্থিক খাতে দুই চ্যালেঞ্জ-খেলাপি ঋণ, দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি’

সাক্ষাতকারে ফিনিক্স ফাইন্যান্সের এমডি

গিয়াস উদ্দিন

0
94
Phoenix-Finance-MD-Intekhab
অর্থসূচকের সঙ্গে সাক্ষাতকারে ফিনিক্স ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইন্তেখাব আলম

এসএম ইন্তেখাব আলম দেশের অন্যতম শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফিনিক্স ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। একটি সময় তিনি এই খাতে সবচেয়ে কম বয়সী প্রধান নির্বাহী ছিলেন। তার হাত ধরে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ফিনিক্স ফাইন্যান্স। গত কয়েক বছর ধরে আর্থিক খাত নানা ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই প্রতিকূল পরিবেশেও নিজের অবস্থান সংহত রাখতে পেরেছে ফিনিক্স ফাইন্যান্স। আর এই কৃতিত্বের প্রধান ভাগিদার প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ নির্বাহী ইন্তেখাব আলম। সম্প্রতি অর্থসূচকের সঙ্গে তিনি আর্থিক খাত ও ফিনিক্স ফাইন্যান্সের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। সাক্ষাতকারটি নিয়েছে স্টাফ রিপোর্টার গিয়াস উদ্দিন

Phoenix-Finance-MD-Intekhab
অর্থসূচকের সঙ্গে সাক্ষাতকারে ফিনিক্স ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইন্তেখাব আলম

অর্থসূচকঃ আর্থিক খাতের সামগ্রিক অবস্থাকে কীভাবে দেখছেন?

ইন্তেখাব আলমঃ  আর্থিক খাতের সামগ্রিক অবস্থাকে দুটি কারণে আমি ভালো বলতে পারছি না। প্রথমতঃ এই খাতে খেলাপী ঋণ বেড়ে গেছে। টাকা আদায় কঠিন হয়ে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোই (ব্যাংক ও এনবিএফআই) শুধু সংকটে পড়বে না, আর্থিক ব্যবস্থাই একসময় ভেঙ্গে পড়বে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে পড়েছে। খেলাপি ঋণ কমাতে পারলে এগুলো আবার ঠিক হয়ে যাবে।

আর্থিক খাতের দ্বিতীয় বড় সমস্যা হলো দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি। গত কয়েক বছরে আর্থিক খাত অনেক বিকশিত হলেও সে অনুপাতে দক্ষ জনবল বাড়েনি। বরং খাতটি যত বড় হচ্ছে, ততই দক্ষ জনবলের ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠছে। কিছু প্রতিষ্ঠান অনেক গুরুত্ব ও যত্নের সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়নের চেষ্টা করছে। কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান এ প্রক্রিয়াটিকে অনেক কষ্টকর মনে করে সে পথে যাচ্ছে না। তারা অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ বেতনে অভিজ্ঞদের টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। অন্যদিকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যেসব তরুণরা বের হচ্ছেন, তাদের অনেকের মান সন্তোষজনক নয়। অনেকের মধ্যেই নিষ্ঠার অভাব আছে। এসব কারণে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি কমছে না।

শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য-ব্যর্থতা নয়, সামগ্রিক আর্থিক খাতের ভালো-মন্দের সঙ্গে মানবসম্পদের বিষয়টি জড়িত। রেগুলেটর আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক সহযোগিতা করেছে। কিন্তু দক্ষ লোক না থাকলে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে পারবে না। আর্থিক খাতের পরিবর্তনের জন্য এই জায়গাটায় নজর দেওয়া অনেক বেশি।

আর্থিক খাতের উন্নয়নে অনেকগুলো কাজ করার কথা ছিল। যেমন- মিউচুয়াল ফান্ড ও বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন। আমরা কাজটি করতে পারিনি। এর অন্যতম কারণ হলো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) প্রথম দিকের প্রধান নির্বাহীদের বেশিরভাগ ছিলেন ব্যাংকার। তারা ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞতা,  ব্যাংক-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়েই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। ফলে ফলে যেখানে ফোকাস হওয়া দরকার ছিল সেখানে ফোকাস হয়নি। তবে কেউ কেউ যথাযথ ফোকাসিং এর চেষ্টা করেছেন।

অর্থসূচকঃ আর্থিক খাতের বর্তমান অবস্থায় কী করা প্রয়োজন?

