বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন কার্যকরী আইন আর জন সচেতনতা

0
96
বাংলাদেশ গ্রাম প্রধান দেশ হলেও নগর সভ্যতার ক্রমবিকাশের কারনে মানুষের শহরমুখিতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে । চাকুরী , ব্যবসা – বাণিজ্য ,চিকিৎসা ,  উচ্চতর পড়াশোনা সহ জীবন জীবিকার যাবতীয়  সুযোগ সুবিধা  গ্রামের তুলনায় শহরে অনেক বেশী থাকে বিধায় মানুষ ভাগ্যান্বেষণে শহর পানে ছুটছে । কিন্তু শহরে জনসংখ্যার অনুপাতে পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা বিদ্যমান নেই । এ কারনে জীবিকার তাগিদে শহরে আসা এই মানুষগুলি ভয়াবহ রকম আবাসন সংকটে পড়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে । কোন রকম মাথা গোঁজার ঠাই জোগাড় করতেই তাদের আয়ের সিংহ ভাগ পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে ।
সাধারন মানুষের এ অসহায়ত্বের সুযোগে শহরের অধিকাংশ বাড়ীওয়ালা বাড়িভাড়ার নামে জমজমাট ব্যবসা খুলে বসেছেন । তারা কোন আইন – কানুন , নিয়ম – নীতির তোয়াক্কা না করে সব সময় বাড়িভাড়া বাড়ানোর অজুহাত খুঁজে বেড়ান । প্রতি বছরের শুরুতে কোন কারন ব্যতিরেকেই বাড়িওয়ালারা  বাড়ি ভাড়া বাড়িয়ে দেন । বাড়িভাড়া ব্রিদ্বি নিয়ে বাড়ীওয়ালা – ভাড়াটিয়া দ্বন্দ্ব এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাড়িভাড়া নির্ধারণে সময়োপযোগী এবং কার্যকরী আইনের অভাবে এ নাগরিক সমস্যাটি দিন দিন আরও প্রকট আকার ধারণ করছে ।
বাড়িভাড়া সংক্রান্ত আইন – ফিরে দেখা
মূলত বাড়ি ভাড়া-সংক্রান্ত আইন আমাদের দেশে কখনোই ভালো করে তৈরি হয়নি। দেশ বিভাগের আগে থেকেই বাড়িভাড়া আদেশ যেটা জারি করা হয়েছিল সেটাই চলেছে ‘৬১ সাল পর্যন্ত। ‘৬৩ সালে বাড়িভাড়া আইন প্রণীত হয়এবং তা চলতে থাকে স্বাধীনতার পরেও । ১৯৯১ সালে চলে আসা এই বাড়িভাড়া অধ্যাদেশের সব বিধান অপরিবর্তিত রেখে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ নতুনভাবে জারি করা হয় এবং সেই বছরে অধ্যাদেশটি জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার পর মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভে পূর্ণাঙ্গ আইনের মর্যাদা লাভ করে, যা বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন – ১৯৯১ নামে পরিচিত।অদ্যাবধি এ আইন কাগজে কলমে প্রচলিত থাকলেও ধূমপান বিরোধী আইন , মোবাইল ফোনে আপত্তিকর ছবি ধারন বা ম্যাসেজ প্রেরণ বিরোধী আইন ,  ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ইত্যাদির মত এরও  কোন কার্যকারিতা নেই । এডভোকেট মনজিল মোরশেদ  বাড়িভাড়া সংক্রান্ত আইন সংশোধন ও বাস্তবায়নের জন্য আদালতে মামলা করেছেন । মামলার চূড়ান্ত রায় এখনও হয়নি ।
বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন – ১৯৯১ এর টুকিটাকি
•    এ আইন অনুযায়ী বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রক সিটি কর্পোরেশনের রেন্ট কন্ট্রোলার গন । মালিক ও ভাড়াটিয়ারা মিলে মান সম্মত ভাড়া নির্ধারণের কথা এ আইনে বলা হলেও এর জন্য কতগুলি মান ঠিক করে দেয়া আছে যা বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় ।
•    বাড়িওয়ালা কর্তৃক প্রতি মাসে ভাড়াটিয়াকে বাড়িভাড়ার রশিদ দেয়ার বিধান এ আইনে বলা আছে ।
•    বাড়িভাড়ার পূর্বে বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটিয়া লিখিত চুক্তি করবেন । চুক্তিতে কখন কিভাবে ভাড়া বাড়ানো হবে তা বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে । এ আইন অনুযায়ী যখন তখন ভাড়াটিয়া কে বাসা খালি করার নোটিশ দেয়ার এখতিয়ার বাড়িওয়ালার নেই ।
