বর্ষাকালের রোগবালাই ও স্বাস্থ্য সচেতনতা

অর্থসূচক ডেস্ক

0
216

বৃষ্টি ও বর্ষাকাল কিছু ক্ষেত্রে বেশ আবেগময়। বিশেষ করে আমাদের ক্ষেত্রে গান, কবিতা আর সুরের এক অদ্ভুত মিশেল হয়ে আছে জীবনে। মেঘলা আবহাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই হয়তো মন গেয়ে ওঠে, “আজি ঝর ঝর মুখর বাদল দিনে…”

আর আবেগময় এই বর্ষাকাল বিভিন্ন রোগের বিস্তারের জন্যও বেশ দায়ী। এ সময় হঠাৎ হঠাৎ টানা বৃষ্টি থাকে আবার কখনো থেমে থেমে ঝিরঝির বৃষ্টিও হয়। এ সময় স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ব্যাকটেরিয়া-ভাইরাসের কারণে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। আর জ্বর, সর্দি, কাশি প্রভৃতি নানা রোগ হরহামেশাই লেগে থাকে। তবে এগুলোর পাশাপাশি পানি বাহিত রোগ বেশি হয়ে থাকে, যেমন- কলেরা, টাইফয়েড, ডায়রিয়া ইত্যাদি হয়ে থাকে।

বর্ষাকালে হিপোথার্মিয়া, চোখের সংক্রমণ, শ্বাস প্রশ্বাসের স্থানান্তর সংক্রমণ, লেপটোপিয়েরোসিস পানি, শ্বাস প্রশ্বাসের সংক্রমণ ইত্যাদি হতে পারে। আবার যাদের হাঁপানির সমস্যা আছে তাদের জন্যও বেশ ভোগান্তির। ভাইরাল ইনফেকশন, ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন, বা পরজীবী প্রাদুর্ভাব থেকে ডায়রিয়ার মত জীবাণুগুলো সাধারণত দূষিত খাদ্য বা পানি, দূষিত বস্তু বা হাত ইত্যাদির মাধ্যমে বৃহদান্ত্রতে পৌঁছায়। ক্ষেত্র বিশেষে কিডনির সমস্যাও সৃষ্টি করতে পারে।

তবে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করলে এর থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব-

বৃষ্টিতে অনেকের চোখ লাল হয়ে যায়, পানি পড়ে ও চুলকানি কিংবা ব্যথা হতে পারে।

চোখের সংক্রমণ

বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে কিংবা আর্দ্র আবহাওয়ায় অনেকেরই চোখে সংক্রমণ হয়। এতে চোখ লাল হয়ে যায়, পানি পড়ে ও চুলকানি কিংবা ব্যথা হতে পারে। মূলত ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এমনটা হয়। এছাড়া অস্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তিও ঝাপসা হয়ে যেতে পারে। এ সমস্যা দেখা দিলে পরিষ্কার টিস্যু পেপার দিয়ে চোখ মুছে নিন। নিয়মিত হাত ধুয়ে পরিস্কার রাখুন। চোখের সংক্রমণ সাধারণত দুই থেকে তিন দিন পর এমনিতেই সেরে যায়। এ সমস্যায় দিনে তিন থেকে চারবার হালকা গরম কাপড় দিয়ে ৫ থেকে ১০ মিনিট চোখে সেঁক দিলে উপকার পাওয়া যাবে।

ডায়রিয়া হলে

খাওয়ার আগে হাত ঠিকমতো ধুয়ে না নিলে, থালাবাসন অপরিষ্কার থাকলে, নোংরা পরিবেশে খাবার সংরক্ষণ করলে কিংবা পচা-বাসি খাবার খেলে, কিংবা পানের পানিতে ময়লা/জীবাণু মিশ্রিত থাকলে ডায়রিয়া হতে পারে। ডায়রিয়া হলে খাবার স্যালাইন ও প্রচুর জলীয় উপাদান পান করুন।

ম্যালেরিয়া হলে

শিশুরা ম্যালেরিয়ায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। মশার কামড়ে সাধারণত ম্যালেরিয়া ছড়ায়। মশা প্রতিরোধে বাড়িতে ও বাড়ির আশপাশে যেন মশা জন্মবিস্তার করতে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া মশারি ব্যবহার করতে হবে এবং অন্য সব উপায়ে মশা থেকে নিরাপদ থাকতে হবে।

