মুন্সিগঞ্জে হাজার বছরের পুরোনো বৌদ্ধবিহার আবিষ্কার

0
122

Munshiganj_মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের রঘুরামপুর গ্রামে মাটির নিচে হাজার বছরের পুরনো বৌদ্ধবিহার আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রত্নসম্পদ ও ঐতিহাসিক নিদর্শন উদ্ধারে চালানো খননকাজের মাধ্যমে এ বৌদ্ধবিহার আবিষ্কৃত হয়।

প্রত্নস্থানটির অবস্থান বর্তমান মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের রঘুরামপুর গ্রামে। ইতিহাসবিদদের মতে, বর্তমানের মুন্সিগঞ্জ, ঢাকা, ফরিদপুর ও শরীয়তপুর জেলার অংশজুড়ে বিস্তৃত ছিল প্রাচীন বিক্রমপুর অঞ্চল। অতীতে এ জায়গাটি বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামের মধ্যে ছিল।

মুন্সিগঞ্জের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন’ ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ঐতিহ্য অন্বেষণ’র যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণা ও প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এ বৌদ্ধবিহারের সন্ধান মিলেছে। এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হয়। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ উদ্যোগে আর্থিক সহযোগিতা করছে।

বজ্রযোগিনী গ্রামের এ খনন ও গবেষণাকাজের তত্ত্বাবধান করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, স্থাপত্যিক কাঠামো দেখে এটিকে বৌদ্ধবিহার হিসেবে নিশ্চিত করা গেছে। সুনির্দিষ্ট বয়স নির্ধারণ করতে কার্বন-১৪ পরীক্ষার জন্য নমুনা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে।

গবেষকরা জানান, শুরুতে রামপাল ও বজ্রযোগিনী ইউনিয়নের নয়টি স্থানে পরীক্ষামূলক খনন চালানো হয়। এর সবগুলোতেই প্রাক-মধ্যযুগীয় মানব বসতির চিহ্ন পাওয়া যায়। নয় নম্বর স্থানে ইটের দেয়ালের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এটিকে কেন্দ্র করে ৮০ মিটার দীর্ঘ ও ৬০ মিটার প্রস্থ জায়গায় খনন চালানো হলে বৌদ্ধবিহারটির সন্ধান মেলে।

প্রত্নক্ষেত্রটি ঘুরে দেখা যায়, স্থাপত্যটির দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দুটি দেয়াল একত্রে হয়েছে। একটি দেয়াল দক্ষিণ থেকে উত্তরে ও অন্যটি পূর্ব থেকে পশ্চিমে চলে গেছে। দেশের অন্য বিহারগুলোর কাঠামোর মতো এটিরও দেয়াল ঘেঁষে ভিক্ষুদের থাকার কক্ষগুলো অবস্থিত। উত্তর দিকের দেয়াল ঘেঁষে ভিক্ষুদের পাঁচটি কক্ষ উন্মোচন করা হয়েছে। পশ্চিমের দেয়াল ঘেঁষেও বের হয়েছে একটি কক্ষ। কক্ষগুলোর আকার সাড়ে তিন বর্গমিটার। কক্ষগুলো ভাগ করা পার্শ্বদেয়ালও খননে পাওয়া গেছে। স্থাপত্যিক কৌশল ও বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন, এটি একটি বৌদ্ধবিহার। নওগাঁর সোমপুর (পাহাড়পুর) মহাবিহার, বগুড়ার মহাস্থানগড়ের বিহার, ময়নামতির শালবন বিহার এমনকি ভারতের পাটনার নালন্দা মহাবিহারের কাঠামো ও নকশার সঙ্গে এটির মিল রয়েছে।

প্রায় এক হাজার বছর আগে বিক্রমপুর ছিল চন্দ্র, বর্মণ ও সেনদের রাজধানী। এ অঞ্চল ছিল সমৃদ্ধ জনবসতি। বিক্রমপুর অঞ্চল থেকে এখন পর্যন্ত ১০০টির বেশি মূর্তি ও ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হয়েছে।

গবেষকরা জানান, মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার নাটেশ্বরের একটি সুউচ্চ ঢিবির চারটি জায়গায় প্রত্নতাত্ত্বিক খনন চালানো হলে সেখানে খ্রিস্টীয় অষ্টম বা নবম শতকে নির্মিত এই বৌদ্ধমন্দিরের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রায় ১০০ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত মন্দিরটির বেশির ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলেও পশ্চিম-দক্ষিণ কোণার প্রায় পৌনে দুই মিটার প্রশস্ত দেয়াল অক্ষত রয়েছে।

প্রায় আড়াই মিটার উঁচু দেয়ালের ভিত্তিমূলে ব্যবহার করা হয়েছে ‘ঝামা ইট’, যা ভবনকে আর্দ্রতার দুর্বল হওয়া থেকে সুরক্ষা দিত। দেয়ালের বাইরে হাতে কাটা ইটের জালি নকশা ও অলংকরণ এবং বিভিন্ন আকৃতির ইটের স্থাপত্যশৈলী দেখে এটিকে মন্দিরের দেয়াল হিসেবে নিশ্চিত করা গেছে। ইটের বহুমাত্রিক ব্যবহার দেখে মনে হয়, প্রাচীন স্থপতিরা এই অঞ্চলে পাথরের অভাব ইট দিয়ে পূরণ করেছেন।

বিক্রমপুর অঞ্চলে একটি বৌদ্ধবিহার আবিষ্কার বাংলাদেশকে বিশ্বের ইতিহাসে নতুন করে জায়গা করে দেবে। সাম্প্রতিক সময়ে আবিষ্কৃত হলো নরসিংদীতে উয়ারী বটেশ্বর, দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে পাল আমলের বৌদ্ধবিহার।

এসব প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ সংরক্ষণে সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। যদি ওই এলাকাকে ট্যুরিস্ট জোন করা যায় তাহলে অর্থনৈতিকভাবে দেশ লাভবান হবে।

কেএফ