রাজশাহীতে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ মেট্রিক টন

0
78

mangomukulবাতাসে মৌ মৌ গন্ধ। বাগানে সোনালী-হলুদের মিশ্রণ। মুকুলে মুকুলে ছেয়ে গেছে আমবাগান। থেকে থেকে মৃদু হাওয়া দোল দিয়ে যাচ্ছে মুকলিত গাছে। গাছভর্তি মুকুলের মতো আমচাষিদের মনেও লেগেছে দোলা।

তারা আশ করছেন এ বছর আমের বাম্পার ফলন হবে রাজশাহী অঞ্চলে। সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষি অফিসও তেমনই ভাবছে। কৃষি অফিস জানিয়েছে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে রাজশাহী অঞ্চলে এবার আমের ফলন ৫ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে।

রাজশাহী জেলা ও আঞ্চলিক কৃষি অফিস থেকে জানা গেছে, চলতি মৌসুম আমের মুকুলের জন্য অনুকূল আবহাওয়া বিরাজ করছে। গত বছরের চেয়ে এবার আমের উৎপাদন ভালো হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কৃষিবিদ ও কৃষি সংশ্লিষ্টরা।

কৃষি অফিসের তথ্য মতে রাজশাহী অঞ্চলে প্রায় ৪৮ হাজার ৩১৩ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে। যা থেকে এবার আম উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৫ লাখ মেট্টিক টন।

রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী অঞ্চলে ৪৮ হাজার ৩১৩ হেক্টর জমিতে আমের  বাগান রয়েছে। মোট আম বাগানের প্রায় অর্ধেকই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় রয়েছে। এ জেলায় ২৩ হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান। যা থেকে উৎপাদিত আমের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ মে.টন। এছাড়াও রাজশাহী জেলায় ৮ হাজার ৬৬৭ হেক্টর জমির আমবাগানে উৎপাদন ধরা হয়েছে ৯০ হাজার ৩শ ৫০ মে.টন, নওগাঁ জেলায় ৪ হাজার ৮২৫ হেক্টর জমির বাগানে আমের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৭ হাজার ২শ মে.টন, নাটোর জেলায় ৩ হাজার ৭শ হেক্টর বাগানে ৪২ হাজার ৮৪৬ মে.টন আমের উৎপাদন ধরা হয়েছে, বগুড়া জেলায় ৩ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমির বাগানে আমের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ৩১ হাজার ২৩০ মে.টন, জয়পুরহাটে ৬২২ হেক্টর বাগানে আমের উৎপাদন ধরা হয় ৪ হাজার ১৩৬ মে.টন, পাবনা জেলায় ১ হাজার ৯০৪ হেক্টর জমিতে আমের উৎপাদন ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ৩৭৮ মে.টন এবং সিরাজগঞ্জ জেলায় ২ হাজার ৫৫ হেক্টর জমির আমবাগানে ২০ হাজার সাড়ে ৫শ মে.টন।

জানা গেছে, বরেন্দ্র প্রকল্পের সেচ সুবিধা পেয়ে শুষ্ক-রুক্ষ বরেন্দ্র ভূমি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল, গোমস্তাপুর ও সদর উপজেলা, রাজশাহী, চারঘাট, তানোর ও গোদাগাড়ী, নওগাঁর নেয়ামতপুর, পোরশা, সাপাহার ও ধামইরহাট উপজেলার ধানের জমিতে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার আমবাগান। ফলে এ অঞ্চলে আম চাষে এক নীরব বিপ্লব ঘটেছে।

দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ এখন বরেন্দ্র এলাকায় জমি কিনে বানাচ্ছেন আমবাগান এবং শ্রমিক দিয়ে সারা বছর পরিচর্যা করাচ্ছেন বাগানের। এতে বহু বেকার লোকের কর্মসংস্থান ঘটেছে। আর আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ বহুকাল ধরেই আম চাষে জড়িয়ে রয়েছেন। দেশের জন্য আম একটি মৌসুমী ফল হলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এটি প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিণত হয়েছে। এ খাতে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়। গাছের পরিচর্যা থেকে আম কেনাবেচা পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়ে থাকে রাজশাহী অঞ্চলে।

