পদ্মাসেতু নির্মাণে ব্যয় বাড়ছে ৭০০০ কোটি টাকা

0
86
padma_bridge

padma_bridgeপদ্মাসেতু নির্মাণে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যয়ও দ্রুত গতিতে বাড়ছে। এবার পদ্মাসেতু প্রকল্পের জাজিরা কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডসংলগ্ন নদী তীরে ভূমি প্রতিরক্ষামূলক কাজের জন্য প্রায় ১০৯ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।

এছাড়া গত বছরের বন্যায় ভাঙনের কারণে মাওয়া প্রান্তেও অতিরিক্ত ৭০০ কোটি টাকার প্রয়োজন পড়বে। ফলে এর সামগ্রিক ব্যয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নকাল বৃদ্ধি পাবে। চলতি সপ্তাহেই পদ্মাসেতুর আর্থিক প্রস্তাব দেওয়া হবে সেতু বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

অপরদিকে, পদ্মাসেতু নির্মাণের জন্য আগামি অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে যাচ্ছে সরকার। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার কেনার কাজে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে। প্রাথমিকভাবে রিজার্ভ থেকে ১৫০ কোটি ডলার নেওয়া হতে পারে। অর্থমন্ত্রণালয় সূত্র থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, যেভাবেই হোক সরকার আগামি জুন মাসে বহুল আলোচিত পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজ শুরু করতে চায়। এ সময়ের মধ্যে সেতুটি নির্মাণের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া ও কার্যাদেশ সম্পন্ন করার মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়ার কাজ চূড়ান্ত করা হবে। বাজেটে রাখা অর্থ দিয়ে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ডলার কেনা হবে। প্রয়োজন হলে অগ্রণী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে দেশি মুদ্রা দিয়ে ডলার ক্রয় করবে। প্রাথমিকভাবে ঠিকাদারদের অর্থ পরিশোধের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করা হবে। মূলত তিনটি কাজ সম্পন্ন করবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো। এগুলো হলো নদী শাসন, সেতু নির্মাণ ও দেখভাল করার জন্য নজরদারি ঠিকাদার নিয়োগ।

সূত্র জানায়, গত বছর নদীর পানির কারণে নির্মাণ সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি সাইটে সচল করতে দেরি হয়। এর ফলে ঠিকাদার প্রয়োজনীয় সংখ্যক সিসি ব্লক ও জিও-ব্যাগ প্রস্তুত করতে পারেনি। আর এ জন্য জাজিরা পয়েন্টের কাজ পিছিয়ে যায়। এতে ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে ও জাজিরা পয়েন্ট বন্যায় ক্ষতি না হয় সে জন্য কিছু কাজ করতে হবে। এ কাজগুলো সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে শুরু করা হয়। তা ছাড়া সংশোধিত নকশা অনুযায়ী ওই পয়েন্টে সেতু ও নদীশাসনের জন্য একটি পোতাশ্রয় নির্মাণ করা হবে। সব মিলিয়ে জাজিরা পয়েন্টে ভূমি প্রতিরক্ষামূলক কাজে প্যাকেজ-১-এ অতিরিক্ত ৯ কোটি ৬৯ লাখ ৮৭ হাজার ৯৮২ টাকা খরচ হবে। এর ফলে প্যাকেজ-১-এ খরচ বেড়ে দাঁড়াবে ৫৬ কোটি ৪২ লাখ ৬২ হাজার ২১০ টাকা। আর একই পয়েন্টে প্যাকেজ-২-এ খরচ বাড়বে ২ কোটি ৭৭ লাখ ৪৩ হাজার ৭৭ টাকা। প্যাকেজ-২-এ খরচ বেড়ে দাঁড়াবে ৫২ কোটি ২ লাখ ৬৪ হাজার ৬৮৩ টাকা। অর্থাৎ সর্বমোট ব্যয় বাড়ছে ১০৮ কোটি ৪৫ লাখ ২৬ হাজার ৮৯৩ টাকা। বিষয়টি অনুমোদনের জন্য আগামি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ওঠানো হতে পারে। এরই মধ্যে এ ধরনের একটি প্রস্তাব সেতু বিভাগ থেকে মন্ত্রিসভায় পাঠানো হয়েছে। গত বছর এ ধরনের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা না নেয়ায় ভয়াবহ নদী ভাঙনে মাওয়া প্রান্তে প্রস্তাবিত নদী শাসন এলাকার কিছু অংশ এবং এর উজানের অংশে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ জন্য মাওয়া প্রান্তে প্রস্তাবিত ১ দশমিক ৫০ কিলোমিটারের পাশাপাশি অতিরিক্ত আরও ১ হাজার ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে নদী শাসন প্রয়োজন হবে। এতেও অতিরিক্ত সময় এবং অতিরিক্ত ৭০০ কোটি টাকার প্রয়োজন পড়বে। ফলে এর সামগ্রিক ব্যয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নকাল বৃদ্ধি পাবে।

