ভূমি সংক্রান্ত কিছু শব্দ

0
747
fieldভূমি সংক্রান্ত সাধারণ কিছু তথ্য বা শব্দাবলি আমরা প্রায়ই ব্যবহার করি কিন্তু তার সঠিক ইতিহাস বা অর্থ অনেকের জানা নেই। আসুন জেনে নেই এমন কিছু শব্দের উৎপত্তি, ইতিহাস ও ব্যবহার।
C.S(Cadestral survey)– ১৮৮৮  সাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের তত্বাবধানে বাংলায় একটি ভূমি জরিপ হয় যাকে সিএস জরিপ বলে। রামু থানা থেকে শুরু হয়ে দিনাজপুরে এ জরিপ শেষ হয়। এটাই ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ভূমি জরিপ। এই জরিপে কৃত নকশাকে সিএস নকশা, খতিয়ানকে সিএস খতিয়ান বলে।
R.S(Revision survey)– ১৯৪০  থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত সিএস জরিপের সংশোধনী জরিপকে আরএস জরিপ বলে। এই জরিপে কৃত নকশাকে আর.এস নকশা, খতিয়ানকে আর.এস খতিয়ান বলে।
S.A(State aquisition)– জমিদারী উচ্ছেদ হবার পর ১৯৫৬থেকে ১৯৬৩  সাল পর্যন্ত জমিদারদের নিকট থেকে অধিগ্রহণকৃত ভূ-সম্পত্তির হিসাব নির্ণয়ের জন্য যে জরিপ করা হয় তাকে এস.এ জরিপ বলে। এই জরিপে কৃত নকশাকে এস.এ নক্সা, খতিয়ানকে এস.এ খতিয়ান বলে।
R.S(Revision survey)– এস.এ জরিপের পর ১৯৬৫ সালে রাজশাহী হতে শুরু হয় ২য় আর.এস। এটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানব্যপি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঢাকা শহর জরিপে এসে আইনী জটিলতার কারণে এ প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ে। এই জরিপে কৃত নকশাকে আর.এস নকশা, খতিয়ানকে আর.এস খতিয়ান বলে।
D.C.R(Duplicate carbon receipt)– উন্নয়ন কর বহির্ভূত সরকারি আয়ের জন্য দেয় যা দাখিলা নয় তাই ডিসিআর। যেমন হাট, বাজার, জলাশয়, জলমহাল ইত্যাদির ইজারা বা বন্দোবস্ত প্রদানের রশিদ।
B.S(Bangladesh survey)– বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এই জরিপের কাজ সমাপ্ত হলেও কিছু কিছু এলাকায় আইনী জটিলতায় এখনো এই জরিপ শেষ হয় নাই। সে মতে এটি এখন চলমান জরিপ।
Mutition বা জমা খারিজ– জমিন সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র সাম্প্রতিক মালিকের নামে হালনাগাদ করাকে মিউটেশন বা জমা খারিজ বলে। ক্রয়কৃত ও উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির ক্ষেত্রে করা হয়।
খতিয়ান ও পরচা– ভূমির হিসাব যখন সরকারের রেজিষ্ট্রারে অন্তর্ভুক্ত থাকে তখন তাকে খতিয়ান এবং ব্যক্তির নিকট থাকে তখন পরচা বলে। উভয় ক্ষেত্রে একই বিষয় উল্লেখ থাকে। খতিয়ানের নকলই পরচা।
দাখিলা– ভূমির খাজনা পরিশোধপত্রকে দাখিলা বলে। ১৯৭২ সাল থেকে ২৫ বিঘা পর্যন্ত ভূমি মালিকানার খাজনা মওকুফ হলে ভূমির দখল স্বত্ব নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। ১৯৮২ সালে এক সামরিক ফরমান বলে খাজনার পরিবর্তে একই হারে ভূমি উন্নয়ন কর ধার্য করা হয়। উন্নয়ন কর পরিশেধের রশিদের নাম দাখিলা।
