জব্বারের বলি খেলার ১০৮তম আসর মঙ্গলবার

দেবব্রত রায়

0
175
Jobbarer Boli Khela (1)
জব্বারের বলি খেলার ফাইল ছবি

চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জুড়ে আছে জব্বারের বলি খেলা। নগরীর লালদীঘি মাঠে প্রতি বছরের ১২ বৈশাখ এ খেলা অনুষ্ঠিত হয়। ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলি খেলার ১০৮তম আসর বসতে যাচ্ছে আগামীকাল মঙ্গলবার। এ খেলাকে কেন্দ্র করে আজ সোমবার লালদীঘি মাঠে শুরু হয়েছে মেলা। বর্তমানে দেশের অন্যতম বড় লোকজ উৎসব হিসেবে পরিচিত এই মেলা।

Jobbarer Boli Khela (2)
জব্বারের বলি খেলার ফাইল ছবি

আজ সোমবার থেকে ৩ দিনের মেলা শুরু হলেও গত শুক্রবার থেকেই লালদীঘি মাঠে নানা লোকজ পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। গত ৩ দিন ধরে মেলা প্রাঙ্গণে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের আনাগোনা লক্ষ করা যাচ্ছে; বিভিন্ন পণ্য সংগ্রহের লক্ষ্যে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন তারা।

চট্টগ্রামে প্রতি বছর ১২ বৈশাখে উৎসব মুখর পরিবেশে কুস্তি বা বলি খেলা অনুষ্ঠিত হয়। একে জব্বারের বলি খেলা বলা হয়। বলি খেলা নামটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক। এর আভিধানিক নাম হলো মল্লযুদ্ধ বা কুস্তি প্রতিযোগিতা। বলি শব্দটি এসেছে বলবান থেকে। মুঘল আমলে বিত্তবান এবং ভূ-স্বামীরা নিরাপত্তা ও আভিজাত্য প্রদর্শনের জন্য বেতনভোগী নামীদামী কুস্তিগির পুষতেন। তাদের দৈহিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ হতো বলি খেলার মাধ্যমে।

Jobbarer Boli Khela (1)
জব্বারের বলি খেলার ফাইল ছবি

মল্লযুদ্ধে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য সুপ্রাচীন কালের। এ অঞ্চলে মল্ল নামে খ্যাত বহু প্রাচীন পরিবার দেখা যায়। চট্টগ্রামে মোট ২২টি মল্ল পরিবার ইতিহাস প্রসিদ্ধ। তারা সবাই মধ্য চট্টগ্রামের ১৯টি গ্রামে বাস করতেন। কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদীর দুই ধারের বিভিন্ন গ্রামে বলিদের বাস ছিল। এছাড়া চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন বলীর কীর্তিগাথা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত বলি খেলার স্বর্ণযুগ ছিল। সে সময় চট্টগ্রাম জেলার সর্বত্র চৈত্র থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত বলি খেলা হতো। তখন এ অঞ্চলের অনেকেই মিয়ানমার প্রবাসী ছিলেন। মূলত বলি খেলার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তারা। পরবর্তীকালে প্রথিতযশা অনেকেই বলি খেলার পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ঢাকার নবাব আবদুল গনিও বলী খেলার একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক এলাকায় বলি খেলার পরিমাণ কমে যায়।

Jobbarer Boli Khela (3)
ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলি খেলার ১০৮তম আসর উপলক্ষে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে পসরা সাজিয়ে বসা এক দোকানী।

চট্টগ্রামে প্রচলিত বলি খেলার প্রবর্তক ছিলেন আব্দুল জব্বার নামের এক সওদাগর। তার নামানুসারে একে জব্বারের বলি খেলা বলা হয়। আবদুল জব্বার ছিলেন নগরীর বদরপাতি এলাকার তৎকালীন প্রভাবশালী সমাজসেবক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে দেশের যুব সমাজকে সংগঠিত, প্রেরণা দেওয়া এবং সংগ্রামী করার লক্ষ্যে এটি করেন তিনি। বাংলা ১৩১৫ সনের ১২ বৈশাখ আবদুল জব্বারের বলি খেলার প্রথম আসর বসে। তিনি থাকতেন এই খেলার সভাপতি।

Jobbarer Boli Khela (4)
ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলি খেলার ১০৮তম আসর উপলক্ষে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে পসরা সাজিয়ে বসা এক দোকানী।

বর্তমানে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে বলি খেলা অনুষ্ঠিত হয়। বলি খেলার আগে ঢোল বাজিয়ে প্রচার চালানো হয়। সঙ্গী-সমর্থকদের নিয়ে ঢোল বাজিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন বলিরা। কয়েক পর্বের প্রতিযোগিতা শেষে একজনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

কয়েক দশক আগেও জব্বারের বলি খেলার স্বর্ণযুগে ছিল। এ খেলার আকর্ষণ কিছুটা ম্লান হলেও শত বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে এটি এখনও টিকে আছে। প্রতি বছর মেলার ব্যাপ্তিও সম্প্রসারিত হয়। মেলা চলাকালে ওই এলাকার সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়।