ইন্তেখাব আলমঃ আর্থিক খাত একবার পড়ে গেলে হাজার চেষ্টা করেও কেউ দাঁড় করাতে পারবে না। তাই সময় থাকতেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

আর্থিক খাতের একটি বড় সমস্যা খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণ আদায়ে সময়োপযোগী উদ্যোগ নিতে হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থা (আইএমএফ)   খেলাপী ঋণ আদায়ে বিদ্যমান আইন সংশোধনের পরামর্শ দিয়েছে। আমিও মনে করি আইনের পরিবর্তন করা প্রয়োজন। সব কিছু বিবেচনা করে যদি একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা বা পদ্ধতিগত উন্নতি অথবা বিচারকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার হয়, আমাদের সে উদ্যোগই নেওয়া উচিত। আইএমএফ বলছে প্রয়োজনে তারা এখানে অর্থায়ন করবে। ওই ট্রাইবুনালে যারা বসবেন তাদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিভিন্ন ফিন্যান্সিয়াল টার্মস,আর্থিক খাতের সুদ কিভাবে ধরা হয়, কিভাবে কম্পাউন্ড হয় ইত্যাদি খুঁটিনাটি বিষয় উনারা না-ই জানতে পারেন। এসব বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত করা, পর্যাপ্ত ধারণা দেওয়ার জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও স্টক এক্সচেঞ্জে পলিসি ও রেগুলেটরি বিষয়গুলো নিয়ে যারা কাজ করেন তাদেরকে আরও দক্ষ করে তুলতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরী।

যেমন ডিএসই কিছুদিন আগে একটটি সার্কুলার জারি করেছে। শেয়ার লিয়েন রেখে ঋণ দেওয়া সংক্রান্ত একটি ফরম্যাট দিয়ে বললো, এটাতে গ্রাহকদের সাক্ষর লাগবে, ওই স্বাক্ষর ভেরিফাই করতে হবে। এই সার্কুলার জারির আগে যেগুলো লিয়েন হয়েছে সেগুলোর অবস্থা কী হবে, সে বিষয়ে কোনো সমাধান দেয়নি তারা। যার ফলে হচ্ছে কী আমরা যখন এটা ছাড়াই দিচ্ছি, তখন ডিএসই বলে এখানে সই করতে হবে। এরই মধ্যে গ্রাহক খেলাপী হয়ে গেছে, ফলে সে আর সই করছে না।

স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে একটু আলোচনা করে সার্কুলারটি জারি করা হলে কিন্তু এই জটিলতা এড়ানো যেতো। এখানেই আসলে দক্ষতার বিষয়টি জড়িত।

Phoenix-Finance-MD-Intekhab-1
ফিনিক্স ফাইন্যান্সের এমডি ইন্তেখাব আলম

বাংলাদেশের আর্থিক খাত কিন্তু দিন দিন বড় হচ্ছে। সম্ভবত আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে ১১তম অর্থনৈতিক দেশ হতে যাচ্ছে। এই অবস্থায় আমি মনে করি এই খাতকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

অনেকগুলো ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান একত্রে আসছে, সে তুলনায় দক্ষ লোক তৈরি হয়নি। অনেক কোম্পানিতে ভালো ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, দ্বিতীয় পর্যায়ের বা বিভাগীয় প্রধান হিসাবে কাজ করার মতো যোগ্য লোক নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান এমন কর্মকর্তাকে প্রমোশন দিয়ে উপরে উঠিয়েছে, যে ওই জায়গারগুলোর যোগ্য নন তারা। এর প্রভাব কিন্তু আর্থিক খাতে পড়েছে।

নতুন ব্যাংকগুলো কস্ট অব ফান্ড কমাতে পারছে না। নতুন তিনটি ব্যাংক শুরুতেই খেলাপী ঋণের বোঝায় জর্জরিত। এগুলো হওয়া উচিৎ ছিল না। পরিচালকরা অনেক কিছ বুঝে না বুঝে চাইতেই পারে। আমাদের কাজ তাদের বুঝানো। একজন প্রফেশনালের কাজ সবকিছু বুঝিয়ে দেয়া। এই আইন বা সার্কুলারের কারণে এটা করা যাবে আর ওটা করা যাবে না-এভাবে তাদের ধরিয়ে দেওয়া।

অর্থসূচকঃ খেলাপী ঋণের বিষয়ে আপনার বক্তব্য ?