যদিও পদ্মাসেতু প্রকল্পের ব্যয় বাড়ার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, মূল সেতুতে ব্যয় বাড়বে না, আমরা এখন পর্যন্ত ব্যয় বৃদ্ধির কোনো চিন্তা করিনি।

২০০৭ সালে প্রথমে শুধু সড়ক সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করে প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল। কিন্তু এর সাড়ে তিন বছরের মাথায় নকশা পরিবর্তন করে সড়কের পাশাপাশি রেলসেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। পাশাপাশি অধিগ্রহণকৃত ভূমির মূল্য বৃদ্ধি করা হয়। এতে খরচ বাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙনের কারণে মাওয়া অংশে নদীশাসন এলাকার পরিধি বাড়াতে হচ্ছে। এতে ব্যয় বাড়ছে আরও ৭০০ কোটি টাকা।

আর জাজিরা পয়েন্টে প্যাকেজ-১ ও ২-এর জন্য প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে। এ ছাড়া প্রকল্প এলাকা থেকে বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চ, ফেরি ও স্পিডবোট ঘাট সরানোর জন্য ৫২১ কোটি টাকা দরকার। অথচ সাড়ে আট বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের এরই মধ্যে সাড়ে ৬ বছর পেরিয়ে গেছে। এখনো মূল সেতু নির্মাণের কাজই শুরু হয়নি।

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরে পদ্মাসেতু প্রকল্পে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল কিন্তু নির্মাণকাজ শুরু করতে না পারায় এই বরাদ্দের এক পয়সাও খরচ করা সম্ভব হয়নি। ফলে এই অর্থ এখন উন্নয়ন বাজেটে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আগামি ২০১৪-১৫ অর্থবছরে পদ্মাসেতু নির্মাণের জন্য আবারও অর্থ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এর প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। তারপর এটি বেড়ে ৭ হাজার কোটি টাকাও হতে পারে। তিনি বলেন, সেতু নির্মাণে যে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হবে তা এই অর্থ দিয়ে কেনা হবে। অর্থাৎ, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার নেওয়া হলে তা এই অর্থ দিয়ে কেনা হবে। একইভাবে এই প্রকল্পের জন্য সরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে আন্তঃব্যাংক থেকে যদি ডলার কেনা হয় সেখানে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার প্রাথমিকভাবে সংগ্রহ করা হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ মূল পদ্মা সেতু নির্মাণে কারিগরি প্রস্তাবকারী তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছে আর্থিক প্রস্তাব চাইবে। এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি প্রস্তাব বিবেচনায় আনা হয়েছে। বিবিএ’র একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, চলতি সপ্তাহেই এই আর্থিক প্রস্তাব চাওয়া হবে। প্রকল্পের বিদেশী নকশা পরামর্শক এরই মধ্যে কারিগরি প্রস্তাব মূল্যায়ন করেছে। কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি এখন তা পর্যালোচনা করে দেখবে। কর্মকর্তারা বলছেন, পরামর্শকের মূল্যায়নের ওপর কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির মন্তব্য পাওয়ার পর যোগাযোগমন্ত্রীর অনুমোদন পেলেই আর্থিক প্রস্তাব চাওয়ার তারিখ ঘোষণা করা হবে।

পদ্মাসেতুর দরপত্র আহ্বান করা হয় গত বছর ২৫ জুন। এতে অংশ নেওয়া চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুরোধে নিলামের সময় চার বার পরিবর্তন করে গত ৬ জানুয়ারি নির্ধারণ করা হয়। কর্মকর্তারা বলছেন, কারিগরি প্রস্তাব পাওয়ার পর পরামর্শককে তিন সপ্তাহের মধ্যে মূল্যায়ন করতে বলা হয়। তবে, কিছু অনুসন্ধানের জন্য এই সময়ও বাড়ানো হয়। অকল্যান্ড ভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান একমন্ড মনসেল গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বিবিএ’র কাছে মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেয়।