সায়রাত মহাল– যে যে ভুমির জন্য ডিসিআর প্রদেয় তা সায়রাত মহাল। যেমন- বাজার, ঘাট, জলমহাল, বালুমহাল ইত্যাদি।
মৌজা
মৌজা রাজস্ব আদায়ের সর্বনিম্ন একক। মোগল আমলে কোন পরগনা বা রাজস্ব-জেলার রাজস্ব আদায়ের একক হিসেবে শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হতো। একগুচ্ছ মৌজা নিয়ে গঠিত হতো একটি পরগনা । বিংশ শতাব্দীতে মৌজা শব্দটি ব্যবহৃত হয় সামাজিক একক গ্রামের বিকল্প নাম হিসেবে এবং এই নামটি বেশ জনপ্রিয়তাও লাভ করে।
ঊনবিংশ শতাব্দী এবং তারও পূর্বে মৌজা সামাজিক ও রাজস্ব উভয়েরই একক হিসেবে চিহ্নিত হতো। এমন অনেক মৌজা ছিল যেখানে সামান্য কয়েকটি বসতবাড়ি ছিল অথবা আদৌ কোন বসতবাড়ি ছিল না। মৌজা ছিল শনাক্তকরণের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য চিহ্ন। মৌজার অন্তর্গত নির্দিষ্ট পরিমাণ ভূমিতে ছিল গ্রামীণ বসতি বা স্থাপনা। অবস্থাভেদে এই বসতিগুলি ছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে অথবা একস্থানে কেন্দ্রীভূত। কেন্দ্রীভূত স্থাপনাগুলি সামগ্রিকভাবে গ্রাম বা পল্লী নামে পরিচিতি লাভ করে। জরিপ বিভাগ এবং রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারীদের নিকট তাই শব্দদুটির (মৌজা ও গ্রাম) দুটি স্বতন্ত্র অর্থ রয়েছে। রাজস্ব নির্ধারণ এবং রাজস্ব আদায়ের জন্য এক ইউনিট জমির ভৌগোলিক অভিব্যক্তি ছিল মৌজা। অন্যদিকে গ্রাম ছিল মৌজার অন্তর্ভুক্ত শক্ত সামাজিক বন্ধনে গঠিত মনুষ্যবসতি। এভাবে একটি মৌজার অন্তর্গত একের অধিক গ্রাম থাকতে পারত এবং একইভাবে, একটি গ্রাম সন্নিহিত দুটি মৌজা নিয়ে গঠিত হতে পারত। বঙ্গদেশের পাললিক সমভূমিতে কেন্দ্রীভূত রীতিতে গ্রামবসতি খুব কমই গঠিত হয়েছে। ব্যক্তিক কৃষক পরিবার উন্মুক্ত মাঠে তাদের নিজস্ব ভূমির উপর বাস্তুভিটা নির্মাণ করা সুবিধাজনক মনে করত। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাকেরগঞ্জ জেলার সমতল ভূমিতে কদাচ গুচ্ছ বা কেন্দ্রীভূত গ্রাম ছিল। প্রতিবেশিতার বিষয় বিবেচনা না করেই এসব বসতবাড়ি নির্মাণ করা হতো। কিন্তু সিলেট ও ময়মনসিংহ জেলায় বিষয়টি এরকম ছিল না। সেখানে নদীতীরের উঁচু জমিতে কৃষকরা বৃহদাকার কেন্দ্রীয় গ্রামবসতি স্থাপন করত। উত্তরবঙ্গের জেলাসমূহে কতিপয় জলাশয়ের (পুকুর, দিঘি, ইত্যাদি) চারদিকে গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করা ছিল সাধারণ বৈশিষ্ট্য। একইভাবে, পরবর্তীকালে বঙ্গদেশের জেলাসমূহে ক্যাডাস্ট্রাল জরিপ পরিচালনাকালেও মৌজাকে সর্বনিম্ন রাজস্ব একক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। স্থানীয় রাজস্ব নকশায় জুরিসডিকশন লিস্ট (জেএল) এবং রেভিনিউ সার্ভে (আরএস) নম্বর দ্বারা একটি মৌজা শনাক্ত করা হতো। জরিপ বা সেটেলমেন্টের রেকর্ডপত্রে মৌজা শব্দটির ব্যবহার এখনও প্রচলিত।