ইন্তেখাব আলমঃ খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা শুধু জরুরি নয়, এটি অপরিহার্য। কারণ যারা বড় বড় খেলাপী তারা দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। তারা কখনই টাকা দিবে না। তারা হুমকি-ধামকি, এমন কি কোর্ট-কাচারিতে গিয়েও তাদেরর পক্ষে কিছু রায় বের করে নিয়ে আসছে। জনগণের টাকা আমি তাকে দিয়েছি, এটি বছরের পর বছর তাদের কাছে পরে থাকবে তাতো হতে পারে না। একটি নির্ধারিত সময়ে সুদসহ ফেরত দিবে এটাইতো নিয়ম।

জনগণের টাকা তাদের কাছে আটকে থাকলে আমি কোথা থেকে এই টাকা ফেরত দেবো? এক সময় আমিতো দূর্বল হয়ে যাবো। এগুলো বুঝার বিষয়। আমি মনে করি এই কাজগুলো ভালোভাবে করার জন্য বাণিজ্যমন্ত্রণালয়, লিগ্যাল ডিপার্টমেন্ট, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, আইডিআরএসহ রেগুলেটরি সংস্থাগুলোর একটি কার্যকর সমন্বয় কমিটি থাকা জরুরি। বর্তমানে একটি সমন্বয় কমিটি আছে। কিন্তু সেটি কাগজে কলমে। বাস্তবে সমন্বয়ের কোনো উদ্যোগ কাজ চোখে পরে না। খেলাপী ঋণ বাড়ার পেছনে এটিও একটি কারণ। দেশকে ভালোবাসার অংশ হিসাবেই আমার কাজটুকু আমাকে করতে হবে। আমার কাজ অন্যজন করে দিবে না। আমি আমার কাজটি করতে চাই, সুন্দরভাবে করার জন্য আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। তাহলে ভালো ফলাফল আসতে বাধ্য।

অর্থসূচকঃ  একটু আগে আপনি বলছিলেন, আপনারা  উপযুক্ত লোক পান না। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর অসংখ্য তরুণ বের হচ্ছে। তাহলে কী শিক্ষাব্যবস্থাতেই কিছু গলদ রয়ে গেছে?

ইন্তেখাব আলমঃ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান অনেক খারাপ গেছে। মাঝে মাঝে আমি অনেক কষ্ট পাই এই জন্য যে ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে আসা তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও অনেকের আউটপুট খুবই খারাপ। তখন আমি শঙ্কিত হয়ে যাই, ভালো লোক তৈরি না হলে আর্থিক খাতের অবস্থা কিভাবে পরিবর্তন হবে।

তথ্য প্রযুক্তির কারণে আজকে আর্থিক খাত কিন্তু শুধু বাংলাদেশে পড়ে নেই। সারা বিশ্বের সঙ্গে আমাদের কাজ করতে হয়। একসময় আন্তর্জাতিক কোনো রেটিং ছিলনা, বর্তমানে এটি করা হচ্ছ। ওইখানে ভালো রেটিং পেতে এই খাতের উন্নতির বিকল্প নেই। প্রতি বছর বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আমাদের একটি টানাপোড়ন চলে জিডিপির রেট কত? জিডিপির রেট নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে এই অবস্থা চললে মানুষ দ্বিধান্বিত হয়ে যায়।

অর্থসূচকঃ ফিনিক্স ফাইন্যান্সের অবস্থা সম্পর্কে একটু যদি বলতেন।

ইন্তেখাব আলমঃ আপনারা জানেন, ফিনিক্স ফাইন্যান্স বেশ পুরোনো একটি কোম্পানি। শুরু থেকেই আমরা একটু ধীরে কিন্তু টেকসই প্রবৃদ্ধি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।

বর্তমানে ফিনিক্স ফাইন্যান্সের পরিশোধিত মূলধন ১২১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। কোম্পানির বাজারমূলধন ৩৩৫ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে আমাদের রেভিনিউ ছিল ২৮৫ কোটি টাকা। আর নীট মুনাফা ছিল ২৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা। ফিনিক্স ফাইন্যান্স গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রতিবছর ২০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিয়ে আসছে।

Phoenix-Finance-MD-Intekhab-2

আমাদের  সম্পদের গুণগত মানও (Asset Quality) যথেষ্ট ভালো। খেলাপি ঋণের হার এই খাতের গড় হারের (Industry Average) অর্ধেকের চেয়েও কম। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাপি ঋণের গড় হার ছিল ৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। তার বিপরীতে ফিনিক্স ফাইন্যান্সে খেলাপি ঋণ ছিল ৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

অর্থসূচকঃ আপনাদের এই সাফল্যের পেছনে কী আছে?

