সংকুচিত হচ্ছে চায়ের বাজার, চার সপ্তাহে কমেছে কেজিতে ৪৫ টাকা

0
98
tea

চাক্রমেই দেশ-বিদেশের উভয় বাজারেই সংকুচিত হয়ে আসছে দেশিয় চায়ের বাজার। একদিকে কমছে চায়ের রপ্তানি অন্যদিকে বাড়ছে আমদানির পরিমাণ। ফলে অ-বিক্রিত থেকে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ চা। দেশে চায়ের নিলাম বছরে ৪৭ দিন (প্রতি সপ্তাহে মঙ্গলবার) তোলা হলেও প্রতি নিলামে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ চা অ-বিক্রিত থাকায় তা পুষিয়ে নিতে আরও দু’টি বাড়তি নিলাম তোলা হবে। তবু প্রায় ১ মিলিয়ন কেজির অধিক চা পাতা অ-বিক্রিত থেকে যাওয়ার আশংকা থাকে। আর এর ফলে সংকুচিত হচ্ছে চায়ের বাজার। চারসপ্তাহে প্রতি কেজিতে কমেছে ৪৫ টাকা ৬০ পয়সা।

প্রতিবেশি দেশগুলোতে চা উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়া ও বাংলদেশে আমদানি শুল্ক কমিয়ে দেওয়ার ফলে রপ্তানি কমে আমদানি বেড়ে গেছে। পাশাপাশি এ সময়টিতে দেশীয় চায়ের গুণগতমান কমে যাওয়ায় অ-বিক্রিত চা বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অব্যাহতভাবে চা আমদানির ফলে চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক নিলাম বাজারে চায়ের চাহিদা ও দাম দুই-ই কমেছে। সর্বশেষ অনুষ্ঠিত ৩৯তম নিলামে কেজি প্রতি চায়ের দাম ১৪৩ টাকা ৭২ পয়সা। অথচ ৩৮তম নিলামে গড় বিক্রি হয়েছে ১৭০ টাকা ৭৬ পয়সা, ৩৭তম নিলামে ১৭৭.২৯ টাকা এবং ৩৬তম নিলামে চায়ের দাম ছিল ১৮৯ টাকা ৩২ পয়সা দরে।  চার নিলামের ব্যবধানে চায়ের দাম কমেছে প্রতিকেজি ৪৫ টাকা ৬০ পয়সা। অথচ গেল অর্থবছরে (২০১২-১৩) নিলাম বর্ষের একই সময়ে নিলামে চায়ের দাম ছিল কেজি প্রতি ২৭৩ থেকে ২৮৯ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ চলতি নিলাম বর্ষের এ সময়ে পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে কেজি প্রতি চায়ের দাম কমেছে ১১২ টাকারও বেশি।

চা বেচা-কেনায় মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যে দেখা যায়, সাধারণত প্রতি নিলামে গড়ে ২০-৩০ শতাংশ চা অ-বিক্রিত থাক যা পরের নিলামে তোলা হয়। তবে এখন অ-বিক্রিত চায়ের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। গত চারটি নিলামের প্রতিটিতে যে পরিমাণ চা বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে তার সিংহভাগই অ-বিক্রিত রয়ে গেছে।

গত চারটি নিলামে যথাক্রমে সাড়ে ৫৬ শতাংশ, ৫৮ শতাংশ, ৫৯ শতাংশ ও ৬২ শতাংশ চা অবিক্রীত ছিল। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ৪০তম নিলামে তোলা হয় প্রায় সাড়ে ৩৫ লাখ কেজি চা। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৬২ শতাংশ বা প্রায় ২২ লাখ কেজি চা বিক্রিই হয়নি। নিলামে বড় ক্রেতারা নিষ্ক্রিয় থাকায় অ-বিক্রিত চায়ের পরিমাণ বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।

শংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকার চলতি অর্থ বছরের বাজেটে চায়ের আমদানি শুল্ক কমিয়েছে । আগে আমদানি শুল্ক ছিল ৪০% সরকার চলতি বাজেটে আমদানি শুল্ক কমিয়ে ২০% করায় দেশের আমদানিকারকদের মধ্যে চা আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমদানি শুল্ক কমানোর আগে যেখানে চা প্রতি কেজি বিক্রি হতো ২৭৫ টাকা থেকে ২৮৩ টাকা দরে। সেখানে শুল্ক কমানোর পর তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪৩-১৪৫ টাকা দরে।  ফলে দেশের চা শিল্প ক্রমেই আমদানি নির্ভর হয়ে পড়ছে।