বলি খেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য, স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ লোকজ মেলা। কথিত আছে, সবকিছুই পাওয়া সম্ভব এ মেলায়। বলি খেলা শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা তাদের পসরা নিয়ে হাজির হন লালদীঘি মাঠে।

Jobbarer Boli Khela (5)
ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলি খেলার ১০৮তম আসর উপলক্ষে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে পসরা সাজিয়ে রাখা বসা একটি দোকান।

আজ মেলা প্রাঙ্গন সরেজমিনে দেখা গেছে, দোকানিরা গ্রামীণ ঐতিহ্যের জিনিসপত্র নিয়ে মেলায় এসেছেন। সড়কের দুই পাশে চৌকি বসিয়ে বা মাটিতে চট বিছিয়ে অবস্থান নিয়েছেন তারা। নগরীর কোতোয়ালির মোড় থেকে লালদীঘির পাড়ের চারদিকে বিভিন্ন নিত্যপণ্য সাজাচ্ছেন দোকানিরা। কেউ এসেছেন কুমিল্লা থেকে মাটির তৈরি তৈজসপত্র নিয়ে; আবার কেউ এসেছেন ঢাকা থেকে দা, চুরি ও বঁটি নিয়ে। কেউবা এসেছেন গাজীপুর, বগুড়া, কক্সবাজার, ফেনী, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে। সঙ্গে এনেছেন গ্রামীণ বাহারি পণ্য।

আবদুল কাদের হাওলাদার নামের মাটির টব বিক্রেতা বলেন, গত ৪০ বছর ধরে জব্বারের বলি খেলা ও বৈশাখী মেলায় আসছি। এই মেলায় বিক্রি খুব ভালো হয়। বয়স হয়েছে; আর কতদিন আসতে পারবো- জানি না। তবে আমার সন্তানরা আসবে।

Jobbarer Boli Khela (6)
ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলি খেলার ১০৮তম আসর উপলক্ষে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে বসে মাটির টবে রং করছেন এক দোকানী।

ঢাকার গোসাইপাড়া থেকে মাটির তৈরি টব, শোপিচ এবং মাটির তৈরি কারুকাজের নকশা নিয়ে এসেছেন আবদুল হামিদ। তার দোকানে ৩০ টাকা থেকে ৩০০ টাকার পর্যন্ত মাটির তৈরি জিনিস আছে। এছাড়া ১৫০ থাকা থেকে ১৩০০ টাকা পর্যন্ত দামের বিভিন্ন শো পিস বিক্রি করছেন তিনি।

ঝাড়ু নিয়ে বান্দরবন থেকে লালদীঘির মাঠে এসেছেন মো. ইলিয়াস। তিনি বলেন, প্রতি বছর এ মেলায় অনেক ঝাড়ু বিক্রি হয়। তবে এবারের আবহাওয়া খুব খারাপ। মেলায় এসে সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে আছি।

Jobbarer Boli Khela (7)
ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলি খেলার ১০৮তম আসর উপলক্ষে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে পসরা সাজিয়ে বসা এক দোকানী।

মেলা আয়োজক কমিটির সভাপতি ও চসিক কাউন্সিলর জওহর লাল হাজারী অর্থসূচককে বলেন, মেলায় নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশের বিশেষ মনিটরিং সেল কাজ করছে। বলি খেলার জন্য এ পর্যন্ত ৮০ জন বলি নাম নিবন্ধন করেছেন। বলি খেলার মঞ্চ ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। তবে আমাদের দুশ্চিন্তা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া নিয়ে। কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। তাই আসা বিক্রেতাদের মালামাল রক্ষার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।

বাংলা ১৩২২ সনে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় জব্বারের বলীখেলা প্রবন্ধে মোহিনীমহন দাস লিখেছিলেন, আবদুল জব্বরের ‘বলি খেলা’ বলিয়া প্রসিদ্ধ। চট্টগ্রাম শহরের ঠিক বক্ষঃস্থলে পুরাতন কাছারির (বর্তমান থানা ও মাদ্রাসা স্কুলের) ইমারতের নিম্নস্থ ময়দানে এই খেলার স্থান হইয়া থাকে। ময়দানের মধ্যস্থলে মল্লগণের জন্য নির্দিষ্ট রঙ্গস্থল বাদ রাখিয়া চারিদিকে লোহার কাঁটা-তার দিয়া দোহারা বেড়া দেওয়া হয়। সেই রঙ্গস্থলের ঠিক মধ্যস্থলে উচ্চ সুপারীগাছের থাম পুঁতিয়া তাহার উপরিভাগে একটি ‘বায়ু-চক্র’ বসাইয়া দেওয়া হয়। বায়ুপ্রবাহের তাড়নায় তাহা অবিরাম গতিতে ঘুরিতে থাকে, এবং তন্মধ্যে বসান কয়েকটি ছবির তরঙ্গায়িত গতি দেখিতে পাওয়া যায়।

অর্থসূচক/দেবব্রত/এমই/