হালদায় মা মাছ নিধনে বার্ষিক ক্ষতি ৮০০ কোটি টাকা

তৈয়ব সুমন

0
119
halda
হালদা নদীতে মাছ ধরছেন জেলেরা।

এশিয়ার বৃহৎ প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদী থেকে মা মাছ নিধনে বছরে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে ৮০০ কোটি টাকা। একইসঙ্গে বিলুপ্ত হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।

প্রতিনিয়ত দূষণ ও দখলের কারণে হালদায় মা মাছের ডিম ছাড়ার পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে কমে যাচ্ছে। দিনে দিনে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে কার্প জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন কেন্দ্র। নদীর ৭২ প্রজাতির মাছের মধ্যে ১৫ প্রজাতির মাছ ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে।

halda
হালদা নদীতে মাছ ধরছেন জেলেরা।

হালদা নদী গবেষকরা বলছেন, হালদা এখন হুমকির মুখে। হালদাতে নির্বিচারে মা মাছ শিকার, নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ শিকার, মাছের আবাসস্থল ধ্বংস করা, যন্ত্রচালিত নৌযান চলাচল, নদীর বাঁক কর্তন, কল-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য নদীর পানিতে নিঃসরণ, সংযোগকারী খালের মুখে সুইচ গেট নির্মাণ, নদীর উৎস মুখে রাবার ড্যাম নির্মাণ, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন, তীরবর্তী জমিতে ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহার, নদীর উজানে তামাক চাষ হচ্ছে। এতে নদীর সঙ্গে সঙ্গে হাটহাজারী ও রাউজানের প্রায় ৪ হাজার জেলের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে। আর দেশের অর্থনীতিতে ক্ষতি হচ্ছে ৮০০ কোটি টাকা।

তারা জানান, একটা সময় হালদা নদীতে ২০-২৫ কেজি ওজনের কাতলা, ১২-১৫ কেজি ওজনের রুই এবং ৮-১০ কেজি ওজনে মৃগেল মাছ পাওয়া যেত। এছাড়া মিঠা ও লোনা পানির ৭২ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত এ নদীতে। এখন ৫৭ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। বিলুপ্ত হয়েছে ১৫ প্রজাতির মাছ। এর মধ্যে রয়েছে বানী কোকসা, ঘর পুঁইয়া, গুইজ্জা আইর, পাঙ্গাশ, মাদ/কাঁটা, কাঁটা ভুখা, ঘনি, চাপিলা, বাইলা, মেনি/ভেদা, কইপুঁটি, কুচিয়া, রাতাবাউরা মাছ।

১৯৪৫ সালে হালদা নদী থেকে সংগৃহীত ডিম থেকে ৫ হাজার কেজি রেণু উৎপাদন হয়েছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে রেণু উৎপাদনের পরিমাণ কমে ১২ কেজিতে নেমে এসেছে। অর্থাৎ ৭১ বছরের ব্যবধানে হালদা নদীতে রেণু উৎপাদন প্রায় ৯৯ দশমকি ৭৬ শতাংশ কমেছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও হালদা গবেষক মো. মনজুরুল কিবরীয়া জানান, ২০ কেজি ওজনের একটি মা মাছ বছরে ৫-৩৫ লাখ ডিম ছাড়ে। আর ১৮ কেজি ওজনের একটি মা মাছ জাতীয় অর্থনীতিতে বছরে ৪ কোটি টাকার অবদান রাখতে পারে। কিন্তু মা মাছ নিধনের কারণে হালদায় ডিম ছাড়ার পরিমাণ কমেছে।

তিনি জানান, হালদার মা মাছ নিধনের কারণে ৪ ধাপে (ডিম, রেণু, পোনা, মাছ) জাতীয় অর্থনীতে বছরে ক্ষতি হচ্ছে ৮০০ কোটি টাকা। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে হালদা নদীর ৩ হাজার ৭৫০ জন জেলে।

রাউজান উপজেলার চেয়ারম্যান এহেছানুল হায়দর চৌধুরী বাবুল বলেন, বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্যের দূষণ, অবাধে বালু উত্তোলনসহ নানা কারণে হালদা নদীর অবস্থা এখন সংকটাপন্ন। দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদাকে বাঁচাতে অতিদ্রুত সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। এজন্য এই নদীকে রক্ষায় দুই উপজেলা মিলে একটি কমিটি গঠন করতে হবে।

হালদা গবেষক মো. মনজুরুল কিবরীয়া জানান, যে হারে রেণু উৎপাদন কমছে, এতে বুঝা যাচ্ছে হালদা আজ হুমকির মুখে। এই নদী বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। নতুবা কার্প জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন কেন্দ্র ঢাকার বুড়িগঙ্গারর মতো হবে; যা আমাদের জন্য কখনোই সুখকর হবে না।

ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি মুহাম্মদ সিকান্দার খান বলেন, হালদার সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় জড়িত। কাউকে বাদ দিয়ে হালদা রক্ষা করা যাবে না। হালদা পারের মানুষকে নদী রক্ষার কাজে যুক্ত করতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের মতো স্থানীয় সরকারকেও হালদা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে।

অর্থসূচক/সুমন/এমই/