জানা যায়, সিলেট বিভাগে ১৪৫টি চা বাগানের মধ্যে মৌলভীবাজার জেলায় ৯৬টি, হবিগঞ্জ জেলায় ২৬টি ও সিলেট জেলায় রয়েছে ২৩টি বাগান। চায়ের দাম কমার কারণে অনেক বাগান মালিক নিলাম বাজারে তাদের উৎপাদিত চা পাতা সরবরাহ বন্ধ রেখেছেন।

বর্তমান সময়ে যে চা পাতা সরবরাহ করা হচ্ছে তা শীতকালে বাগান থেকে সংগ্রহ করেছে বাগান চাষিরা। অন্যান্য সময়ের তুলনায় শীতকালে সংগৃহীত চায়ের গুণগতমানও কম হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বোকাররা। তারা দাবি করছেন, ভাল চা ঠিকই বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এ সময় ভাল চায়ের পরিমাণ কম থাকায় চায়ের দাম পরে যাচ্ছে বলেও জানান তারা।

চা বোর্ড সুত্রে জানা যায়, গত বছর দেশে চা উৎপাদন হয়েছে ৬৪ মিলিয়ন কেজি। যা দ্বারা দেশিয় চায়ের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। আমদানি শুল্ক কমিয়ে আনায় গেল ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে ৪৪ লাখ ৮৩ হাজার ১৬৯ কেজি চাপাতা আমদানী করা হয়েছে । ২০১১-২০১২ অর্থ বছরে চা আমদানী হয়েছিল  ৩০ লাখ ৮৭ হাজার কেজি । অর্থ্যাৎ এক বছর ব্যবধানে আমদানি চায়ের পরিমাণ বেড়ে যায় প্রায় ১৪ লাখ কেজি।

এদিকে, নিলামে চা বিক্রি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে বাগানমালিকেরা আমদানি বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশীয় চা সংসদের চেয়ারম্যান সাফওয়ান চৌধুরী অর্থসূচককে বলেন, বাজেটের পর থেকে চায়ের আমদানী শুল্ক কমানোর ফলে দেশে চায়ের আমদানী বাড়তে থাকে কমতে থাকে দেশীয় চায়ের দাম। যেখানে চায়ের উৎপাদন খরচ পড়ে প্রতি কেজি ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা সেখানে মান ভেদে বিভিন্ন বাগানের চা পাতা ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। যা চা শিল্প ধ্বংস হওয়ার নমুনা মাত্র। চট্টগ্রামের নিলাম বাজারে বাকি

নিলামগুলোতে সব বাগানের চা পুরোপুরিভাবে বিক্রি হবে না। ফলে এ বছর প্রায় ১ মিলিয়ন কেজির অধিক চা পাতা অ-বিক্রিত থেকে যাবে।

বাংলাদেশ চা ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি আবদুল হাই চৌধুরী অর্থসূচককে বলেন, বর্তমান সময়ে চায়ের মান খুবই খারাপ যা আমাদের দেশের মানুষ এত নিম্নমানের চা খায় না তাই এসব চা অ-বিক্রিত থেকে যেতে পারে। গেল নিলামে নিম্নমানের চায়ের দাম ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা করে বিক্রি হয়েছে। ভাল পাতার চা বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকারও বেশি দরে।

আমদানি বেড়ে যাওয়ায় দাম কমছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমদানি না করলে দেশে এমন নিম্নমানের চা বিক্রি হতো ৩০০ টাকারও বেশি দরে।

তিনি আরও বলেন, অ-বিক্রিত চায়ের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় এবার দু’টি বাড়তি নিলামের আয়োজন করা হয়েছে। আগামি এপ্রিলের মাঝামাঝি এ মৌসুমের শেষ নিলাম হবে। এরপর মে মাসের প্রথম সপ্তাহে শুরু হবে আগামি মৌসুমের নিলাম।

চা বাগানের মালিকরা তথা বাংলাদেশিয় চা সংসদের সদস্যরা দেশীয় চা শিল্পকে রক্ষা করার লক্ষ্যে অবিলম্বে চা আমদানি বন্ধ করার জন্য এবং চায়ের আমদানি শুল্ক বৃব্ধি করার জন্য সরকারের নিকট দীর্ঘদিন থেকে দাবি জানিয়ে আসছেন। বাংলাদেশ চা সংসদের সদস্যরা জানান, সরকার এ ব্যপারে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে চা শিল্পের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে।