‘ফূর্তির জন্য বিশেষ কক্ষ আছে ইভানের’

মুন্নাফ রশিদ

0
61
বনানী ২ নম্বর রোডের ৫/এ ‘ন্যাম ভিলেজ’

জন্মদিনের দাওয়াত দিয়ে তরুণীকে বাসায় এনে ধর্ষণের অভিযোগে রাজধানীর বনানী থানায় করা ধর্ষণ মামলার আসামি বাহাউদ্দীন ইভান উশৃঙ্খল জীবন-জাপন করতেন বলে জানা গেছে। এছাড়া যে বাসায় এ ঘটনা ঘটে তার পাশেই টিনশেডের একটি বাসায় তার ফূর্তির জন্য বিশেষ কক্ষ আছে; যেখানে তিনি নেশাসহ বিভিন্ন অবৈধ কাজ করতেন বলে স্থানীয়রা বলাবলি করছে।

আজ বৃহস্পতিবার ইভানদের বাড়ির আশপাশের লোকজন তার সম্পর্কে এসব মন্তব্য করেন।

বনানী ২ নম্বর রোডের ৫/এ ‘ন্যাম ভিলেজ’

বনানী ২ নম্বর রোডের ৫/এ ‘ন্যাম ভিলেজ’ সামনে গেলে দেখা যায়, বাড়িটির পাশে একটি ভ্যারাইটিজ দোকান রয়েছে। সেখানে বসে আছে এলাকার স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। তাদের মধ্যে একজন অর্থসূচককে বলেন, ইভান আগে থেকেই উশৃঙ্খল।

বনানীর ‘ন্যাম ভিলেজ’ নামের যে বাসাটিতে এই ঘটনা ঘটেছে সেটি ৬ তলা বিশিষ্ট।  জানা গেছে, এর পাশেই ইভানদের একটি টিনশেডের বাসা আছে। যেখানে ইভানের একটি ব্যক্তিগত কক্ষ রয়েছে।

স্থানীয় ওই ব্যক্তি বলেন, ইভানরা এই এলাকায় প্রায় ১৮ থেকে ২০ বছর যাবৎ বসবাস করছে। এলাকায় নেশাখোর হিসেবে পরিচিত ইভান। সে ওই বাসায় নেশাসহ বিভিন্ন অবৈধ কাজ করতো।

স্থানীয় আরও একজন একই কথা শোনালেন।

পরে ওই বাড়িটির ম্যানেজার শওকত আকবরের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে আরও অনেক তথ্য। তিনি অর্থসূচককে বলেন, জানি একটি টিনশেড বাসা আছে; সেখানে ইভান যাওয়া আসাও করে। তবে সেখানে প্রকৃতপক্ষে কি করে তা আমার জানা নেই।

শওকত আকবর বলেন, ইভানরা ৩ ভাই। বাবা বোরহান উদ্দিন বেলালসহ মা, ছোট ভাই রবিন (১২), স্ত্রী, এক ছেলে (৭) ও এক মেয়েসহ (৩) তারা এ বাসায় থাকেন। তার আরেক ভাই থাকেন উত্তরায়। ঘটনার দিন রাতে ইভানের ছোট ভাই ও মা ছাড়া আর কেউ বাসায় ছিলেন না।

 

Evan-690x450 (1)
ধর্ষণ মামলার আসামী ইভান

তিনি বলেন, ইভানের স্ত্রী বর্তমানে বাবার বাড়ি রয়েছেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগে ইভানের সঙ্গে তার স্ত্রীর ঝগড়া হয়। ফলে ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে তিনি বাবার বাড়ি চলে গেছেন।

‘ঘটনার দিন রাত ১২টার দিকে ওই মেয়েকে (ধর্ষণের অভিযোগ আনা তরুণী) নিয়ে ইভান বাড়ি আসে। পরে রাত ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে মেয়েটিকে বের করে দেয়। প্রথমে মেয়েটি বের হতে রাজি হচ্ছিল না; পরে তাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় ইভান’ বলেন শওকত আকবর।

ম্যানেজার বলেন, সকাল ৭টার দিকে মেয়েকে নিয়ে বাসায় আসে পুলিশ। তখন ইভান বাসায় ছিল না। খবর শুনে বোরহান উদ্দিন বেলাল (ইভানের বাবা) বাসায় আসেন। এরপর পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে এসে বাড়ি থেকে পরিবারসহ চলে যান। তবে কোথায় গেছেন সেটা বলে যাননি।

ন্যাম ভিলেজের নীচে ম্যানেজারের সঙ্গে আলাপকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ৪ সদস্যের একটি দল বাসাটিতে ঢোকে। পরে ডিবি পুলিশেল গুলশান বিভাগের সিনিয়র জয়েন্ট কমিশনার রাসেল সাংবাদিকদের বলেন, আমরা এখানে তল্লাশী এবং জিজ্ঞাসার জন্য এসেছিলাম। এসে দেখি ঘরে তালা ঝুলছে। কাউকে না পেয়ে আমরা এখন চলে যাচ্ছি।

এদিকে আজ দুপুরে ধর্ষণের শিকার হওয়া ওই তরুণীর ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহামুদ। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত পাঁচ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড ওই তরুণীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করেন।

পরীক্ষা শেষে ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, ধর্ষণের শিকার ওই তরুণীর বেশ কয়েকটি শারীরিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। বয়স নির্ধারণের জন্য এক্সরে এবং ধর্ষণের আগে তাকে নেশাজাতীয় ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল কি-না সেজন্য ব্লাড ও ইউরিন সংগ্রহ করে মহাখালীতে অবস্থিত রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া তার ডিএনএ পরীক্ষার জন্য হাইঢেজোনাল সফট সংগ্রহ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ৩-৪ সপ্তাহের মধ্যে আমরা রিপোর্টগুলো হাতে পাবো।

তরুণীর শরীরে ধর্ষণ সংশ্লিষ্ট নির্যাতনের কোনও চিহ্ন রয়েছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, মেয়েটি আমাদেরকে ফিজিক্যাল অ্যাসল্টের কথা বলেনি। আমরা তার শরীরেও এমন কিছু পাইনি। তার শরীরে আঘাতের কোনও চিহ্ন নেই।

এদিকে মামলার আসামি বাহাউদ্দীন ইভানকে পুলিশ, র‍্যাবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা খুঁজছেন বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বনানী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সুলতানা আক্তার।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করেছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। প্রাথমিক তদন্তে তারা ইভানের নাম, পরিচয় ও ঠিকানা পেয়েছেন। ইভানের বাসায় অভিযান চালিয়েছে। তবে তাকে সেখানে পাওয়া যায়নি। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

মামলা সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (৪ জুলাই) রাতে বনানীর ২ নম্বর সড়কে ন্যাম ফ্ল্যাটের বাসায় জন্মদিনের কথা বলে এক তরুণীকে ডেকে আনে ইভান। এরপর ওই তরুণীকে ধর্ষণের পর গভীর রাতে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। ইভানের বিরুদ্ধে  এসব  অভিযোগ এনে বনানী থানায় মামলা দায়ের করেন ওই তরুণী। ইভান শিল্পপতি বোরহান উদ্দিনের ছেলে। তিনি বিবাহিত। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

উল্লেখ, এর আগেও জন্মদিনে ডেকে নিয়ে বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই তরুণী ধর্ষণের শিকার হন বলে অভিযোগ আছে। এ ঘটনায় আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গত ৬ মে বনানী থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

অর্থসূচক/মুন্নাফ/এস