•    এ আইনে দুই মাসের বেশী ভাড়া অগ্রিম নেয়া যাবেনা উল্লেখ রয়েছে ।
•    ভাড়াটিয়ার  জন্য  বিদ্যুতের আলাদা মিটার বসানো এবং প্রতি মাসে গ্যাস , বিদ্যুৎ এবং পানির বিলের কপি ভাড়াটিয়া কে সরবরাহ করার কথা এ আইনে বলা হয়েছে ।
বাড়িভাড়া সংক্রান্ত জটিলতা – বাড়িওয়ালা বনাম ভাড়াটিয়া
প্রচলিত আইনের দুর্বলতা এবং  এতে যথাযথ দিক নির্দেশনা না থাকায় বাড়িওয়ালা বনাম ভাড়াটিয়া দ্বন্দ্বের অবসান হচ্ছেনা ।এ ক্ষেত্রে অধিকাংশ বাড়িওয়ালা থাকেন নিপীড়কের ভুমিকায় আর ভাড়াটিয়া হন নির্যাতিত । তবে নিরপেক্ষ ভাবে দুই পক্ষের মতামত যদি নেয়া হয় তবে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায় ।
বাড়িওয়ালার অভিযোগ
•    ভাড়াটিয়া মাস শেষে বাড়িভাড়া দিতে গড়িমসি করেন ।
•     পানি , গ্যাস , বিদ্যুৎ ইত্যাদির অপচয় করেন ।
•    অনেক ভাড়াটিয়া বেশি রাত করে বাড়ি ফেরেন, গেট বন্ধ পেয়ে ধাক্কাধাক্কি করে বাকিদের ঘুম হারাম করেন।
•    স্থাপনার কোন যত্ন আত্তি করেননা । সরকারী সম্পত্তির মত অবহেলা করে দেয়াল , গ্লাস , ফ্লোর , বেসিন , শাওয়ার , কমোড ইত্যাদি ভেঙ্গে নষ্ট করেন ।
•    বাড়িভাড়া নেয়ার সময় ভাড়াটিয়া তথ্য গোপন করেন । বাড়িওয়ালার নিজ নিরাপত্তার স্বার্থে কাকে বাড়ি ভাড়া দিচ্ছেন তা যাচাই করা অবশ্যই জরুরি বিষয় কিন্তু  অধিকাংশ ভাড়াটিয়া  এটা ভালো চোখে দেখেন না ।
•    ভাড়াটিয়ার বাসায় অত্যধিক মেহমান তথা  অযাচিত আগুন্তুকের আনাগোনা ।
•    ভাড়াটিয়া সব সময় এটা নষ্ট ওটা নষ্ট বলে ঘন ঘন অভিযোগ  করে ।
•    সরকার তেল , গ্যাস , বিদ্যুৎ সহ নিত্ত প্রয়োজনীয়  দ্রব্য সামগ্রীর দাম বাড়ায় বলে বাড়িভাড়া বাড়াতে হয় , কিন্তু ভাড়াটিয়ারা এটা মানতে চান না ।
ভাড়াটিয়ার অভিযোগ  
•    বাড়িওয়ালা সব সময় বাড়ি ভাড়া বাড়ানোর পাঁয়তারা করেন ।
•    কথায় কথায় বাসা খালি করার হুমকি ধামকি দেন ।
•    ভাড়াটিয়ার সাথে খারাপ ব্যবহার করেন ।
•    বাড়িওয়ালার মধ্যে সেবার মানসিকতার পরিবর্তে অহংবোধ কাজ করে । ফলে নিজেকে তিনি জমিদার মনে করেন এবং ভাড়াটিয়া কে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে চান না ।
•    পানি , বিদ্যুৎ ,গ্যাস ইত্যাদির মুল বিলের কপি ভাড়াটিয়াকে না দিয়ে হাতে লেখা ভূতুড়ে বিল ধরিয়ে দেয়া হয় ।
•    ইচ্ছে করে পানির প্রবাহ স্লো করে রাখা হয় যাতে ভাড়াটিয়া অতিরিক্ত পানি খরচ করতে না পারে ।
•    ভাড়াটিয়াদের ছাদে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়না । সব সময় ছাদ তালাবদ্ব করে রাখা হয় । মন চাইলেও শেষ  বিকেলে ছাদের মুক্ত হাওয়া খাওয়ার সখ ভাড়াটিয়ার অপূর্ণই থেকে যায় ।
•    ব্যাচেলরদের বাড়িওয়ালা বাড়িভাড়া দিতে চান না । তাই সামর্থ্য থাকলেও বাড়িা ভাড়া না পেয়ে অনেককে মেসের জীবন বেছে নিতে হয় ।(সম্প্রতি ফেসবুকে একটা মজার পোষ্ট দেখলাম যা পড়ে ব্যাচেলার দের মর্মবেদনা সহজে অনুধাবন করা যায় । পোষ্ট টি হল – “ যে বাড়িওয়ালা ব্যাচেলারদের বাড়ি ভাড়া দেয়না , তার মেয়ের বিবাহ যেন ব্যাচেলারের সাথে না হয়” ব্যাচেলার হয়ে বাড়িভাড়া পাওয়াটা আজকাল বিরাট ভাগ্যের ব্যাপার।
•     বাড়িওয়ালা নানা রকম নিয়ম কানুনের বেড়াজালে ভাড়াটিয়া কে জড়িয়ে ফেলেন । অনন্যোপায় হয়ে ভাড়াটিয়া তখন বাড়িওয়ালার অনেক অন্যায় আবদার মেনে নিতে বাধ্য হন ।
কিছু প্রস্তাবনা
বাড়িভাড়া সংক্রান্ত এ নাগরিক সমস্যা সমাধানে বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটিয়া উভয়কেই সচেতন এবং আন্তরিক হতে হবে । পারস্পরিক দোষারোপে কল্যাণ কর কোন ফলাফল বয়ে আনেনা । তাই বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষকে সমঝোতায় আসতে হবে । আশার কথা হল,  শহরে এখন বাড়ি মালিক কল্যাণ সমিতির পাশাপাশি ভাড়াটিয়া কল্যাণ সমিতি ও গঠিত হচ্ছে । এখন দুই পক্ষের মধ্যে কার্যকরী সমন্বয় সাধন করা গেলে সমস্যার একটা গ্রহন যোগ্য সমাধান অবশ্যই সম্ভব । সম্ভাব্য কিছু প্রস্তাবনা নিম্নে উল্লেখ করা হল ঃ
•      এ সমস্যা নিরসনে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে । বাড়িভাড়া সংক্রান্ত আইন এর প্রয়োজনীয় সংশোধন , পরিবর্ধন ও পরিমার্জন পূর্বক একটি যুগোপযোগী এবং কার্যকরী আইন প্রণয়ন করতে হবে যাতে বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটিয়া উভয়েরই স্বার্থ রক্ষা হয় ।
•     বাড়িভাড়া নির্ধারণের বিষয়টি সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্তনালয়ের আওতা ভুক্ত করে বিষয়টি মন্তনালয়ের তদারকিতে অথবা সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার মাধ্যমে সুরাহা করা যেতে পারে । এ জন্য  সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভায় পর্যাপ্ত সংখ্যক রেন্ট কন্ট্রোলার নিয়োগ করতে হবে ।
•      প্রতিটি এলাকার জীবন যাত্রার মান এবং আনুসঙ্গিক  সুযোগ সুবিধা  প্রাপ্যতার উপর ভিত্তি করে সরকারের দায়িত্ব প্রাপ্ত মন্ত্রনালায় /সিটি কর্পোরেশন / পৌরসভা প্রতি স্কয়ার ফিটের ভাড়া নির্ধারণ করে দিলে সমস্যা অনেকাংশে মিটে যাবে । এছাড়া অতিরিক্ত ফেসিলিটিজের  জন্য ও ভাড়ার মান  নির্ধারণ করে দিতে হবে ।
•     ঢাকা শহর সহ সারাদেশে প্রায় দুই কোটির মত ভাড়াটিয়া রয়েছে । সংখ্যায় তারা  একেবারে নগণ্য নয় । এখন প্রয়োজন এলাকা ভিত্তিক কল্যাণ সমিতি করে নিজেদের সংঘটিত করা । নিজেদের সংঘটিত করতে পারলে  তারা নিজ উদ্যোগে বাড়ি মালিক কল্যাণ সমিতির সাথে আলোচনার টেবিলে বসে অনেক সমস্যার সন্তোষ জনক সমাধান করতে সক্ষম হবেন ।
•      বাড়িভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ সর্বপ্রথম উভয় কল্যাণ সমিতির মাধ্যমে সুরাহা করতে হবে । এতেও সমাধান না হলে সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার দায়িত্ব প্রাপ্ত লোক মীমাংসার চেষ্টা করবেন । তাতেও কাজ না হলে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার বিধান থাকতে হবে । এর জন্য পৃথক বাড়িভাড়া ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে ।
•      বাড়িভাড়ার পূর্বে বাড়ি মালিক এবং ভাড়াটিয়া উভয়েই ষ্ট্যাম্প এ লিখিত চুক্তি করবেন । চুক্তিতে বাড়িভাড়ার বিস্তারিত টার্ম স এন্ড কনডিশান উল্লেখ থাকবে যাতে পরবর্তীতে কোন জটিলতার সৃষ্টি না হয় ।

শেষ কথা
বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত এ নাগরিক সমস্যা সমাধানে সরকার , বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটিয়া সবাইকে আন্তরিক হতে হবে । আর সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন জনগণের সচেতনতা । বাড়িওয়ালা – ভাড়াটিয়া সম্পর্ককে বর্তমানে যে দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয় তার পরিবর্তন আনতে হবে । বাড়িওয়ালাকে মনে রাখতে হবে তিনি বাড়ি মালিক বলে ভাড়াটিয়ার চেয়ে সুপেরিওর নন –  টাকার বিনিময়ে সেবা দিচ্ছেন মাত্র । অন্যদিকে ভাড়াটিয়ার ও উচিত যে বাড়িটিতে তিনি ভাড়া থাকছেন,  নিজের বাড়ির মত তার যত্ন নেয়া এবং বাড়িওয়ালার সাথে সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রাখা । পারস্পরিক সৌহার্দ্য পূর্ণ সম্পর্কইকরতে পারে এ নাগরিক সমস্যার একটি সুন্দর সমাধান ।