হালদা পাড়ে ডিম সংগ্রহের উৎসব

তৈয়ব সুমন

0
152

রাত সাড়ে ৪টা। লোকজন ছুটছে হালদা নদীর নাপিতের ঘোনা এলাকায়। সবাই বিশেষ ধরনের জাল, বালতি, নৌকা, সার্চ লাইট নিয়ে এসেছে মাছের ডিম সংগ্রহের আশায়। এক বছর বিরতি দিয়ে অবশেষে আবারও হালদা নদীতে ডিম ছেড়েছে কার্প জাতীয় মা মাছ। মাছের ডিম সংগহের জন্য হালদা পাড়ের নাপিতের ঘোনায় এসেছেন মুন্সি আবদুর রহিম। গত ২৩ বছর ধরে হালদা নদী থেকে নিয়মিত মাছের ডিম সংগ্রহ করছেন তিনি।

মুন্সি আবদুর রহিম জানান, গত শুক্রবার বিকেলে ‘নমুনা ডিম’ দেখার পর মধ্যরাত থেকে প্রত্যাশিত ডিমের দেখা পান সংগ্রহকারীরা। আজ শনিবার সকাল পর্যন্ত রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশসহ কার্প জাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহের উৎসবে মেতে ওঠেন সবাই। প্রথমে হালদা নদীর নাপিতের ঘোনা এলাকায় মা-মাছের ডিম দেখতে পাওয়া যায়। এরপর খলিফার ঘোনা, রামদাশ মুন্সির হাট থেকে মদুনাঘাট পর্যন্ত সবকটি এলাকায় মাছ ডিম ছাড়তে দেখা যায়।

মাছের ডিম সংগ্রহকারী মুন্সি আবদুর রহিম জানান, এ সময় নদীতে ভাটার স্রোত থাকায় মা মাছ ডিম ছাড়তে ছাড়তে উজান থেকে ভাটি এলাকায় চলে আসে। এবার একজন ডিম সংগ্রহকারী আধা বালতি থেকে কয়েক বালতি পর্যন্ত ডিম সংগ্রহ করতে পেরেছেন। তবে মা মাছ মধ্যরাতে ডিম ছাড়ায় সুবিধা করতে পারেননি অনেকে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণি বিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও হালদা নদী বিশেষজ্ঞ মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, ডিম সংগ্রহকারীরা বিশেষ কৌশলে মাটির গর্তে পানি দিয়ে আগামী চার দিনের মধ্যে ডিমগুলো থেকে রেণু তৈরি করবে। এরপর সেই রেণু ছোট ছোট পুকুরে ছেড়ে দিয়ে পোনা তৈরি হবে। হালদার পোনা দ্রুত বড় হওয়ায় সারা দেশের মৎস্যচাষিদের কাছে এর বিশেষ কদর রয়েছে।

তিনি বলেন, পোনা সংগ্রহকারীদের তথ্য অনুযায়ী প্রাথমিক হিসাবে এবার ১ হাজার ৬৮০ কেজি মাছের ডিম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্য থেকে মাত্র ২৮ কেজি রেণু পাওয়া যাবে। সব ডিম থেকে রেণু ফুটবে না, অনেক ডিম নষ্ট হবে। প্রতি কেজি রেণুতে চার-পাঁচ লাখ মাছের পোনা জন্মাবে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মমিনুল হক জানান, ডিম ছাড়ার পর মা-মাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সুযোগে অতীতের মতো যাতে কেউ মা-মাছ শিকার করতে না পারে সে জন্য হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার নেতৃত্বে হালদা নদীতে টহল দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় পুলিশকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, হালদায় একসময় ডলফিনসহ প্রায় ৭২ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন পাওয়া যায় ৬২ প্রজাতির মাছ। হালদা থেকে ১৯৪৫ সালে সংগৃহীত ডিমের পরিমান ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ কেজি এবং ৬৫ বছর পর ২০১১ সালে সংগৃহীত ডিমের পরিমান ১ লাখ ৩ হাজার ৪০ কেজি। ২০১২ সালে ১ হাজার ৬০০ কেজি। ২০১৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬২৪ কেজি এবং ২০১৪ সালে আরও কমে তা হয় মাত্র ৫০০ কেজি। হালদার ৫ কেজি ওজনের ডিমওয়ালা একটি মাছ থেকে বছরে সাড়ে ৩ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। বছরে চার ধাপে জাতীয় অর্থনীতিতে হালদার অবদান প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। যা দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ৬ শতাংশ।

উল্লেখ, চট্টগ্রামের রাউজান ও হাটহাজারী উপজেলা এলাকাজুড়ে হালদা নদীর অবস্থান। চোরা শিকারীর তৎপরতায় নদীতে মা মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় প্রতিবছরই হালদায় ডিম উৎপাদনের পরিমাণ কমছে। সম্প্রতি হালদা নদী রক্ষায় হালদাকে দেশের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।