বাড়ছে অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা

0
137
oggan-party

oggan-party-নতুন নতুন কৌশল নিয়ে আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। প্রতিদিনই তাদের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে অনেক সাধারণ মানুষ। সর্বস্ব হারানোর পাশাপাশি জীবনও চলে যাচ্ছে অনেকের। শুধু অজ্ঞান পার্টিই নয় ছিনতাই বা রাহাজানির এই প্রক্রিয়ায় সমানভাবে সক্রিয় আছে মলম পার্টিও। উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ও কার্যসম্পাদন পদ্ধতিতে এই উভয় জাতের পার্টির ভিন্নতা থাকলেও এর ভয়াবহতা অভিন্ন। তবে অজ্ঞান করা কিংবা চোখে মলম লাগানোর ক্ষেত্রে স্বল্প পাল্লার মাইক্রোবাসকে ব্যবহার করছে তারা।

কোমল পানীয় কিংবা বোতলজাত খাবার পানির সাথে ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইনসুলিন মিশিয়ে তৈরি করা হয় অজ্ঞান করার রেসিপি। আবার গণপরিবহনে সিটের কাছে ক্লোরোফোম জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ লাগিয়েও অজ্ঞান করার কাজটি করা হয়। অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা এলাকা ভাগ করে ‘অপারেশন’ পরিচালনা করছে। আবার টার্গেট ভিত্তিক এলাকার বাইরে চলে গেলে তাদেরকে নিজেদের আয়ত্তে রাখতেও দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয় রিলে দৌড়ের মতো। পার্টির কেউ সাজছে ডাব বিক্রেতা, কেউ পানির ফেরিওয়ালা, আবার কেউ হচ্ছে সিএনজি অটোরিকশার যাত্রী।

হাসপাতাল ও পুলিশের তথ্য মতে, রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে সাতজন নাগরিক অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ছে। ভুক্তভোগীরা বলছে, রাজনৈতিক সহিংসতা কমার পর জনজীবন স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এরা তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ধারাবাহিক অভিযানে অজ্ঞান পার্টির অনেক সদস্য গ্রেপ্তার হওয়ায় তারা এখন নতুন নতুন জ্ঞান বা কৌশল আবিষ্কার করছে।

ঘটনা সূত্রে দেখা গেছে, অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, তারা একটি এলাকা থেকে বাস বা অন্য গণপরিবহনে উঠেছে। মাওয়া থেকে গুলিস্তান-সায়েদাবাদ রুট, কাঁচপুর-নারায়ণগঞ্জ থেকে যাত্রাবাড়ী-সায়েদাবাদ ও গুলিস্তান; গাজীপুর থেকে আব্দুল্লাহপুর; মহাখালী ও সাভার থেকে গাবতলী, মিরপুর ও চিড়িয়খানা রুটের বাসগুলোতে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা বেশি সক্রিয়।

ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ দিনে অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি। গতকাল মঙ্গলবার ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন পল্টনস্থ ম্যাকো ইন্টারন্যাশনাল এর কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম।জানা যায় এর একদিন আগে রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকা থেকে বাসে চড়ে আসার সময় তিনি চানাচুর খান। এর পর থেকে তিনি আর কিছুই বলতে পারেননা। তবে ওই প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারী জানান মঙ্গলবার অফিসে এসে হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এরপর অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়া আরেকজন শাহরিয়ার কাজ করেন মিরপুরের একটি পোশাক কারখানায়।কর্মস্থলে যাওয়ার সময় বাসের ভেতর তিনি পানি কিনে খান। এরপর থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত আর কিছুই বলতে পারেননি তিনি। তবে এসময় তারা মানিব্যাগে থাকা ১২ হাজার টাকা ও মোবাইল হারিয়ে ফেলেছেন বলে জানান তিনি।

শনিবার সন্ধ্যায় টেকনিক্যাল থেকে গুলিস্তানগামী মাইক্রোবাসে উঠেছেন হাসনাত নামের এক ব্যক্তি। মাইক্রোবাসটি শিশুমেলা দিয়ে আগারগাঁওয়ে যাওয়ার পথে চোখে বিশাক্ত মলম লাগিয়ে সবকিছু নিয়ে জায় বাসের অপর দুই যাত্রী। এরপর তাকে ফাঁকা একটা জায়গায় ফেলে রেখে যায় তারা। এঘটনায় ওই ব্যক্তির সাড়ে তিনহাজার টাকা ও দুটি মোবাইল খোয়া গেছে বলে জানান তিনি। আর তার চোখে তৈরি হয়েছে মারাত্মক ইনফেকশন।

প্রায় একবছর আগে অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে ল্যাপটপ ও ক্যামেরা হারিয়েছেন অর্থসূচকের এক আলোকচিত্রী

শুধু সর্বস্ব হারানো নয় এই দুর্বৃত্তদের কবলে পড়ে জীবন চলে যাচ্ছে অনেকেরই। গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকায় অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে মৃত্যু হয়েছে দেলোয়ার হোসেন (৫৫) নামের এক ব্যবসায়ীর।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আব্দুল মুকিত অর্থচূচককে বলেন, প্রতিদিনই ৮-১০ জন চেতনানাশকে আক্রান্ত হয়ে এ ওয়ার্ডে ভর্তি হয়।  অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়া রোগীর সংখ্যা এখন দিন দিন বাড়ছে”।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে,  অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা গ্রেপ্তার এড়াতে এখন  অনেক বেশি কৌশলী হয়েছে। বাসস্ট্যান্ডে ডাব বা পানীয় বিক্রেতা সেজে থাকে অজ্ঞান পার্টির নিজস্ব এজেন্ট। তারা সিরিঞ্জের মাধ্যমে ডাবে ও পানীয়র বোতলে চেতনানাশক ঢুকিয়ে দেয়। এরপর টার্গেট করা ব্যক্তির কাছে সেটা বিক্রি করে দলের এক বা একাধিক সদস্য ওই ব্যক্তির সঙ্গে বাসে ওঠে। টার্গেট করা ব্যক্তি যখন অচেতন হয়ে পড়ে তখন তার কাছ থেকে টাকাপয়সা হাতিয়ে নিয়ে বাস থেকে নেমে যায় দুর্বৃত্তরা।

অজ্ঞান করতে ইনসুলিনের ব্যবহার সম্পর্কে  ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মেডিক্যাল অফিসার আব্দুস সালাম বলেন, ‘কারো শরীরের সুগার লেভেল ৩-এর নিচে নামলে তিনি অচেতন হয়ে পড়বেন। যার সুগার লেভেল হাই নয়, তার শরীরে ইনসুলিন দেওয়া হলে এমনটি হবে। ইদানিং চেতনানাশক এই পার্টি এটা ব্যবহার করছে”।