প্রবাসী আয় কমার ৫ কারণ!

মেহেদী হাসান

0
101
Dollar
ডলার।

প্রবাসী আয়ের নিম্নমুখী প্রবণতা কাটছেই না। নানামুখী উদ্যোগের পরও গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রবাসী আয় কমেছে সাড়ে ১৪ শতাংশ। গত ৫ বছরে এটিই সর্বনিম্ন প্রবাসী আয়। যা উদ্বিগ্ন করছে সরকার, অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের। প্রবাসী আয় কমার পেছনে ৫টি কারণ দাঁড় করিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ডলারের সঙ্গে বেশকিছু দেশের স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জ্বালানি তেলের দরপতন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিদেশে স্থায়ী হওয়া, সৌদি আরবে আকামা (বসবাসকারী পরিচয়) সংক্রান্ত খরচ এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অপব্যবহারের কারণেই প্রবাসী আয় কমছে।

Dollar-39781
ডলার।

ডলারের সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন:

ডলারের হিসাবে রেমিট্যান্স প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য যে সব দেশ থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আসে- সে সব দেশের স্থানীয় মুদ্রা ডলারের তুলনায় অবমূল্যায়ন হয়েছে। ফলে প্রবাসী আয় কমছে।

জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়ার ধাক্কা:

আরব দেশগুলোর অর্থনীতি জ্বালানি তেলের ব্যবসা নির্ভর। এসব দেশগুলোতে জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়ার ধাক্কাও আছে প্রবাসী আয়ে। সেখানে জ্বালানি তেলের দাম কমায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে এসেছে। ফলে শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও নতুন নিয়োগও বন্ধ রয়েছে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিদেশে স্থায়ী বসবাস:

এক সময় প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিদেশে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তবে এখন তাদের অনেকেই সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করেছেন। ব্যবসা করতে গিয়ে তারা সেখানে বিনিয়োগ করছেন। কোনো কোনো দেশে নিয়মের আওতায় সেদেশের নাগরিকদের ব্যবসায় অংশীদার হিসেবে রাখতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে তাদেরকে একটু ছাড় দিতেও হচ্ছে। এসব ব্যবসায়ীরা পরিবার নিয়ে ওই দেশগুলোতে স্থায়ী বসবাস করছেন। ফলে দেশে অর্থ পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা হারাচ্ছে।

আকামা (বসবাসকারী পরিচয়) সংক্রান্ত খরচ:

কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে নতুন লোক নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে সৌদি আরবে আকামার একটা সুযোগ রয়েছে। এই আকামার কাগজ বের করার জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অপব্যবহার:

মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অপব্যবহারের কারণে অবৈধ পথে দেশে টাকা আসছে। বেশ কয়েকটি দেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নামে ভুয়া এজেন্ট সেজে এদেশের এক ধরনের  অসাধু এজেন্টের কাছে তথ্য দিয়ে ক্যাশ ইন করে টাকা পাঠানো হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা দেশে অর্থ পাঠালেও তা রেমিট্যান্স হিসেবে যোগ হচ্ছে না।

এসব কারণ সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স অনেক কমেছে। তবে এই কমে যাওয়া রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত জুনে রেমিট্যান্স সেবার মান বাড়াতে দেশের ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে ৫টি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেগুলো হলো- প্রতিটি শাখায় রেমিট্যান্স হেল্প ডেস্ক চালু করা; প্রবাস আয়ের বেনিফিসিয়ারিকে (উপকারভোগী) অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রেমিট্যান্স সংক্রান্ত তথ্য প্রদান নিশ্চিত  করা; গ্রাহক হয়রানি রোধে প্রতিটি শাখায় প্রবাসী বা প্রবাস আয়ের বেনিফিসিয়াশিদের জন্য আলাদা খাতায় ক্রমানুসারে অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা; পাক্ষিক ভিত্তিতে অভিযোগুলো সংশ্লিষ্ট  ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগকে জানানো এবং প্রবাসীদের জন্য ব্যাংকের নিজস্ব ও সরকারের সব ধরনের বিনিয়োগ সেবার প্রচার করা ও বৈধ পথে রেমিট্যান্স নেওয়ার সুবিধা প্রচার করা।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহ অর্থসূচককে বলেন, রেমিট্যান্স বাড়াতে আমরা বেশ কিছুদিন ধরে নানা উদ্যোগ নিয়ে আসছি। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অপব্যবহার রোধে বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকটি প্রোভাইডারকে দিয়ে এই বিষয়ে সতর্ক হতে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। আমাদের দূতাবাসকে দিয়ে কাজ করাচ্ছি। বিদেশি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাহায্য নিয়ে অবৈধ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, কয়েকটি দেশে অবৈধ হুন্ডি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। প্রবাসী আয় বিতরণের সঙ্গে যুক্ত দেশের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের কিছু এজেন্টের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে। আমরা প্রোভাইডারদেরকেও সতর্ক করেছি। ব্যাংকগুলোকে তাদের সার্ভিলেন্স বাড়ানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছি। আমরাও পরিদর্শন করছি।

শুভঙ্কর সাহা বলেন, জনসচেতনতা তৈরিতে বিকাশসহ অন্যান্য মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলোও কাজ করেছে। সরকারও এক্ষেত্রে কাজ করছে। রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের যে খরচ হচ্ছে- সেটাতে সাবসিডি দেওয়ার চিন্তা করছে সরকার। এই বিষয়ে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে মতামত চেয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের মে মাসে প্রবাসীরা ১২৬ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। যা গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে জুন মাসে প্রবাসী আয় আসে মাত্র ১২১ কোটি ডলার। ২০১৫-১৬ গত অর্থবছরের জুন মাসে ১৪৬ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল।

অর্থসূচক/মেহেদী/এমই/