ইন্তেখাব আলমঃ প্রথমত টিম ওয়ার্ক। দ্বিতীয়ত অদম্য চেষ্টা। আমার আগে একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। আমি দশ বছর ধরে আছি। আমি সব সময় টিমকে বলি, কোনো কাজে সফলতা আসতে পারে, আবার না-ও আসতে পারে। কিন্তু চেষ্টায় যাতে কোনো ত্রুটি না থাকে। সাফল্য না এলেও যাতে হতাশায় ভেঙ্গে না গিয়ে নতুন উদ্যমে আবার শুরু করা যায়।

আমি জানি, সবার যোগ্যতা সমান নয়। কিন্তু চেষ্টায় ত্রুটি রাখা যাবে না। চেষ্টা করেছে, সফল হতে পারে নাই কোনো অসুবিধা নেই। যেমন একটি ফুটবল টিমের ১১ জনের সবাই এক রকম খেলে না। ১১ জনের নিয়ে কাজ করতে গেলে ৩ জন এ্যাভারেজ, ৫ জন খুবই ভাল, বাকীরা মোটামুটি। তবে সবার চেষ্টায় একটি ভালো ফল আসে। এতোদিনের অভিজ্ঞতায় এটাই আমি শিখেছি। একা কাজ করে এখানে কেউ ভালো কিছু করতে পারবে না। এটি একটি টিম ওয়ার্ক, আমি সেটাই বিশ্বাস করি। কাজ করবে আর ফল আসবে না, এটি হতেই পারে না। আমি যদি ঠিকমত কাজ না করি, তাহলে আমার নিচের কর্মকর্তারা যতই ভালো কাজ করুক ফলাফল ভালো হবে না। কারণ সবাইকে ভালোভাবে কাজ করতে হবে।

অর্থসূচকঃ কেন আপনি আশাবাদী?

ইন্তেখাব আলমঃ আপনারা জানেন, আমাদের জনসংখ্যার বড় অংশই তরুণ, যাদের বয়স ২৫ থেকে ৩৫ এর মধ্যে। তাদের এখন অনেক কাজ করার সুযোগ আছে। তাদেরকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে ইনশাল্লাহ বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

তবে এর জন্যে সুষ্ঠু পরিকল্পনা দরকার। মনিটরিং দরকার। কারণ একটা খাত যদি অনেক ভালো করে আর বাকী সবগুলো খারাপ করে তাহলে এক পর্যায়ে ভালো ভালো খাতটিও পিছিয়ে পরবে। এই জন্য সব খাতগুলোতে সরকারের নজর দিতে হবে। যেমন গার্মেন্টস, রেমিটেন্স, আর্থিক খাত সব জায়গায় সরকারের হাত দেওয়া প্রয়োজন। গত ১০ বছর যাবত আমরা বলে আসছি, শুধু গার্মেন্টস খাতে নজর দিলে হবে না।

অন্যুদকে আমাদের জুট, চা বিশেষ করে শ্রমিকদের উন্নয়নের প্রয়োজন আছে। এই জায়গাগুলোতে কাজ করার অনেক সুযোগ আছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। এখানে ব্যাংকারদের সহযোগিতা করার অনেক  সুযোগ আছে।

এ দেশের উন্নয়নে প্রবাসী শ্রমিকদের অনেক অবদান রয়েছে। তারা খুব বেশি কষ্ট করে টাকা উপার্জন করে নিজে ভরপুট না খেয়ে দেশে পাঠায়। তারা তাদের উপার্জিত টাকার প্রায় সবটা দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। প্রবাসীদের জীবনমানের উন্নয়নে নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থসূচকঃ  ব্যাংকিং খাতে  আমানত ও ঋণ উভয়ের সুদের হার কমছে। ফলে আপনাদের কী ধরণের চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে?