আম চাষিরা জানান, এবার মৌসুমের শুরুতে আবহাওয়াগত কারণে পর্যাপ্ত গাছে গাছে মুকুল আসতে দেরি হলেও বর্তমানে কমবেশি প্রতিটি গাছেই মুকুল এসেছে। তবে বড় আকারের কিছু গাছে মুকুলের উপস্থিতি কিছুটা কম।

রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্র থেকে জানা গেছে, অনুকূল আবহাওয়ায় এ বছর রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ অঞ্চলের অন্য জেলার আমবাগান গুলোতে পর্যাপ্ত মুকুল এসেছে। বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন মুকুল বের হতে যে তাপমাত্রার প্রয়োজন বাতাসে সে তাপমাত্রা বিরাজ করেছে। এখন হঠাৎ করে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে মুকুলের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্টের শঙ্কা দেখা দিবে।

আর কদিন পর আমের গুটিসহ কড়ালিও দেখা যাবে। আবার আগাম ফোটা মুকুলে গুটি দেখা যাচ্ছে। মৌসুমের প্রথম থেকেই রাজশাহী অঞ্চলে আম উৎপাদনের লক্ষমাত্রা পুরণের সম্ভাবনা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞ ও আম চাষীরা।

রাজশাহীর পবা উপজেলার তেঘর গ্রামের আমচাষি দুলাল ও আফাজ উদ্দিন সরকার জানান, গাছে গাছে প্রচুর মুকুল বের  হয়েছে। কোন কোন গাছে মুকুল থেকে গুটি দেখা দিয়েছে। গাছের গোড়ায় পানি সেচ, মুকুলে কীটনাশক স্প্রে, বাগান পরিষ্কারসহ বিভিন্ন পরিচর্যায় এখনো ব্যস্ত সময় পার করছেন আম চাষিরা।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নুরুল আমীন বলেন, এ বছর আম উৎপাদনের উপযোগী বছর। অফ ইয়ার, অন ইয়ার বলতে কিছু নেই। চাষিরা আম গাছের নিয়মিত পরিচর্যা এবং যত্ন নেওয়ায় প্রতি বছরই ভালো ফলন হয়।

তিনি আরও বলেন, আবহাওয়া এখন পর্যন্ত অনুকূল। হুট করে গরম আসেনি। হালকা হালকা শীতের পর গরম আসছে ধীরে ধীরে। এটা আমের ভালো ফলনের জন্য খুবই উপযোগী আবহাওয়া।

এ অঞ্চলে প্রায় ২৫০ জাতের আম উৎপন্ন হয়। তবে এবার ল্যাংড়া, গোপালভোগ, খিরসাপাত, বোম্ব^াই, হিমসাগর, ফজলি, আম্ররপালি, আশ্বিনা, ক্ষুদি, বৃন্দাবনী, লক্ষণভোগ, কালীভোগ, তোতাপরী, দুধসর, লকনা ও মোহনভোগ জাতের আমের চাষ বেশি হয়েছে।

মে মাসের শেষের দিকে রাজশাহীর বাজারে বাজারে আম উঠতে শুরু করবে। প্রথম ধাপে উঠবে গোপালভোগ ও রানীপছন্দ জাতের আম। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই লকনা, খিরসাপাত, ল্যাংড়া, লক্ষণভোগ, দুধসর, মোহনভোগসহ বিভিন্ন জাতের আমে ভরে উঠবে বাজার। এরপর চলতি মৌসুমের আকর্ষণীয় ফজলি। সবশেষে বাজারে দেখা মিলবে আশ্বিনা আমের।