শ্বাসনালী সংক্রমণে হঠাৎই কাশি হতে পারে।

শ্বাসনালির সংক্রমণ

শ্বাস-প্রশ্বাসনালির সংক্রমণ থেকে সাধারণ ঠাণ্ডা লাগে। এতে সর্দি-কাশি কিংবা এ ধরনের কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়। চিকিৎসকরা জানান, সাধারণ এ সমস্যাগুলো অনেক সময় বড় সমস্যা ডেকে আনে। প্রচুর পানি পান করা, তাজা ফলমূল ও জুস খাওয়া এ সমস্যা মোকাবিলা করতে সহায়ক। অনেকেই হালকা গরম পানিতে লেবুর রস মিশিয়ে পান করলে উপকার পাবেন। এ সময় অ্যালকোহল ও চা-কফির ক্যাফেইন একেবারেই এড়িয়ে চলুন। গলায় ব্যথা হলে হালকা গরম পানিতে সামান্য লবণ মিশিয়ে গার্গল করলে উপকার পাবেন।

ত্বকের সংক্রমণ
বর্ষায় ত্বকে নানা ধরনের সংক্রমণ হতে পারে। এসবের মধ্যে দাঁদ, খোসপাঁচড়া ইত্যাদি অন্যতম। সংক্রমিত ব্যক্তি কিংবা পোষা প্রাণীর সংস্পর্শ থেকেও এতে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আক্রান্ত হলে ত্বক ঠাণ্ডা ও শুষ্ক রাখতে হবে। এছাড়া নিয়মিত হাত ধোয়াও গুরুত্বপূর্ণ। আপনার ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসপত্র, যেমন : ব্রাশ, গামছা, রেজর ও পোশাক অন্যদের থেকে দূরে রাখুন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

বর্ষায় স্বাস্থ্য সুরক্ষায় করতে পারেন আরও নানা কাজ-

১. আপনার ঘরের কাছাকাছি পানি, ফুলের পাত্র, কুলার ইত্যাদি পানি নিঃসরণ প্রতিরোধ করুন। যেমন কূপ এবং স্টোরেজ ট্যাংকের পানির উৎসগুলি আচ্ছাদিত করা উচিত এবং মশার প্রজনন প্রতিরোধ করতে এবং মশারি বহন করে রোগ প্রতিরোধ করা উচিত। পোকামাকড় প্রতিরোধক ব্যবহার করুন এবং মশা, মাছি থেকে দূরে থাকার জন্য সতর্কতা গ্রহণ করুন।

২. বাড়ি থেকে বের হলে অবশ্যই ছাতা এবং রেইনকোট সঙ্গে নিয়ে বের হবেন।

৩. বাইরে বের হলে ব্যাগে আর একটি শুকনো পোশাক রাখুন। ভেজা পোশাক খুলে রেখে শুকনো পোশাক পরুন।

Rain Bangla motore
কাজ থাকলে বৃষ্টির দিনেও বের হতে হবে, তাই ছাতাসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সঙ্গে রাখুন। ছবি মহুবার রহমান।

৪. এ সময় শাক সবজি ভালো করে শুকিয়ে পরিষ্কার করুন, যা জীবাণু পরিত্রাণ করবে। প্রায় ১০ মিনিটের জন্য লবণের পানিতে সবুজ শাক ভিজিয়ে নিন। এ দ্রবণ জীবাণু অপসারণ করতে সাহায্য করে এবং পরে  সেগুলি রান্না রান্না করা ভাল।

৫. বর্ষার সময়, পায়ের পাতায় আটকানো পানিতে নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে তাই পায়ের পাতা বা স্যান্ডেল যেন ভেজা না থাকে সেদিকে বিশেষ মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

৬. চামড়া বা নখের ফুসকুড়ি সংক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য লম্বা পোশাক পরবেন না।

৭. খাবার খেয়ে বা খাবার আগে এবং টয়লেট করার পর হাত ধুয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে।

৮. যদি সম্ভব হয় তাহলে বৃষ্টির মধ্যে মোটরসাইকেটিং এড়িয়ে চলুন।

৯. বৃষ্টি-বাদলার দিনে শারীরিক ইমিউনিটি কমে যায়। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ খাবার খান।

১০. বৃষ্টিতে ভিজলে বাড়ি ফিরে অবশ্যই গোসল করে নেবেন।

১১. গরম খাবার-দাবার খান।

১২. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন। বর্ষায় পরিষ্কার থাকা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এতে শরীরে ভাইরাস বাসা বাঁধতে পারবে না।

১৩. বিশুদ্ধ জপানি পান করুন। বর্ষায় পানি পানের ইচ্ছে কম থাকলেও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বেশি করে পানি পান করা উচিত।

১৪. পুষ্টিসমৃদ্ধ বাড়ির খাবার খান। তেল-মশলাদার খাবার বেশি না খাওয়াই ভাল। এতে সুস্থতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ফ্লু থেকেও বাঁচবেন।

তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টাইমস ডট কম ও হিন্দুস্তান টাইমস

অর্থসূচক/ টি এম/কে এম