ইন্তেখাব আলমঃ আগে আমানতের সুদের হার যেটা ছিল সেখানে কস্ট অব ফান্ড থেকে লেন্ডিং এর সাড়ে তিন থেকে ৫ শতাংশ গ্যাপ থাকত। এখন বাজারে অলস ফান্ড বেড়ে যাওয়া বা চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে ডিপোজিটের রেটও কমে গেছে। কারণ অর্থনীতির ভাষায় যোগান বেড়ে গেছে, চাহিদা কমে গেছে। এখানে যে সমস্যা হয়েছে যোগান অনেক বেশির ফলে লাভের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ঋণের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মুনাফাও বাড়বে।

অর্থসূচক: গত কয়েক বছরে এনবিএফআইয়ের সম্পদের গুণগত মান অনেক কমে গেছে। এখান থেকে উত্তরণের উপায় কী?

ইন্তেখাব আলমঃ এখান থেকে উত্তরণের জন্য দক্ষ জনবল নিতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। আমি যদি এভাবে বলি, একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ অনেক খেলাপী হয়ে গেছে, তাহলে সেখানে রিস্ট্রাকচারিং করতে হবে। তাহলে প্রথম কাজ হবে, ভালো জনবল নিয়োগ দেওয়া। যারা দক্ষতা ও সততার সঙ্গে পোর্টফোলিও ঠিক করতে পারবে।

দ্বিতীয়ত তাদেরকে প্রতিষ্ঠানের সুশাসনের জন্য গাইডলাইন অনুযায়ী পরিচালকদের সঙ্গে চলতে হবে। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হাতে সব ক্ষমতা দিয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি রেগুলেটর বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির গাইডলাইন পরিপালন করলে অনেক বেশি কঠিন হবে না। কারণ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এখানেই পার্থক্য মূলধন কমে গেলে সরকার বাজেট থেকে টাকা দিবে কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এই সুযোগ নেই। এক সময় তারা বন্ধ হয়ে যাবে। সেই উপায় না থাকলে রেগুলেটরদের গাইডলাইন পরিপালন করে সমস্যার সমাধান করতে হবে। যেগুলো খারাপ হয়ে গেছে, সেটি দিনে দিনে ভালো করা সম্ভব নয়। এটি তিন থেকে চার বছরের একটি পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। সে পরিকল্পনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের খুব কাছ থেকে মনিটরিং লাগবে। সেখানে ব্যবস্থপনা কর্তৃপক্ষে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ ও দক্ষ লোক নিতে হবে।

অর্থসূচক: ফিনিক্স নিয়ে আপনার

ইন্তেখাব আলমঃ আমি যখন ফিনিক্সে আসি, তখন আর্থিক খাত এতো উন্নত ছিল না। আমরা অনেক আইনের বাহিরে ছিলাম। আমি আশার আগে ঋণ সংক্রান্ত অনেক সার্কুলার ছিল না। এটি আস্তে আস্তে উন্নত হয়েছে। ব্যসেল-২ ছিলনা, এখন আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ব্যাংককের অনেক জিনিস আমাদের জন্য করা হচ্ছে। ফলে আমরা নিজেদের উন্নতি করছি। আস্তে আস্তে দক্ষতা আসবে।

আমি যখন আশি তখন চারটি শাখা ছিল। আর পোর্টফোলিওর আকার ছিল ৪০০ কোটি টাকার। এখন নয়টি শাখা করেছি কিন্তু পোর্টফোলিও ৩ হাজার কোটি টাকার মত হয়েছে। ওই দক্ষতা নিয়েই কিন্তু পোর্টফলিও চালিয়ে যাচ্ছি। আমি বলবো সফলতার শেষ নেই, আরও ভালো করার সুযোগ আছে। আমাদের সব ধরণের সংকেত ভালো। বাংলাদেশ ব্যাংক যে রেটিং করে সেখানে আমরা আমরা কখনো রেটে যায়নি, সব সময় ইওলোতে ছিলাম, চেষ্টা করছি গ্রীনে যাওয়ার। তবে গ্রীনে যাওয়া একটু কঠিন, কারণ পোর্টফলিও যত বড় হবে, গ্রীনে যাওয়ার সম্ভাবনা ততো কমে যাবে। এটাই নিয়ম। উনারা বিদেশী একটি মডেলের আদলে রেটিংটি করে। তবে এটির পরিবর্তন করা প্রয়োজন। এই মডেলে কারণে অনেক ভালো কোম্পানি গ্রীন হয়ে গেছে।

অর্থসূচক: ফিনিক্স ফাইন্যান্স ভালো প্রবৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকা কী?

ইন্তেখাব আলমঃ অনেকগুলো স্ট্যাটেজি কার করে। তার মধ্যে অন্যতম টিম বিল্ডিং। টিমটাকে যদি সত্যিকার অর্থে একটি কোণের মধ্যে নিয়ে আসতে পারি তাহলে ভালো ফলাফল আসবে। অর্থাৎ সবার সঙ্গে সবার একটি ভালো বুঝাশুনা থাকতে হবে, অন্যথায় নয়।

আরেকটি জিনিস যেটি চেষ্টা করেছি, সার্বাক্ষণিকভাবে কিভাবে আরও ভালো করা যায়। আমার ভালো করার ক্ষুধাটাই আজকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। অন্যটি হলো পরিচালনা পর্ষদের সহযোগীতা। পর্ষদ সব সময় বলে তুমি পাঁচ বছরের জন্য আসলেও দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করার মনমানুষিকতা থাকতে হবে। এটি তাদের স্ট্যাটেজি দীর্ঘ মেয়াদে চিন্তা করলে আমার অংশ গ্রহণ অনেক বাড়বে।

অর্থসূচক: রেভিনিউর ক্ষেত্রে কোন কোন পণ্যের অবদান বেশি?

ইন্তেখাব আলমঃ আমাদের আয় বেশি লোন থেকেই। তবে পুঁজিবাজারে আমাদের যে বিনিয়োগ সেখান থেকেও ভালো আয় হয়। পুঁজিবাজারে লেনদেন করে ভালো আয় আনা জায় না। অনেক দিনের জন্য বিনিয়োগ করতে হয়।

আরেকটি অনুধাবন এখানে কাজ করে লিজিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গেলে বুঝি ২ শতাংশ বেশি সুদ দিয়ে লোন নিতে হয়। এগুলো এখন পরিবর্তন হয়েছে। এখন আমাদের পুরোপুরি ব্যাংককের সঙ্গে প্রতিযোগীতা করতে হয়। এটি হওয়া উচিত ছিলনা। যদি পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট ভালো থাকতো তাহলে এটি হোত না।

অর্থসূচক: আগামী দিনে পণ্যের বহুমূখীকরণ করার চিন্তা আছে?

ইন্তেখাব আলমঃ পণ্যের বহুমূখীকরণ করা খুবই কঠিন। এটি সত্যিকার অর্থে নির্ভর করে বাজারের উপর। আমাদের আর্থিক বাজারে গ্রাহক ও কর্পোরেটদের ব্যবহারে তেমন পরিবর্তন হয়নি। এগুলো পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পণ্যে বহুমূখীকরণ হবে। তবে নতুন কিছু আনার জন্য আমরা চেষ্টা করছি।

অর্থসূচক: অন্য অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে অনেক বেশি সম্পৃক্ত, আপনাদের এমন কোনো পরিকল্পনা আছে?

ইন্তেখাব আলমঃ সে ধরণের পরিকল্পনা এক সময় ছিল। আমাদের একটি ব্রোকারেজ হাউজ আছে ,সেখানে ২৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে ফিনিক্স ফাইন্যান্সের। আমাদের মার্চেন্ট ব্যাংক নেই। তবে এর একটি আবেদন বিএসইসিতে জমা আছে। বিএসইসি বলেছে, যখন লাইসেন্স দিবে, তখন আমরাও পাবো। ওটা করতে পারলে আর আমি ফিনিক্সে থাকলে সিকিউরিটিজ হাউজের বাকী ৭৫ শতাংশ শেয়ার আমাদের নামে নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবো।

অর্থসূচক: আপনাদের গভর্ন্যন্সের মান কেমন?

ইন্তেখাব আলমঃ অনেক ভালো। কোম্পানির দৈনন্দিন কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচালকদের কোনো ধরণের সম্পৃক্ততা নেই। যারাই আমাদের চেয়ারম্যান থাকেন তারা পর্ষদ সভা বাদে কখনো অফিসে আসেন না। একটি প্রতিষ্ঠানের ভালোর জন্য এটি অনেক বড় জিনিস। অবশ্য এটি আমাকে অর্জন করে নিতে হয়েছে। এখন পর্যন্দ আমাদের পর্ষদ কোনো ঋণ বা লিজিং এর জন্যে কোনো চাপ দেয়নি। বরং কোনো লোন দেওয়ার সময় তারা সব সময় বলে বার বার দেখে নাও।